হেমন্তের পড়ন্ত বিকেল। রোদের তেজ বলতে কিছুই নেই। সকাল থেকে কোলাহলমুখর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ততক্ষণে রাজ্যের নীরবতা নেমে এসেছে। বাংলাদেশ দল অনুশীলন শেষ করে ফিরে গেছে সেই দুপুরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররাও অনুশীলন শেষ করে বাসে ওঠার অপেক্ষায়।
এমন শুনশান নীরবতাকেই যেন বেছে নিলেন তিনি। বলছি, বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার কথা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যিনি নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী।
চিরচেনা শেরেবাংলায় আর ১০ দিনের মতোই গতকাল এসেছেন মাশরাফি। ড্রেসিংরুমে ঢুঁ মেরে সোজা চলে আসেন বিসিবি একাডেমি ভবনের ভেতর থাকা পছন্দের ছোট জিমে। তবে ১৬-১৭ দিন পর এ আগমনে নিশ্চিতভাবেই কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সেটা চেনা মুখগুলোর চাহনি, কথায় স্পষ্ট। বিসিবির কর্মকর্তা থেকে পরিচ্ছন্নতা কর্মী সবাই বলছেন, ‘ভোট হয়তো দিতে পারবো না, তবে দোয়া থাকলো।’
মুখ ভর্তি লম্বা দাঁড়ি ছাড়া বাহ্যিক অবয়বে অবশ্য মাশরাফির মাঝে খুব বেশি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। জিমে সময় কাটালেন ঘণ্টা খানেক। যার হেতুও কারো অজানা নয়। আগামী ৯ ডিসেম্বর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। স্বাভাবিকভাবেই অধিনায়কের প্রস্তুতিটা শুরু হলো বলা যায়। বল কবে হাতে নিবেন? মাশরাফির উত্তর, ‘এখনও ঠিক করিনি।’ বিশ্বকাপের আগে ক্রিকেটের সঙ্গে আপোষ নয়— নিজের ফেসবুকের পাতায় কিছুদিন এক বিবৃতিতে এমনটাই বলেছিলেন মাশরাফি। বাস্তবতাও ভিন্ন নয়। ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে খেলতে ২২ গজের সমীকরণে মন বসাচ্ছেন তিনি। ওয়ানডে সিরিজ শেষের আগে নড়াইলও যাচ্ছেন না।
নির্বাচনী ডামাডোলে সরগরম গোটা দেশ। প্রার্থীরা এলাকায় গণসংযোগ, প্রচারণা, নির্বাচনী কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দেশের আর সব সংসদ সদস্য প্রার্থীদের মতো ভোটের হাওয়ায় ভাসেননি মাশরাফি। ওয়ানডে সিরিজ দুয়ারে দাঁড়িয়ে বলে ক্রিকেট নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে তাকে।
ক্রিকেটের মাঠ রাঙানোর পর এবার রাজনীতির মঞ্চে মাশরাফি। দেশের গণমাধ্যম, জনসাধারণের কাছে অন্যতম আলোচনার বিষয় নড়াইল এক্সপ্রেসের রাজনীতিতে পদার্পণ। বিসিবি একাডেমির জিমে তাকে একাকী পেয়ে সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে টুকটাক কথা না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।
ক্রিকেট-রাজনীতি একসঙ্গে কেমন লাগছে? আরেকটা আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষকে যেভাবে সমীহ করেন, সম্মান দেন, মাশরাফির এ উত্তরটাও ঠিক তেমনই। বললেন, ‘প্রথমটার তো অনেক অভিজ্ঞতা আছে। দ্বিতীয়টার তো অভিজ্ঞতা নেই। দেখি কেমন লাগে।’
ক্রিকেটের মাঠে সব সময় নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন মাশরাফি। পায়ে সাতটি অস্ত্রোপচারের পরও দেশের সেরা পেসার, ওয়ানডেতে দেশের সফল অধিনায়কের তকমা তার নামের পাশেই শোভা পায়। রাজনীতির মাঠেও সাফল্যমণ্ডিত অধ্যায় রচনার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে তার।
চূড়ান্ত মনোনয়ন নিশ্চিত না হলেও নড়াইল-২ আসনে মাশরাফির প্রধান প্রতিপক্ষ হবে বিএনপির দুই প্রার্থী। ফরিদ উজ জামান ফরহাদ ও মুফতি শহীদুল ইসলামকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।
কথায় কথায় জানা গেল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ঠিক হাড়ির না হলেও বেশ ভালোই খবর রাখেন নড়াইল এক্সপ্রেস। এ মাঠেও অধিনায়কের মতোই হোমওয়ার্ক করছেন তিনি ও তার দল। ২২ গজের মতো ভোটের লড়াইয়েও তাই সতর্ক মাশরাফি।
ডিসেম্বরের শুরুতে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজের চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেবেন সাকিব-তামিমদের নিয়ে। তারপর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনী বৈতরণীও পাড়ি দিতে মাশরাফির ভরসা নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং নড়াইলবাসী।