হামাস-ফাতাহ মতৈক্য ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই পর্যন্ত যেই সকল উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে তাহার সংখ্যা আন্তর্জাতিক যেকোন সঙ্কট নিরসন প্রচেষ্টার সংখ্যাকে অতিক্রম করিয়া যাইবে। গত প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ব্যাপী মধ্যপ্রাচ্যের ঐ অঞ্চলে শিশু মৃত্যুসহ যে মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়াছে তাহাও উল্লেখ করিবার মত। আন্তর্জাতিক উদ্যোগে এই পর্যন্ত ষোলটি শান্তি চুক্তি করা হইয়াছে যাহার প্রত্যেকটিই দুই পক্ষের অনাগ্রহে কার্যকারিতা হারাইয়াছে বারংবার। বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির পেছনে ফিলিস্তিন যেমন ইসরায়েলের অবৈধ স্থাপনা এবং তাহার অযাচিত বিস্তৃতিতে দায়ী করে তেমনি ইসরায়েল তাহাদের স্থাপনা নির্মাণে বৈধতার প্রশ্নটি এড়াইয়া গিয়া তাহাদের প্রতি ফিলিস্তিন এবং মুসলিম বিশ্বের অস্তিত্ব অস্বীকারকে দায়ী করে। ফিলিস্তিনী জনগণের পক্ষাবলম্বনকারী আরব দেশগুলির সহিত ইসরায়েলের এই পর্যন্ত তিন বার যুদ্ধ বাঁধিয়াছে যাহার প্রতিটিতেই আরবদের পরাজয় ঘটে এবং ইসরায়েল তাহার অবস্থানকে মিত্রদের সহায়তায় আরও পাকাপোক্ত করিতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখিয়াছে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের পর হইতে শান্তি আলোচনায় বাধা হিসাবে ইসরায়েল ও তাহার পশ্চিমা মিত্রগণ হামাসকে সামনে লইয়া আসিয়াছে যাহা ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্তি এবং ফাতাহ-এর অস্বীকারে একটি ভিন্নমাত্রা পায়। সংগঠনটির কার্যকলাপকে উগ্রপন্থা হিসাবে উল্লেখ করিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের অন্যান্য মিত্রগণ ইহাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সংগঠনটি ক্ষমতায় থাকিতে পারিবে না বলিয়া মত দেয়, ইহার পরেই ক্ষমতায় রহিয়াছে আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দিলে ইসরায়েলি মিত্রগণ ইহাতে হতাশা ব্যক্ত করে। কিন্তু বারংবার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত বুধবার অকস্মাতই ফাতাহ-হামাস অতীতের সকল ভেদাভেদ ভুলিয়া গিয়া ছয় সপ্তাহের মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করিতে সম্মত হইলে ইসরায়েলতো বটেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইহাতে পুনর্বার হতাশা ব্যক্ত করিয়াছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত হামাসের সহিত ফাতাহ-এর আপসরফা নূতন সঙ্কটের জন্ম দেবে বলিয়া শান্তি প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আপাত বিরতির কথা বলিয়াছেন অর্থাত্ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির মধ্যস্থতায় ইসরায়েল- ফিলিস্তিন শান্তি প্রচেষ্টা আবারও বাধাগ্রস্ত হইল। তবে এইবার সংঘর্ষের কারণে নহে বরং নিজেদের ঐক্যের কারণে। প্রশ্ন হইল, হামাস যেখানে ফাতাহ-এর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং যদি সেই ফাতাহই হামাসকে সংগঠনটির ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’ হইতে সংবরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে তাহা হইলে এই ঐক্যের মাঝে একটা ইতিবাচক অর্থ খোঁজা যাইতেই পারে। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলিয়াছেন, হামাসের সহিত ঐক্য ইসরায়েলের সহিত শান্তি আলোচনায় কোন প্রভাব ফেলিবে না। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এক মুখপাত্র বলিয়াছেন, তাহারা এই মুহূর্তে ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নীতি’ গ্রহণ করিয়াছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইহার আগে ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হামাসকে তাহার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধের আহ্বান জানাইয়াছেন। কাজেই সংগঠন দুইটির ঐক্যের ফলে হামাসকে আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড হইতে নিবৃতের দায়িত্ব এখন বিশেষভাবে বর্তাইয়াছে ফাতাহ-এর উপর। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল ঐক্যের ঘোষণা দেওয়ার পর ইসরায়েল গাঁজায় আবারও রকেট হামলা চালাইয়াছে যাহাতে শিশুসহ ১২ জন আহত হইয়াছে। এই মুহূর্তে সকল পক্ষেরই উত্তেজনা পরিহার করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। খোলাখুলি আলোচনা ব্যতীত দীর্ঘমেয়াদী শান্তির আর কোন পথ নাই। তবে এইক্ষেত্রে ‘কৌশলগত নীতি’ নহে বরং ‘মানবতা বোধ ও সমঝোতার নীতি’ই অঞ্চলটিতে কাঙ্ক্ষিত শান্তি বহিয়া আনিতে পারে।