প্রকৃতিপ্রেমী কবির গল্প

নাসির আহমেদ। কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত এক ব্যক্তিত্ব। বিষয় এবং আঙ্গিক-প্রকরণের বহুমাত্রিকায় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও কবিতায় যিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন কণ্ঠস্বর। গুণী এই মানুষটির তরুণবেলা কেমন কেটেছে পাঠকদের জন্য সেই গল্প তুলে ধরছেন সৈয়দ শিশির ১৯৫২ সালের ৫ ডিসেম্বর ভোলায় এক ঘন আরণ্যক পরিবেশে কবি নাসির আহমেদের জন্ম। বাবা আব্দুল গফুর ও মা উম্মে কুলসুমের চতুর্থ সন্তান তিনি। আলীনগর মডেল ফ্রি প্রাইমারি স্কুল, ভোলা টাউন হাইস্কুল, চরপাতা হাইস্কুল আবার টাউন হাইস্কুল এবং শেষে নিয়ামতপুর হাইস্কুল মিলিয়ে এসএসসির মধ্যেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বাড়ির তিন দিকে ছিল পুকুর। দক্ষিণ আর পশ্চিমে নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল। বিশাল জোয়ার-ভাটার তরঙ্গ। যে তরঙ্গিত খালে সাঁতার কেটে, মাছ ধরে বেড়ে ওঠেছেন কবি। ভোলার পশ্চিমে সদুরচর, সেকমারচর, ভেলুমিয়ার চরসহ বিভিন্ন চরে তার দাদা-পরদাদার প্রচুর জমি ছিল। সেখানে কৃষিকাজ হতো। সমবয়সীদের সাথে নিয়ে কৌশলে গরুর লেজ ধরে উত্তাল তেঁতুলিয়া নদী পার হয়ে কবি পৌঁছতেন চরে। খালে ডুব দিয়ে ইয়া বড় বড় গলদা চিংড়ি ধরার স্মৃতি মনে করে কবি আজও উল্লসিত হয়ে ওঠেন। কবির ঘুম ভাঙত পাখির ডাক শুনে। কারণ প্রায় দুই কিমি আয়তনের বাড়িটা যে ছিল এক বিশাল বাগান। পড়ালেখার হাতেখড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি নাসির আহমেদ বলেন, ‘মায়ের কাছে পবিত্র কোরআনের সুরা আর অ-আ-ক-খ শেখার মধ্য দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে হাতেখড়ি। বাড়িতে আমাদেরকে পড়ানোর জন্য তিনজন লজিং মাস্টারের পাশাপাশি মাওলানা শামসুল হক সাহেবও তদারকি করতেন। মাওলানা সাহেব শিখিয়েছেন আজান আর কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি আদব-কায়দা। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিলেন আমার মা।’ কবির মা ছিলেন ব্রিটিশ যুগের সচেতন এক শিক্ষিত নারী। যার মামা সুফি হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও অধ্যক্ষ। যিনি বহু গ্রন্থের লেখক। ১৯২৬ সালে ইংরেজিতে এমএ করার পর তিনি বিটি ডিগ্রিও লাভ করেছিলেন। এমন শিক্ষিত পরিবেশেই কবির অতি শৈশবে মাতৃহারা মা বড় হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কবি বলেন, ‘মা বিয়ের পর আমাদের বাড়িটাকেও শিক্ষিত করেছিলেন।’ পঞ্চম শ্রেণী পাসের পূর্বেই মায়ের মুখে শুনে শুনে আরব্য রজনীর সহস্রাধিক গল্প মুখস্থ করেছিলেন কবি। জোছনার রাতে বাড়ির উঠোনে বসা গল্পের আসরে নাসির আহমেদের মা মধ্যমণি হয়ে রূপকথার গল্প শুনাতেন। ‘সালেহা’ উপন্যাসের দুই এতিম কিশোর-কিশোরী তাহের আর সালেহার নিপীড়িত জীবনের দুঃখে তখন অনেক কেঁদেছেন কবি। রাত জেগে মায়ের মুখে খায়রুল হাশর, শহীদে কারবালা, জঙ্গনামা, সোনাভানের পুঁথিসহ শত শত পুুঁথি শুনেছেন শৈশবে। স্বজনদের পানির পিপাসা নিয়ে মৃত্যুর প্রেক্ষিতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পানি পান না করার ঘটনা মনে হলে আজও কবির চোখে জল আসে। মায়ের মুখে শৈশবে-কৈশোরে কবিতা, গল্প, রূপকথা আর পুঁথির ছন্দ শুনতে শুনতে তখন থেকেই তার মনে ভিড় করতে থাকে হাজারো কল্প-কাহিনী। লুকিয়ে লুকিয়ে ছুটে যেতেন যাত্রাপালায়। ‘রহিম বাদশা’, ‘আপন দুলাল’ ও ‘আলোমতির’ পালা আজও তার স্মৃতিতে অম্লান। বেশ কিছুদিন যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। আলোমতির চরিত্র ছিল তাঁর খুবই পছন্দের। চুপিসারে অভিনয়ের কারণে মা-বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। একই সময়ে তিনি গানের চর্চাও শুরু করেন। শেখার পাশাপাশি তিনি এক পর্যায়ে গান লেখায়ও মনোযোগী হন। ভোলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন। তিন বছর পড়ার পর এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে শুরু করেন সাংবাদিকতা। পাশাপাশি রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের স্নেহ-আনুকূল্যে দৈনিক ইত্তেফাকের ‘কচি-কাঁচার আসর’-এ ছড়া, কবিতা ও গল্প লিখতে থাকেন। একাডেমিক লেখাপড়ায় দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় থেকে বাংলায় তিনি এমএ পাস করেন। সাপ্তাহিক গণমুক্তি দিয়ে শুরুর পর বাংলাদেশ বেতার, দৈনিক বাংলা, জনকণ্ঠ, সমকালসহ নানা গণমাধ্যমে পালন করেছেন গুরু দায়িত্ব। বর্তমানে দৈনিক বর্তমান-এ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বেতার-টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তার পাঁচ শতাধিক গান। ছোটদের জন্যও বহু গল্প-কবিতা-ছড়া লিখেছেন। বেশকিছু সিরিয়ালসহ খণ্ড নাটকও রচনা করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২। সাহিত্য অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১০), পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণু দে পুরস্কার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মাননা (১ম/২০১৩), কাব্যকলা পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পদক, মধুসূদন একাডেমির মাইকেল মদুসূদন দত্ত পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তরুণদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ হলো—মা-বোনকে মন থেকে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতে হবে। কারও সঙ্গে বেয়াদবি করা যাবে না। নিজেকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দেশ ও দেশের মানুষকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতে হবে। জ্ঞানার্জনের জন্যপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ভালো বই পড়তে হবে।