জাদু বাস্তবের চিরকালীন মার্কেজ

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে মৃত্যু আসিয়া কাড়িয়া লইয়াছে, কিন্তু তাহার সৃষ্টির জাদু আর জীবনদর্শন বাস্তব জগতে আসীন থাকিবে মহাকালের হাত ধরিয়া। পনেরো বত্সর পূর্বেই মারণ কর্কট রোগে আক্রান্ত হইলেও তাহার জাদুর কলমখানি ছিল সজীব-সতেজ। অতঃপর শত বত্সরের নিঃসঙ্গতার আড়মোড়া ভাঙিয়া গত বৃহস্পতিবার তিনি ৮৭ বত্সর বয়সে আত্মসমর্পণ করিলেন নিউমোনিয়ার নিকট। বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বসাহিত্যে ঢেউতোলা নির্দিষ্ট কয়েকজন সাহিত্য সাধকের একজন তিনি। অবাক হইয়া বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীরা রসাস্বাদন করিয়াছেন তাঁহার ম্যাজিক রিয়েলিজমের সৃজনধারায়। যেই দেশ, যেই পরিবার-সমাজের কথা তিনি বলিয়া গিয়াছেন, যেই চরিত্র তিনি আঁকিয়া গিয়াছেন—তাহা শুধু লাতিন আমেরিকার নহে, তাহার ভিতরে রহিয়াছে এক বিশ্বজনীন সুরধারা। ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ কলম্বিয়ায় জন্ম, আইনের ছাত্র থাকাকালীনই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি, সেইকাজে ভেনেজুয়েলা-ইউরোপভ্রমণ, মেক্সিকো সিটিতে থিতু হওয়া এবং সাহিত্যচর্চার শুরু, ১৯৮২-তে নোবেল জয়, খ্যাতির অনন্য মাইলফলক রচনা—পুরো বৃত্তটা কি তাহার এতটাই সহজ ছিল? লৌকিক আর অলৌকিকের সীমারেখাটা তিনি নিজেই যেন ধূসর করিয়া দিয়াছিলেন। এইবার মৃত্যু আসিয়া বোধ করি বোঝাইল—সীমান্তখানি হইল মন-খারাপ-করা রূঢ়বাস্তব। অথচ, সীমাভাঙার সাহস তো তাহার কলমই দেখাইয়াছিল! প্রথম লেখা লিফ স্টর্ম-এর প্রকাশক খুঁজিতে মার্কেজের লাগিয়াছিল সাতটি বত্সর! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে যখন অর্থনীতি আর মূল্যবোধের সমান্তরাল ভাঙাগড়া চলিতেছিল, তখন শাসককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাইবার দুঃসাহস তিনিই দেখাইয়াছিলেন। তাহার খেসারতও দিতে হয় তাহাকে, নিজভূমে তিনি হইয়া উঠেন পরবাসী। যেই ‘জাদুবাস্তব’ শব্দবন্ধ মার্কেজের সমার্থক, সাহিত্যে তাহা আগেও ছিল। কিন্তু নিছক স্বপ্নবিলাসের নিয়মবদ্ধ সংকীর্ণ কুঠুরি হইতে তাহাকে যেন হিঁচড়ে বাহির করিয়া নূতনসৃজনে মাতিয়া ওঠেন মার্কেজ। এই ‘জাদুবাস্তবতা’ তাঁহার নামের সহিত ছায়ার মতো লাগিয়া থাকিলেও এইরূপ শাব্দিক আবদ্ধে আপত্তি ছিল মার্কেজের। কিন্তু ইহা বড় সত্য যে, কবি, ভিখারি, সঙ্গীতশিল্পী, দ্রষ্টা, যোদ্ধা, দুর্বৃত্ত—সকলেই তাঁহার রচনায় উঠিয়া আসিয়াছেন বল্গাহীন বাস্তবতা হইতে। এই চিত্র তুলিয়া ধরিবার সময় তিনি যেই সমস্যায় পড়িয়াছিলেন, তাহার বয়ান শুনিতে পায় তাঁহার নোবেল ভাষণে—মুশকিল ছিল এই যে, আমাদের সামনে তেমন কোনো পুরানো পথরেখা ছিল না যাহার মাধ্যমে সেই জীবনটাকে বিশ্বাসযোগ্য করিয়া তোলা যায়। সঙ্কট এবং অতঃপর কল্পনার দ্বারস্থ হওয়া, এই দ্বিমাত্রিকতায় তিনি তৈরি করিয়াছিলেন তাঁহার কল্পলোকে যাতায়াতের পথ। তাঁহার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরাও এই ধারার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। যেই মহাজীবনের সাধনা তিনি করিয়াছেন, তাহাই পাইয়াছেন। মহাজীবন তিনি নির্মাণ করেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবন সমাহারে। অনেক সামান্য ক্ষুদ্র বিষয় দিয়াও তিনি অসামান্য রচনা করিয়াছেন। এইখানেই তিনি অনন্য। তাঁহার ব্যক্তিত্ব ও ভাবনা, আবেগের সততা, লৌকিক-অলৌকিকে একাকার হওয়া আনন্দ বেদনার সৃষ্টিগাথা—আমরা এমন করিয়া আর কোথায় পাইব?