প্রয়োজন সর্বজনীন সতর্কতা
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
দুঃসহ দাবদাহে দগ্ধ হইতেছে সারা দেশ। চৈত্র চলিয়া গিয়াছে। অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে রুদ্র বৈশাখেরও এক-চতুর্থাংশ সময়। কিন্তু বৃষ্টির দেখা নাই। নাই কালবৈশাখীর চিরচেনা সেই ঝড়ো হাওয়ার আকস্মিক উদ্দামতা— যাহা চিরাচরিতভাবে তাপদগ্ধ জনপদে বুলাইয়া দেয় শীতলতার পরশ। প্রকৃতির এই রূপটি অচেনা শুধু নহে, কিছুটা অস্বাভাবিকও বটে। গত মার্চ মাসে সারা দেশে বৃষ্টি হইয়াছে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এপ্রিলের অবস্থাও তথৈবচ। এই মাসে যেইখানে ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে স্বাভাবিক ধরা হইয়া থাকে, সেইখানে গত ২০ দিনে বৃষ্টি হইয়াছে মাত্র ৬২ মিলিমিটার। ঢাকায় সর্বশেষ কালবৈশাখী ও বজ্রবৃষ্টি হইয়াছে গত ২৫ মার্চ। একদিকে এই ঝড়বৃষ্টিহীনতা, অন্যদিকে বাড়িয়া চলিয়াছে তাপমাত্রা। ইতিমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়াইয়া গিয়াছে। রৌদ্রের তীব্রতা এতো বেশি যে ঘরেবাহিরে কোথাও স্বস্তি মিলিতেছে না। হাঁসফাঁস করিতেছে মানুষ। বাড়িতেছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগব্যাধির প্রকোপ। সর্বাপেক্ষা বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে শ্রমজীবী মানুষ ও শিশুকিশোররা। চিকিত্সকদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করিয়া পেটের দায়ে শ্রমজীবী মানুষকে ঠিকই পথে নামিতে হইতেছে কিংবা ছুটিয়া যাইতে হইতেছে কঠিন কর্মস্থলে। অন্যদিকে, বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় শিশুকিশোরদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মাত্রা যে বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। এই ধরনের অস্বাভাবিক আবহাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জরুরি ছুটি ঘোষণার রেওয়াজ থাকিলেও অদ্যাবধি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ কেন নেওয়া হয় নাই তাহা আমাদের বোধগম্য নহে।
প্রাণীকুল শুধু নহে, বাংলাদেশের গোটা প্রকৃতিই এখন বৃষ্টির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। কিন্তু বহুল প্রত্যাশিত সেই বৃষ্টি কবে হইবে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরাও তাহা নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারিতেছেন না। বরং তাহারা আশঙ্কা করিতেছেন যে, দাবদাহ দীর্ঘায়িত হইবে। সেইসাথে তাপমাত্রা ক্রমাগত আরও বাড়িবে। আমরা কায়মনোবাক্যে প্রত্যাশা করি যে, আবহাওয়াবিদদের এই আশঙ্কা অসত্য প্রমাণ করিয়া সহসাই বৃষ্টি নামিবে। শীতল হইবে খরতাপে দগ্ধ প্রকৃতির প্রাণ। তবে শুধু প্রত্যাশার উপর ভরসা করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের প্রদত্ত সতর্কবার্তাকে বিবেচনায় রাখিয়া সম্ভাব্য বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলার যথাযথ প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই এই মুহূর্তের সর্বাপেক্ষা জরুরি কর্তব্য বলিয়া আমরা মনে করি। এইক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি কার্যকর হইল সর্বজনীন সতর্কতা। প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি—সকল পর্যায়েই এই সতর্কতা প্রয়োজন। স্ব-স্ব অবস্থান হইতে সকলকেই অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করিয়া স্কুলসমূহে বিশেষ ছুটি ঘোষণা করা যাইতে পারে। আজকাল বহু অফিস এবং কলকারখানাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু যেইসব শিল্প বা কল-কারখানায় কাজের পরিবেশ অনুকূল নহে বা অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ— সেইখানে কর্মসময় পুননির্ধারণ, কর্মঘণ্টা হ্রাস কিংবা মধ্যাহ্নবিরতি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা যাইতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত সচেতনতা বা সতর্কতার কোনো বিকল্প নাই। গরমের তীব্রতা প্রশমনের জন্য অনেকেই যত্রতত্র মুখরোচক শরবত ও আখের রসসহ নানা ধরনের পানীয় কিংবা খাবার গ্রহণ করিয়া থাকেন। ইহাতে সাময়িক প্রশান্তি পাওয়া গেলেও এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর পানীয় বা খাবার গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে। খাদ্য গ্রহণে অবশ্যই সতর্ক থাকিতে হইবে। যতদূর সম্ভব এড়াইয়া চলিতে হইবে অতিরিক্ত রৌদ্র ও গুমোট পরিবেশ। প্রচুর পানি পান করিতে হইবে। ডায়রিয়া কিংবা হিটস্ট্রোকসহ যেকোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতার ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করিতে হইবে অতি দ্রুত। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্য ও সতর্কতামূলক বার্তা গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারেন।