আলোকপাত
বিকল্প ভোজ্য তেল ও জৈব জ্বালানি
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৯
পাম গাছের আদি উত্স আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল। মালয়েশিয়ায় Cotman William Sime এবং Henry Darby নামের দুই ভদ্রলোক পাম চাষের প্রবর্তন করেন। ১৯৮১ সাল থেকে কক্সবাজার (৩২৫ একর), চট্টগ্রাম (২৭৯ একর) এবং সিলেট (১৮০ একর) মোট ৭৮৪ একর জমি পাম চাষের আওতায় আনা হয়। পাম চাষের মাংসল অংশ ও বীজ থেকে হয় পাম তেল। মাংসল অংশ থেকে পাওয়া তেল হচ্ছে পাম তেল আর বীজ থেকে যেটি পাওয়া যায় সেটি হচ্ছে পাম কর্নেল তেল। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫০ সেন্টিমিটারের বেশি বলে বাংলাদেশ পাম চাষের আদর্শ স্থান হতে পারে।
ভারত,পাকিস্তান এবং মিয়ানমার মালয়েশিয়ার আদলে পাম চাষে বেশ এগিয়ে। মূল আকর্ষণ পাম তেল থেকে জৈব জ্বালানি। বাংলাদেশের জন্য ব্যাপারটির গুরুত্ব চতুর্মুখী। ভোজ্য তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কর্মসংস্থান, বিকল্প জ্বালানির উত্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার আর একটি উত্সমুখ। পাম তেলে টোকোফেরল ও টোকোট্রায়ানল নামক দু’ধরনের ভিটামিন ‘ই’ বেশি পরিমাণে বিদ্যমান। এটি কোলস্টেরলমুক্ত। পাম তেলে রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা বাড়ে না। বরং উপকারী এইচডিএল কোলস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়, ক্ষতিকর এলডিএল-এর মাত্রা কমায়। পাম রক্তে জমাট বাঁধার প্রবণতা হ্রাস করার ফলে হূদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে ভোজ্য তেলের মধ্যে ৫০ পিপিএম পর্যন্ত কোলস্টেরল থাকলে তা কোলস্টেরলমুক্ত বলে বিবেচিত হয়। পাম তেলে রয়েছে ১৫-১৯ পিপিএম। বাংলাদেশে ১৫-১৬ লাখ মে.টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উত্পাদন শতকরা ১০ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (প্রায় ১৬০০০ কোটি টাকা) ব্যয় হচ্ছে প্রতিবছর। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল গ্রীষ্মমন্ডলীয় বা আংশিক চিরসবুজ উদ্ভিদে আচ্ছাদিত। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ পাহাড়সমৃদ্ধ বনাঞ্চলগুলোর ১৪ লাখ হেক্টরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণভুক্ত এবং বাকি অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল হিসেবে পার্বত্য জেলা কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণভুক্ত। এ সমস্ত বনাঞ্চলের বৈশিষ্ট্যসমূহ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বনাঞ্চলগুলোর সাথে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। পৃথিবীর শতকরা ৮০ ভাগ পাম চাষ এ অঞ্চলগুলোতে হচ্ছে। উল্লেখিত বাংলাদেশের বনাঞ্চলগুলো পাম চাষের উপযোগী। আবহাওয়া, প্রকৃতি এবং ফলন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে বেশি। বছরে হেক্টর প্রতি উত্পাদন সম্ভাবনা ৬ টন। ক্রমবর্ধমান চাহিদা হিসেবে ধরে ২০ লাখ টন পাম তেল উত্পাদনের জন্যে ৩.৫০ লাখ হেক্টর জমির প্রয়োজন। যা অত্যন্ত সহজলভ্য একটি বিষয়। ৫ হেক্টর করে প্রায় ৭০,০০০ পরিবারকে জমি বন্টনের মাধ্যমে প্রায় (৭০০০০ x ২৫= ১৭,৫০,০০০) লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব। জমি বরাদ্দপূর্বক আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহায়তায় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে জমির উন্নয়ন, জমিতে চারা রোপণ এবং আনুষঙ্গিক সুবিধা প্রদানসহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দেখাশুনা করে উত্পাদনের মাধ্যমে ব্যয়কৃত বিনিয়োগ উঠে আসার পর জমি ও বাগানের মালিকানা কৃষকদের উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটিয়ে পরবর্তীকালে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি সম্ভব এবং ১৭,৫০,০০০ (প্রতি ৫ হেক্টরে ২৫ জন কর্মী হিসেবে) লোকের কর্মসংস্থানের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে জৈব জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ইতিপূর্বে যা সয়াবিন তেল থেকে মেটানো হত তা এখন পাম তেল থেকে রূপান্তরিত জৈব জ্বালানি হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যা বিশ্ববাজারে প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে যা দ্বিগুণ হয়ে যাবার সম্ভাবনা। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় বিশ্বের সর্ববৃহত্ জৈব জ্বালানির প্লান্ট ইতিমধ্যেই উত্পাদন শুরু করেছে। রফতানি আয়ের ২২% (বর্তমানে জ্বালানি তেলের আমদানি অবশ্য অনেক বেড়ে গেছে) আমাদের চলে যায় জ্বালানি আমদানিতে। সফল পাম চাষের মাধ্যমে ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ জৈব জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব।
লেখক :গবেষক
belalahmed663@gmail.com