তৈদুর পথে
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৪
তৈদু ছড়া—আশ্চর্য রকম সুন্দর এক জলপ্রপাতের নাম। তৈদু ছড়ার সৌন্দর্যের খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই ভ্রমণপিপাসু মন উদগ্রীব হয়ে উঠে। পাহাড়, টিলা, জঙ্গল, ঝিরি পথ ধরে আসা-যাওয়ার দৈর্ঘ্য প্রায় বিশ কিলোমিটার। তাই দু’দিনের ছুটি একত্রে দরকার। হঠাত্ পাওয়া দীর্ঘ ছুটিতে ‘দে-ছুটের’ দুর্বার গতিসম্পন্ন অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় সাথিদের নিয়ে ছুট দিলাম পাহাড় অরণ্য ঘেরা জেলা খাগড়াছড়ির পথে। রাত ১১টায় গাবতলী থেকে শান্তি পরিবহনে চেপে বসলাম। পরের দিন সকালে তৈদু ছড়ার অভিযানে বের হয়ে পড়ি। মাইক্রো স্টার্ট, চলছে দিঘি নালার পোমাং পাড়ার দিকে। একটা সময় গাড়ি আর এগোলো না। প্রয়োজনীয় রসদ (পানি, শুকনা খাবার) নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। জলপ্রপাতের দেখা নেই। সমতল পাহাড়, অরণ্য, জুম ক্ষেতের বুক চিরে এগিয়ে চলেছি, মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে দু-চার জন উপজাতির সাথে সাক্ষাত্ হচ্ছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জুম চাষের অপরূপ দৃশ্য, সবুজে মোড়ানো চারপাশ আমাদের পথ চলার শক্তি জুগিয়েছে। অতঃপর দৃষ্টির গোচরে এলো পাহাড়ের উপর বসত ঘর। পাহাড় বেয়ে উপরে উঠলাম। এখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসবাস, সাইনবোর্ড ঝুলছে ‘বুদ্ধুমা পাড়া’। সৌহার্দপূর্ণ মানসিকতাসম্পন্ন কয়েকজনের সাথে কথা বলে ‘তৈদু’ যাওয়ার সঠিক পথ জেনে নিলাম। তারাই ১২-১৩ বছর বয়সের দু’জন গাইড একশত টাকায় ঠিক করে দিলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার হাঁটা শুরু।
এবার তৈদু ছড়া যাওয়ার সবচেয়ে রহস্যময় পথে চলা শুরু হলো। জলপ্রপাতের পানি দিয়ে সৃষ্ট বোয়ালখালি ছড়া দিয়ে যাচ্ছি। দু’পাশে পাথুরে পাহাড়ের গভীর জঙ্গল, পায়ের নিচে ছোট বড় কংকর। কখনও হাঁটু কখনওবা বুক সমান ঠাণ্ডা শীতল পানি কেটে চলেছি। বড় বড় বলাকৃতির পাথরগুলো যেন একেকটি রহস্য। প্রায় এক ঘণ্টা হলো হাঁটছি, জলপ্রপাতের রিমঝিম শব্দ তো দূরে থাক শীতল আবেশও পাচ্ছি না। গাইডদের জিজ্ঞাসা করলাম আর কত দূর? বলল, এই তো সামনে। ‘সামনে’ তো আর ফুরোয় না। ইতোমধ্যে পিচ্ছিল পথে সবাই কমবেশি চিত্পটাং খেলাম। শরীরের সব শক্তি যেন নিশেষ হয়ে যাচ্ছে। এবার দৃষ্টির সীমানায় এলো হাতি। বিশাল দেহ শীতল করার জন্য ডুব দিয়ে আছে। কিন্তু আসলে ওগুলো হাতি না, হাতির আদলে কালো পাথর। কি অদ্ভুত সৃষ্টি, করুণাময়ের! আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর কানে ভেসে এলো পানি পড়ার শব্দ। হিম হিম ঠাণ্ডা অনুভূত হলো। দশ মিনিট হাঁটার পর চোখ নিষ্পলক হয়ে গেল।
এ কোন জগত্! এটা কি আমার সোনার বাংলা না কি অন্য কোথাও। ৬০-৭০ ফিট উপর থেকে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়া জলরাশি দেখে নিমিষেই মিলিয়ে গেল সব ক্লান্তি। নবোদ্যমে জলকেলিতে মেতে উঠি। এরইমধ্যে চিংড়ির বারবিকিউ খাওয়া হলো। দেহ ইঞ্জিন এখন পুরোপুরি ফিট। দেখতে হবে দ্বিতীয় ঝরনাটি। আবিষ্কারক নিজেই যেখানে যেতে পারেননি। দে-ছুট মানেই হলো অ্যাডভেঞ্চার। অদেখাকে দেখার প্রত্যয়, সুতরাং আবারও ঘণ্টা খানেকের পথ পরিক্রমা।
লাঠি, বাঁশে ভর করে গুহা, পাহাড়, জঙ্গল ঝিরির পিচ্ছিল পাথর মাড়িয়ে অগ্রসর হচ্ছি। কে যে কতবার চিত্পটাং হয়েছি গুণেও বলতে পারব না। এই মৃত্যু উপত্যকায় শুধুই আমরা, আর ভ্রমণের আনন্দ ঠিক এখানেই। মৃত্যু উপত্যকা বলতে বুঝিয়েছি একটু বেখায়াল হলেই চরম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জংলি ভুট্টা, শসা আর নাম-না-জানা ফল খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা মিটালাম। পিপাসা মিটালাম ঝিরির পানি দিয়ে। দূর থেকে ঝরনার পানির কলকল শব্দ কানে ভেসে এলো। সবাই চিত্কার দিয়ে উঠলাম, ওয়াও! পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি।
কি অপূর্ব সুন্দর! প্রায় ৩০০ ফিট উপর থেকে বিশাল জলরাশি গড়িয়ে পড়ছে। অবাক বিস্ময়ে দু’চোখ অপলক হয়ে রইল। পর্যটকদের জন্য এ এক অপার সৌন্দর্যের হাতছানি। তৈদু ছড়ার প্রথম ঝরনাটির চেয়ে বহু বহু গুণে বেশি নয়নাভিরাম দ্বিতীয়টি। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে বুঝানো সম্ভব না। মন মাতানো ঝরনার রূপে মজে গিয়ে সময় জ্ঞান ভুলে দীর্ঘক্ষণ ভিজলাম। যেন ভেজার সাধ মিটছে না। প্রাকৃতিকভাবেই বসার বেঞ্চের মতো পাহাড়ের গায়ে খাঁচ কাটা রয়েছে। ততটা পিচ্ছিলও নয়। (হঠাত্ টনক ফিরল যখন গাইডদের হদিস পেলাম না।) ঘড়ির কাটা তখন চারটা। কিন্তু গভীর অরণ্য ঘেরা হওয়ায় যেন সন্ধ্যা। বিদায় নৈসর্গের রানি তৈদু। টিকে থাক অনন্তকাল রোমাঞ্জকর জলপ্রপাত তৈদু।
খাগড়াছড়ি ভ্রমণে আরও যা দেখবেন—আলুটিলা গুহা, রি-সাং ঝরনা, দেবতার পুকুর এবং শান্তিপুর অরণ্য কুটির। খরচ জনপ্রতি চার হাজার টাকা মাত্র। পাহাড়-অরণ্য ঘেরা দুর্গম তৈদুর পথে ভ্রমণ করুন নির্ভয়ে।
যোগাযোগ :ঢাকার গাবতলি ও সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস যায় খাগড়াছড়ির দিঘিনালা। দিঘিনালা থেকে সিএনজি বা মাইক্রোতে জামতলা অথবা পোমাংপাড়া। রাত কাটানোর জন্য খাগড়াছড়ি শহরে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। ভাড়া ১০০০-৫০০০ টাকার মধ্যে।