ক্রিকেটের মডেল না বিজ্ঞাপনের মডেল

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলাগুলোতে বাংলাদেশ এই ভালো করে তো এই চরম পরাজয়ের গ্লানিতে ভাসিয়ে দেয় জাতিকে। কখনো জয় আসে প্রত্যাশার বাইরে, কখনো পরাজয় আসে অবাক করা নিয়ে। একটা দুটো জয়ে আমরা এতই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ি যে ‘ মুই কি হনু রে.. মুই কি হনু’ এই ভাব চলে আসে। চারদিক থেকে আসতে থাকে বাঁধ ভাঙা স্তুতি, অভিনন্দন, পুরস্কারের লহর। কেউ দিচ্ছে গাড়ি, কেউ দিচ্ছে বাড়ি, কেউ দিচ্ছে সারা জীবনের স্বাস্থ্যসেবা, এটা ফ্রি সেটা ফ্রি। এই জোয়ারে প্রশংসায় প্লাবিত ক্রিকেটাররা নিজের আসল পরিচয় বগলদাবা করে ক্রিকেটের মডেল ঝেড়ে ফেলে কোনো কোম্পানির সেবার বা পণ্যের মডেল হয়ে যান অতিরিক্ত অর্থ পাবার আশায়। একটা দুটো খেলায় ব্যক্তিগত পারফরমেন্স ভালো হলেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য বা সেবার মডেল হওয়ার প্রবণতা দেখে মনে হয় ক্রিকেটারদের আসল উদ্দেশ্য ক্রিকেটার হওয়া নয়, বরং রঙিন জগতের মডেল হওয়া এবং তা থেকে টাকা কামানো। কোনো পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপনে দেখা যায় ফর্মে না থাকা বা সাময়িক ব্যর্থতায় হতাশায় নিমজ্জিত ক্রিকেটার ঐ পণ্য বা সেবা ব্যবহার করে মুহূর্তেই সাফল্য পেয়ে যাচ্ছেন। ব্যাটসম্যানের ব্যাট চার-ছক্কায় দানবীয় হয়ে উঠছে, বোলারের বল বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। এ যেন আশ্চর্য তেলেসমাতি! অথচ পাশাপাশি ঐ বিজ্ঞাপন প্রচারের পরপরই সরাসরি সম্প্রচারিত খেলায় দেখা যাচ্ছে ঐ ব্যাটসম্যান রান না করেই আউট হয়ে সাজ ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। বোলার নিজে ব্যর্থ হয়ে রানের পাহাড় গড়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষকে। আমাদের ক্রিকেটাররা অবশ্যই সময় সময় ভালো করছেন কিন্তু তাঁরা তো ন্যূনতম ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন না বা বজায় রাখতে পারছেন না। অথচ ধারাবাহিকভাবে পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দেদারসে করে যাচ্ছেন। ক্রিকেটে নিজের শেকড় মজবুত না করে বিজ্ঞাপনের শিখরে ওঠার সাধনা অবশ্যই নিজের ক্রিকেট সাধনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আর তার দায় জাতিকে বহন করতে হচ্ছে। জাতির কী হলো না হলো তা ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্রিকেটাররা বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব বা লিগে খেলার জন্য মুহূর্তেই উড়াল দিচ্ছেন। আমরা দেখলাম সদ্য শেষ হওয়া টি-টুয়েনটি বিশ্বকাপে বাজে পারফরমেন্সে জাতিকে লজ্জায় ডুবিয়ে দেশকে পিছনে ফেলে দিব্যি বিদেশি ক্লাবে খেলতে উড়াল দিলেন একজন প্রথম সারির ক্রিকেটার। ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের পারফরমেন্স যখন খারাপ যায় তখন তাঁদের উচিত নিজেদের ক্রিকেট সাধনায় মগ্ন রাখা। দেশ তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করছে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের উন্নতির জন্য, বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার জন্য অবশ্যই নয়। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটি অবস্থান করে নিয়েছিল। অতীতে ক্রিকেটাররা ক্রিকেট বিশ্বে জাতিকে অনেক ওপরে তুলে ধরেছিল। কিন্তু আজ যেন মনে হচ্ছে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়েছি। ক্রিকেটারদের লোভনীয় ‘খ্যাপ’ খেলা ও বিজ্ঞাপনে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ক্রিকেট কর্মকর্তাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। আর সম্মানিত ক্রিকেটারদের ঠিক করতে হবে তাঁরা ক্রিকেটের মডেল হবেন না কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের বা সেবার মডেল হবেন। ঢাকা