রাজশাহী মেডিক্যালে ৪৪ ঘণ্টায় ৩২ রোগীর মৃত্যু

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ইন্টার্নি চিকিত্সকদের অঘোষিত ধর্মঘটে রবিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৪৪ ঘণ্টায় ৩২ রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যা রামেক হাসপাতালে গড় রোগী মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি। এদের মধ্যে ১০ জন বিনা চিকিত্সায় মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল ওয়ার্ড মাস্টারের রেজিস্ট্রারে গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৪৪ ঘণ্টায় ৩২ রোগীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের বিনা চিকিত্সায় মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। ইন্টার্নি চিকিত্সকরা অঘোষিত ধর্মঘটে থাকায় ভেঙ্গে পড়ে হাসপাতালের চিকিত্সা ব্যবস্থা। রাতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিত্সকের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও ওই ঘটনার সময় কোন সহকারী রেজিস্ট্রার দায়িত্ব পালন করেননি। অধিকাংশ সহকারী রেজিস্ট্রার ইন্টার্নি চিকিত্সকদের সঙ্গে অঘোষিত কর্মবিরতি পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে দুইজন এবং ৮, ১০, ২৬ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে একজন করে রোগী বিনা চিকিত্সায় মারা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরমধ্যে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে শহিদুল ইসলাম, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে নাসির উদ্দিন ও সোলায়মান আলীর স্বজনরা ইন্টার্নি চিকিত্সকদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়ান। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। অভিযোগ উঠেছে, সোমবার বিকালে অক্সিজেন সরবরাহ না করায় ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে মারা যান নগরীর চণ্ডিপুরের বাসিন্দা ও রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মচারী শহিদুল ইসলাম। তার লাশ নিয়ে ওয়ার্ড থেকে ফেরার সময় বিক্ষুব্ধ স্বজনরা রামেক হাসপাতালের পরিচালক, উপ-পরিচালক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার কার্যালয়ের জানালার কাঁচ ভাংচুর করে। এছাড়া জরুরি বিভাগের এমএলএসএস মাসুদ ও ব্রাদার নাদিমকে মারপিট করে। পুলিশের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। শহিদুল ইসলামের স্বজন রফিকুল ইসলাম জানান, শ্বাসকষ্ট ও বুকের ব্যথা অনুভব করলে শহিদুল ইসলামকে রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে হূদরোগ বিভাগে (২৬ নম্বর ওয়ার্ড) পাঠিয়ে দেন। সেখানে রোগীর জরুরি অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে স্বজনরা অক্সিজেনের চিকিত্সককে পাননি। ১৩ মিনিট পরও অক্সিজেন না দেয়ায় শহিদুল ইসলামের মৃত্যু হয়। পরে অল্প সময়ের জন্য চিকিত্সক এসে শহিদুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা করে গা-ঢাকা দেন। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে মারা যাওয়া রোগী নাসির উদ্দিনের স্বজন ইলিয়াস আলী জানান, মাথার সমস্যার কারণে নাসিরউদ্দিনকে শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে তিনি ২ নম্বর ওয়ার্ডে নিউরো মেডিসিন বিভাগে ভর্তি ছিলেন। রবিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে তার অবস্থা খারাপ হয়। ওই সময় ওয়ার্ডে কোন চিকিত্সক না থাকায় তিনজন নার্স রোগীকে সুস্থ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালান। কিন্তু নাসিরউদ্দিনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। একই অভিযোগ রোগী সোলায়মানের স্বজনদেরও। সাংবাদিকদের উপর হামলার পরই ইন্টার্নি চিকিত্সকরা রামেক হাসপাতালে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন হাসপাতালের মধ্যম সারির চিকিত্সক ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রাররা। রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিত্সকরা মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত কাজে যোগ না দিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিত্সকরা অবশ্য দায়িত্বে ফিরেছেন। তবে সার্বিকভাবে হাসপাতালে চিকিত্সা ব্যবস্থায় অচলাবস্থা কাটেনি। বিনা চিকিত্সায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসিরউদ্দিন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিনা চিকিত্সায় হাসপাতালের হূদরোগ ও নিউরো মেডিসিন বিভাগে দুইজন রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ করা হলেও তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, উত্থাপিত অভিযোগ সঠিক নয়। ওই সময় হাসপাতালে ইন্টার্নী চিকিত্সকরা দায়িত্বে না থাকলেও সহকারী রেজিস্ট্রারসহ অন্য চিকিত্সকরা রোগীদের চিকিত্সা দিয়েছেন। হাসপাতালে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে রামেক হাসপাতাল বক্স পুলিশের ইনচার্জ মিজানুর রহমান মিজানসহ সকল সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। হাসপাতাল চিকিত্সক-কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাত ১০টার দিকে তাদের প্রত্যাহার করে রাতেই এসআই তৈয়বুর রহমানকে ইনচার্জ হিসাবে দায়িত্ব দিয়ে হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে।