গণতন্ত্রের পথে বিবিধ বিপত্তি

‘গণতন্ত্র’ শব্দটি শুনতে কিংবা বলতে যতো সহজ, কার্যকর করতে ততো সহজ নয়। স্বয়ং চার্চিলও এর যথাযথ প্রয়োগের সম্ভবপরতা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন: ‘এই পাপ ও দুঃখভরা জগতে অনেক সরকারই তো প্রবর্তিত হলো এবং হবেও, কিন্তু কেউই বলতে পারবে না যে, গণতন্ত্রই যথার্থ।’ চার্চিল ঠিকই বলেছেন। গণতন্ত্র সত্যিই একটি জটিল প্রক্রিয়া যা সামাজিক মঙ্গল এবং ন্যায়বিচারের একটি সাধারণ প্রয়াসের লক্ষ্যে রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত করে। তাই সকল অসম্পূর্ণতা এবং জটিলতা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অনিবার্যতা প্রশ্নাতীত। শুধু তাই নয়, মানব সমাজের ক্রমবিবর্তনের ধারায় একেবারে শেষপ্রান্তে নাকি কেবল উদার গণতন্ত্রই টিকে থাকবে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তাঁর The End of History and the Last Man (১৯৯২) গ্রন্থে তো সেরকমই ধারণা দিয়েছেন। এমনকি পুঁজিবাদ হটিয়ে মানব সমাজের শেষ যাত্রা কম্যুনিজমে গিয়ে পৌঁছবে বলে স্বয়ং মার্কস যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তাকেও নাকচ করে ফুকুইয়ামা উদার গণতন্ত্রের জয়গান গেয়েছেন- তার বাস্তবায়ন যতোই কষ্টসাধ্য হোক না কেনো। তবে মানব সমাজ বিবর্তনের পরম্পরায় শেষ-মেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে— মার্কসের কম্যুনিজমে নাকি ফুকুইয়ামার গণতন্ত্রে— তা নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামালেও চলবে। তবে বর্তমানের বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া বহাল এবং কার্যকর রাখার জন্যে পুরো জাতির সর্বক্ষণ সর্বাঙ্গ ঘামানো দরকার। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী ফলাফল তেতো পিলের মতো গিলে যারা বিরহের গান গাইছেন তাদের জানা উচিত একমাত্র নির্বাচনই গণতন্ত্রের নিয়ামক শক্তি নয়। পৃথিবীর অনেক ভালো নির্বাচন রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে পারেনি। আবার যারা ঐ নির্বাচনে ওয়াকওভার পেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন তাদেরও বিস্তৃত হওয়ার অবকাশ নেই যে, সহজ বিজয়ের ভার সবসময় সহজ নাও থাকতে পারে। তাই নির্বাচন গ্রহণকারীদের যেমন গণতন্ত্রায়নের পথে অনেক দায় আছে, নির্বাচন বর্জনকারীদেরও তেমনি রয়েছে অনেক কর্তব্য। বস্তুত, বিষয়টি কোনো একক দলনির্ভর নয়। ক্ষুদ্র স্বার্থের ওপরে উঠে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের দেশে গণতন্ত্র চর্চার ব্যাপারে সবচেয়ে বড়ো জ্ঞাতব্য হলো আমাদের গণতন্ত্রায়নের ধারা অবিকল বৃটিশ, মার্কিন, কিংবা ভারতীয় ধারার মতো নয়। তাই আমাদের গণতন্ত্রায়নের রণনীতি আমাদের দেশ-কাল ও পাত্রের নিরিখে উদ্ভাবিত হওয়া আবশ্যক। এর জন্যে দরকার আমাদের গণতন্ত্রায়ণের পথের বিপত্তিগুলো সনাক্ত করা। গণতন্ত্র সম্পর্কে সবচেয়ে বড়ো সত্যটি হলো গণতন্ত্র মূল্যবান কিন্তু নিখাদ ত্রুটিহীন নয়, বিশেষ করে প্রায়োগিক বিবেচনায়। আর এই বিচ্যুতিগুলোই কখনো কখনো হুমকি হয়ে দাঁড়ায় একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের পথে এবং সেই রাষ্ট্রটি যদি হয় বাংলাদেশের মতো দরিদ্র/উন্নয়নশীল/নির্ভরশীল তৃতীয় দুনিয়ার রাষ্ট্র, তাহলে তো কথাই নেই। সরকার পদ্ধতি খোদ ওয়েস্ট মিনিস্টার আমদানি করা হলেও মোড়ক খোলার সাথে সাথেই এখানকার জল-হাওয়ায় তাতে মরচে পড়া শুরু করে। আর শুধু বাংলাদেশের কথাই বা বলছি কেনো, বস্তুত উপমহাদেশের রাজনীতিই এখনো মোটা দাগে নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ এবং দূরদর্শী হয়ে উঠতে পারেনি। রাজনীতিকরা পারেনি সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারার খোলস ছাড়তে। আমাদের রাজনীতিবিদরা এখনও মঙ্গলকাব্যের দেবতাদের মতো স্তুতিকাতর এবং খেয়ালী। তাই গণতন্ত্রায়ন যেমন হয় না দলে কিংবা গঠনতন্ত্রে, তেমনি হয় না প্রতিষ্ঠানে এবং দেশে। আবার জনগণও যে সবসময় সংবিধান-বর্ণিত ‘সকল শক্তির উত্স’ হয়ে উঠতে পারে, তেমনটিও নয়। জনমতও অনেক সময় সস্তা সেন্টিমেন্টে আন্দোলিত হয়। না হলে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অন্যতম প্রধান হোতা নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় বসাবার জন্যে গান্ধীবাদী ভারতীয়রা কি করে কোমর বেঁধে নেমেছে! জিঘাংসু সাম্প্রদায়িক নেতা মওদুদীর অপরাজনীতির পেছনেই বা কি করে ছোটে অসংখ্য মানুষ? চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে কি করে রাজপথে নামে মুক্তিযুদ্ধস্নাত বাংলাদেশের মানুষ? তাই সমাজে এবং রাষ্ট্রে গণতন্ত্রায়নের পথে বাধাসমূহ কোনো একক স্থলে খুঁজতে যাওয়া ঠিক হবে না। বস্তুত, বাংলাদেশের সুদীর্ঘ আর্থ-সামাজিক অবস্থানের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের অন্তরায়ের উত্সগুলো। আমাদের গণতন্ত্রের বড়ো বড়ো হুমকিগুলো সবসময় বন্দুকের নল থেকেই এসেছে কিংবা আসবে তেমনটি নয়। সেগুলো আসে আমাদের সমাজ কাঠামোর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা অনেক দূরতিক্রম্য প্রবণতা থেকে কিংবা তাদের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া থেকে। রোমান্টিক কবিকণ্ঠে দারিদ্র্যের জয়গান (হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান) ধ্বনিত হলেও বাস্তবে আমাদের গণতন্ত্রায়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় আমাদের দারিদ্র্য। স্বাধীনতার পূর্বাপর সুদীর্ঘ সময় ধরে আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি সেই দারিদ্র্যের দুষ্ট ক্ষত। দীর্ঘকাল দারিদ্র্য এবং বাংলাদেশ সমার্থক বিবেচিত ছিলো। যদিও গত দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ (২৬৫) দারিদ্র কমেছে এবং বছর প্রতি ২% হারে কমছে, তারপরও এখনো ৪৭ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দারিদ্র্য উন্নয়নের বিভিন্ন উপাদানকে— যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জন্মহার প্রভৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে। দারিদ্র্যের সুযোগ নিতে রাজনীতি বেনিয়ারা গণতন্ত্রায়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। তবে দারিদ্র্যকে পুঁজি করে রাজনীতির দিন ফুরিয়ে আসছে। মঙ্গা উত্তর জনপদ থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়েছে। ২০২১-এর মধ্যে বাংলাদেশ যে মধ্যআয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তা বাস্তবায়নের হাতছানি তো দেখাই যাচ্ছে। আমাদের জিডিপি ইতোমধ্যে ৬% ছাড়িয়েছে। ৭.৫% থেকে ৮%-এ পৌঁছুলেই স্বপ্ন ছোঁয়া যাবে। বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। তাই দারিদ্র্যকে একদিন বিদায় নিতেই হবে। গবেষকরা একদার দারিদ্র্যের উপকরণ খুঁজবেন জাদুঘরে। সেজন্যে প্রয়োজন সুসমন্বিত প্রয়াস, সামষ্টিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রাজস্ব-সংগ্রহ প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ, বিদ্যুত্ এবং অবকাঠামো ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত এবং বহির্বাণিজ্য সংস্কার সুদৃঢ়করণ, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ, অর্থনৈতিক সুশাসন এবং নগর-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ প্রভৃতির মাধ্যমে আমরা দারিদ্র্যকে জাদুঘরবন্দী করতে পারি। আর দারিদ্র্য বন্দী হলে গণতন্ত্র মুক্তি পাবেই। দারিদ্র্যের মতো দুর্নীতিও বাংলাদেশে গণতন্ত্রায়নের পথে পাষাণ-প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সময়ের রাজনীতি তাই কেবল নির্বাচন নির্ভর হওয়া উচিত নয়। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতারোহণের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বড়ো দলগুলো চায় ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় যেতে, আর ছোটরা চায় বড়দের লেজ ধরে বৈতরণী পার হতে। আর এই দারিদ্র্যক্লিষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে ক্ষমতার করিডোর করায়ত্ত করা খুব একটা কঠিন নয়— তা সে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে হোক কিংবা বাইরে দিয়েই হোক। আমরা একে বলি ক্ষমতার রাজনীতি— ক্ষমতায়নের নয়, কিংবা গণতন্ত্রায়নের নয়। আজ জরুরি জনগণের ক্ষমতায়নের রাজনীতি, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমি চাই এ-দেশের মানুষের মুক্তি।” বঙ্গবন্ধুর দল আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাঁর রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনিই আমাদের রাজনৈতিক ভরসার শেষ স্থল। তাঁর হাত দিয়ে যদি জনগণ ক্ষমতায়িত না হয় কিংবা গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক আদল না পায়, তবে তা হবে পুরো জাতির জন্যে দুঃখজনক। দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে তাঁর সরকারকে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করতে দেখতে চাই। কিন্তু দারিদ্র্য বিতাড়ণে বেশ খানিকটা অগ্রগতি থাকলেও দুর্নীতি দমনে তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যায় না। অথচ এই শুধু একটিমাত্র কাজে সাফল্য দেখালে এ-দেশের রাজনীতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে যে কারুরই। কিন্তু এ ব্যাপারে কাউকেই সোচ্চার হতে দেখি না। আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে এ যাবত্ একজন আন্না হাজারির দেখা পাওয়া যায়নি। বিএনপির রাজনীতিও কেবলমাত্র নির্বাচনে হারজিতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। গণতন্ত্রায়নের দুই প্রধান অন্তরায় দারিদ্র্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কোন ঘোষিত লক্ষ্য আছে বলে মনে হয় না। কেবলমাত্র নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা দেখা দিলেই ‘সবকিছু ঠিক আছে বলে’ তারা মনে করে। অথচ তাদের রাজনীতি যে এ-দেশে জঙ্গিবাদ অনুপ্রবেশের অর্গলহীন দরজা- তা তারা কখনোই বুঝতে পারছে না। দেশে গণতন্ত্রায়নের পথে জঙ্গিবাদ দারিদ্র্য কিংবা দুর্নীতির চাইতে আরো বড়ো প্রতিবন্ধক। মানছি গণতন্ত্রকে গতিশীল রাখতে নির্বাচনের কোনো যুত্সই বিকল্প নেই। তবে সেই নির্বাচনকে সর্বৈব সার্থক করতে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন এবং জঙ্গিবাদ দমনেরও কোন বিকল্প নেই। দারিদ্র্য, দুর্নীতি এবং জঙ্গিবাদ- এই তিন সামাজিক দানবের করাল গ্রাস থেকে যতোক্ষণ পর্যন্ত সমাজ ও রাষ্ট্রকে উদ্ধার করা না যায়— ততোক্ষণ পর্যন্ত কোনো নির্বাচন, তা সে যতো সুষ্ঠুই হোক, কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারবে না। এই সামগ্রিক উপলব্ধি যতো শিগগিরই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আসবে, ততো শিগগিরই সুগম হবে আমাদের গণতন্ত্রের শোভাযাত্রা। অন্যথায় দারিদ্র্যক্লিষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা মৌলবাদ কবলিত একটি অনগ্রসর সমাজে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যা বারবার বেরিয়ে আসবে, তা democracy নয়, democracy ছদ্মবেশে Plutocracy বাংলা অর্থে ‘ধনতন্ত্র’। আর এই ধনতন্ত্র সংরক্ষণের জন্যে ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দেয়নি। লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও অধ্যাপক