আলোকপাত

বিবেক যেভাবে আইনের চেয়ে বড়

বিবেকই একজন মানুষের জীবন চালনার উত্কৃষ্ট সংবিধান। সে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারা সংশোধিতও হয় কালের আয়নায়, সততার গঙ্গাজলে। বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ মানুষ বিবেক দিয়ে জীবনের সঠিক পথের পথচারী হয়ে পড়ে। সে আইনশাস্ত্রের বিশেষ মুখাপেক্ষী নয়। আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, মনের কদাচার নিয়ন্ত্রণের সাধ্য আইনের নেই। মন হলো মানুষের বাহ্যিক আচরণের প্রধানতম নিয়ন্তা। মনের সদিচ্ছা অথবা অসদিচ্ছার প্রতিফলনে মানুষের বাহ্যিক আচরণ যথাক্রমে সত্ বা অসত্ হয়ে পড়ে। যে আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণের উত্সমূল পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, তার উপযোগিতা আর কতইবা? একথা অনস্বীকার্য আইন জানার মধ্যদিয়ে, আইন চর্চার মধ্যদিয়ে সুপ্ত বিবেকযুক্ত মানুষের অন্তরে বিবেকের জাগরণ, বিবেকের শ্রীবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। অপরপক্ষে একথাও স্মরণীয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিবেকসমূহ তাদের প্রণীত সার্বজনীন আইনে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। সুতরাং বিবেক ও আইনের মধ্যে যে পরস্পরকে প্রভাবিত করার মতো একটা শক্তিধর সম্পর্ক রয়েছে, সে কথা বলাই যায়। সে অর্থে মানুষকে সুপথে চালনার ক্ষেত্রে আইনের বাহাদুরী কিছু প্রকারের রয়েছে। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য কোনক্রমে আইনের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা নয়। বরং একথা দ্ব্যর্থচিত্তে বলা যায় যে, আইনের উদ্দেশ্য পূরণ আইনের দ্বারা যতটা সম্ভব বিবেকের দ্বারা ততোধিক সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেক আইনের চেয়ে গরীয়ান, আইনের চেয়ে মহীয়ান, আইনের চেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ও কার্যকর। মানুষের যে বিবেক কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে আছে, তাতে যদি না জাগরণ ঘটে তবে আইনের শাস্তির ভয় ব্যক্তিকে অপরাধ প্রবণতা থেকে কতটাই বা দূরে সরিয়ে রাখতে পারে? একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করি কোন রাষ্ট্রের আইনে ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এতে করে ঐ রাষ্ট্রে ধর্ষণের প্রকোপ যদিও বা কিছু কমে, ধর্ষণ সংঘটন বন্ধ হবে না। কারণ আইনের শাস্তির প্রতি ভয় থাকলেও কোন ব্যক্তির যদি নিজের বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকে, তবে আইনের অনুপস্থিতিতে সে ধর্ষণ প্রয়াসী হতে পারে্। বিবেকের ধারক হূদয়, আইনের ধারক রাষ্ট্র। হূদয় ব্যক্তির সাথে সাথে চলে, রাষ্ট্র ব্যক্তির সাথে সাথে চলতে অক্ষম। পথ হারিয়ে একটি মেয়ে উক্ত রাষ্ট্রের গভীর জঙ্গলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কোন এক দুশ্চরিত্র বিবেকবর্জিত লম্পট ঐ জঙ্গলে যদি মেয়েটিকে একাকী পেয়ে যায়, তবে কি ঘটবে তার আর বিশেষ উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধহয় নেই। যে দুশ্চরিত্র বিবেকবর্জিত লম্পটটি মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে ধর্ষণ অপরাধ থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিল, সে-ই নির্জন বনমধ্যে একটি বিপদগ্রস্ত মেয়েকে বলাত্কার করতে কার্পণ্য করবে না। সে বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ নয়। বিবেক কর্তৃক পরিচালিত নয়। কে বলতে পারে তার বিবেকের কোন স্ফূরণই ঘটেনি। নির্জন ঐ জঙ্গলে আইনের ভূমিকা মৃত লাশের মতোই। সেখানে ধর্ষণ অপরাধের শাস্তি বিধানে সাক্ষীর ভয় নেই। জনপ্রতিরোধের ভয় নেই। ভয় নেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার। এখন নিজ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ কোন ব্যক্তি উক্ত জঙ্গলে সেই মেয়েটিকে একই অবস্থায় একাকী দেখতে পেলে, সক্রিয় বিবেকবোধ কোন প্রকার ধর্ষণেচ্ছা তার হূদয়ে জাগতে দেবে না। অধিকন্তু, সে বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ বলে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ হিসেবে পথহারা মেয়েটিকে পথ বাতলে দিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। আইন বিবেকের পরিপূরক হতে পারে না। কিন্তু বিবেক আইনের পরিপূরক হতে পারে। জনসাধারণকে আইন মেনে চলাতে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাতে রাষ্ট্রের কত কত আয়োজন। বিবেকবান মানুষ তৈরিতে, বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা যেন ততটাই উদাসীন, ততটাই নির্লিপ্ত। এ যেন অপরাধমুক্ত শান্তির সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে, সুশাসন আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গাছের আগা কেটে গোড়ায় পানি ঢালা। লেখক :প্রবন্ধকার theclayman.man@gmail.com