বিদেশি কোচ নির্ভর হয়ে পড়লো পেশাদার লিগ

পেশাদার ফুটবল লিগ এখন বিদেশি কোচ নির্ভর হয়ে পড়েছে। দেশের ফুটবলের ইতিহাসে এবারই প্রথম শীর্ষ লিগটিতে ১০ ক্লাবের মধ্যে ছয়টিতেই বিদেশি কোচ। মোহামেডান, আবাহনী, শেখ জামাল, ব্রাদার্স তো আছেই এমনকি রেলিগেশনের লড়াইয়ে থাকা ফেনীর সকার ক্লাবেও আছে বিদেশি কোচ। সর্বশেষ শেখ রাসেল দেশের এক নম্বর কোচ মারুফুল হককে অব্যাহতি দিয়ে বলকান অঞ্চলের এক কোচ দ্রাগান ডুকোনোভিচের হাতে তুলে দিয়েছে দল। দেশের কোচরা ক্রমেই শীর্ষ ক্লাবগুলোতে জায়গা হারাচ্ছেন। উদ্বিগ্ন দেশের কোচিং পেশায় থাকা কোচরা। ক’দিন আগে দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবলের দল লিটিল ফ্রেন্ডস ক্লাবও বিদেশি কোচ নিয়ে আসে। এছাড়া জাতীয় ফুটবল দলের দুই বিদেশি কোচ তো আছেনই। ফুটবল দুনিয়ায় কোচ বদল নতুন কিছু নয়। গত মৌসুমে ট্রেবল জয়ী মারুফুল হক চাকরি হারানোর পর দেশীয় কোচদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। এরকম একজন দক্ষ কোচের চাকরি হারানোটা ভালো চোখে দেখছেন না দেশের ফুটবলে বর্ষীয়ান কোচ অমলেস সেন। তিনি বলছেন, ‘বিদেশি কোচ নেয়াটা ক্লাবের সিদ্ধান্ত। কিন্তু এটা ফুটবলের জন্য খারাপ হচ্ছে। যারা কোয়ালিফাইড কোচ আছেন তাদের জন্য খারাপ। অবহেলা করায় একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ শেখ রাসেলের কোচ মারুফুল হকের চাকরি চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘রেজাল্ট পেতে হলে প্রথমে ভালো দল গড়তে হবে। শেখ রাসেল গত মৌসুমে ভালো দল গড়েছে কোচ ভালো কাজ করেছে বলেই তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই কোচ তো তিনটি চ্যাম্পিয়ন আর একটি রানার্সআপ ট্রফি এনে দিয়েছেন।’ তার প্রশ্ন, ‘বিদেশি কোচরা এতো ভালো মানের হলে কেন তারা এদেশে এসে চাকরি করছেন। ইউরোপেই তো অনেক ক্লাব আছে। যেখানে কাজ করলে বাংলাদেশের চেয়েও বেশি অর্থ আয় করতে পারবেন।’ অমলেস সেন মনে করেন বিদেশি কোচদের একাডেমীর জন্য আনা ভালো। ক্লাবগুলোতে দেশি কোচদের রাখা উচিত। দেশি কোচদের পক্ষে অবস্থান বিজেএমসি ছেড়ে যাওয়া কোচ জাকারিয়া বাবুর। তার প্রথম কথা হচ্ছে, ‘এটা ক্লাবের সিদ্ধান্ত। দেশি কোচ বাদ দিয়ে বিদেশি কোচ আনলে মান যাচাই করে নিয়োগ দেয়া উচিত। শুধু পেটে-ভাতে কোচ রেখে বলা আমার দলে বিদেশি কোচ আছে এটা মানতে নারাজ আমি।’ মারুফের উদাহরণ দিয়ে জাকারিয়া বাবু বলেন, দেশি এই কোচ তিনটি ট্রফি দিয়েছেন। সাইফুল বারী টিটু দিয়েছেন ১টি ট্রফি (সুপার কাপ)। বিজেএমসিতে দুই মৌসুম কাটানো কোচ জাকারিয়া বাবুল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘কম বেতনে বিদেশি কোচ পাওয়া যায় বলেই এখন বিদেশি কোচ আনার দিক ঝুকছে ক্লাব।’ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক মনে করেন, বিদেশি কোচ যেন নামে মাত্র না নেয়া হয়। তিনি বলেন,‘শফিকুল ইসলাম মানিক, মারুফুল হক এবং সাইফুল বারী টিটুর বাইরে কোয়ালিফাইড কোচ নেই। এরা যখন ব্যর্থ হয় তখন ক্লাবগুলোর কাছে বিদেশি কোচ ছাড়া বিকল্প থাকে না। উনাদের মতো আরো কোচ প্রয়োজন দেশে। কিন্তু হচ্ছে না।’ ইনজুরিতে থাকা মুক্তিযোদ্ধার এই গোলকিপার মনে করেন,‘কোচিং এডুকেশন আরো উচ্চমানের হওয়া উচিত। লাইসেন্স অনেকের আছে। কিন্তু লাইসেন্স থাকলেই হবে না। অভিজ্ঞতা থাকার ব্যাপার আছে। সাথে খেলোয়াড়দের পরিচালনা করার মতো স্মাটনেস থাকা জরুরি। এই সব বিষয়গুলো যখন বাড়বে তখন ভালো মানের কোচও আসবে।’ দেশের শীর্ষ কোচদের মধ্যে রয়েছেন মারুফুল হক, সাইফুল বারী টিটু এবং শফিকুল ইসলাম মানিক। এদের মধ্যে মানিক মুক্তিযোদ্ধার সাথে রয়েছেন। আর টিটু কাজ করছেন জাতীয় দলের সহকারী হিসাবে। এই তিন জনই ভালো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন দেশে। আর অন্যদের পারিশ্রমিক বলতে গেলে খুবই কম। ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকাও পান কেউ। ক্লাব কোচিংয়ে দেশের এক নম্বর কোচ মারুফুল হককে অব্যাহতি দেয়া শেখ রাসেল ক্লাব সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী মারুফকে ইঙ্গিত করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন,‘ফুটবল প্রশিক্ষণের জন্য শুধু পূথিগত বিদ্যাই গুরুত্বপূর্ণ না। অভিজ্ঞতা থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ।’ অমলেসন সেন বলছিলেন বিদেশি কোচদের একাডেমীতে দেয়া উচিত। আর দেশিদের ক্লাব ফুটবলে। কিন্তু শেখ রাসেলের সভাপতি বলেছেন উল্টোটা। তার মতে, ‘বিদেশি ফুটবলার বন্ধ করে দিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর জন্য বিদেশি কোচ বাধ্যতামূলক করা উচিত।’ তাহলে দেশি কোচরা কি করবেন ? এমন প্রশ্নে তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘দেশি কোচরা শুধু চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের ক্লাবগুলোকে প্রশিক্ষণ দেবেন।’