রাজা, তোমার পোশাক কই
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪২
একাত্তর থেকে ২০১৪, বছরের হিসেবে ৪৩ বছর। সে সময়কার জনগোষ্ঠীর বেশ বড় একটা অংশ বেঁচে আছেন এখনো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাদের কারও কাছ থেকে শুনে জানতে হয় না। আবার তার থেকে অনেক বড় একটা অংশ রয়েছে যারা একাত্তর দেখেনি। সেটাই স্বাভাবিক। দিন যায় আর নতুন মানুষের সংখ্যা বাড়ে। এবং এটাও স্বাভাবিক যে, মানুষের একটা ছোট্ট জীবনে সব কিছু নিজের চোখে দেখা সম্ভব নয়। পড়ে বা শুনেই জানতে হয় বেশি। তবু সেই নতুন মানুষের বেশ বড় একটা অংশ এই কথা বলে যে, আমি তো তখন জন্মাইনি, আমি কী করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানব? কোথায় দাঁড়িয়ে কথাটা বলছ হে? তুমি কারবালার কথা জান কী করে? কুরুক্ষেত্রের কথা জান কী করে? এ ভাবেই আমি প্রশ্ন করি তাদের। মনে আছে, একবার অফিসের কাজে রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত একটা এলাকা থেকে ছোট্ট একটা লঞ্চে চেপে আমি রাঙ্গামাটিতে ফিরছি। কাছেই গোটা কয়েক চাকমা ছেলে বসে কথা বলছে। ওদের একজন বলছিল, ‘দেশে সরকার বদল হয়, আর দেশের ইতিহাসও বদলে যায়। আমরা সত্যিটা তাহলে জানব কী করে?’ ছেলেটাকে ডেকে বলেছিলাম, ‘এই আমার আনন্দ যে তুমি সত্যের খোঁজ করছো। কারও কথা বিশ্বাস করো না, নিজে খোঁজো, নিজে পড়, নিজে বিচার কর, নিজেই সত্যিটা খুঁজে পাবে। উপাদান ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।’
এই পুরনো কথাটা কেন তুলছি? কারণ ২০.৪.২০১৪ তারিখের খবরের কাগজে (জনকণ্ঠ) এই খবরটা আছে যে, মাননীয়া ম্যাডাম খালেদা জিয়া শ্রমিক দলের কাউন্সিল অধিবেশনে এই খবরটি পরিবেশন করেছেন যে, আওয়ামী লীগ হচ্ছে সীমানা পাড়ি দেয়া দল, মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হল বিএনপি।
আমি স্তম্ভিত হয়ে ভেবেছি, কোথায় আছি আমরা। সেই অধিবেশনে কী এমন একজনও ছিলেন না যিনি প্রশ্ন করতে পারেন বিএনপির জন্ম কখন ম্যাডাম? মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দলের জন্মই হয়নি, সে দলটি কী করে মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হয়? ম্যাডাম কি দেশের সবাইকে পাগল ভাবেন? এ কথা অবশ্য শুনেছি যে, পাগল নিজেকে ছাড়া আর সব্বাইকে পাগল ভাবে। কথাটা অবশ্য সে জায়গাতেও নয়, বরং এই খানে যে, সেখানে কেউ এ প্রশ্নটি করেনি। কেন করেনি? সাহস নেই বলে? ইতিহাস জানে না বলে? কারণটা যাই হোক, বিষয়টা ভয়াবহ। সে কারণেই আমরা পাগলের প্রলাপ বলে সব কিছু অগ্রাহ্য করতে পারছি না।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তারেক জিয়ার বলা প্রলাপ এবং তার স্পর্ধাও সেখানকার উপস্থিত মানুষজন সয়ে নিয়েছে। এখানকার টিভি চ্যানেলের টক শো গুলোতেও সে সব নিয়ে কম কথা খরচ হয়নি। আমি অবাক হয়েছি সেখানে খুব জরুরি একটা কথা কেউ কেন বলেননি ভেবে। (অথবা হয়ত কেউ বলেছেন। আমি তো আর সব টক শো দেখে উঠতে পারিনি)। কথাটা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের ইতিহাস বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো কী কালিতে লিখেছে? সেটা তো আজ যে কেউই জানতে পারেন। কারণ ঘটনার ত্রিশ বছর পর একটা দেশের কাছে রক্ষিত দলিলপত্র সে দেশের সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসও আজ বিশ্বে উন্মুক্ত। দেখুন না কেন ব্রিটেন কী লিখেছে, আমেরিকা কী লিখেছে, স্বয়ং পাকিস্তান কী লিখেছে? দূরবীন চোখে লাগিয়েও মেজর জিয়া বা বিএনপি’র নাম কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে এমন কেষ্টবিষ্টুর জন্ম নেয়া সম্ভব না, যে টাইম মেশিনে করে ৪৩ বছর আগে ফিরে গিয়ে নিজের ইচ্ছে মত সব ইতিহাস বদলে দিয়ে আসবে। ইতিহাসকে মাটি দিয়ে চাপা দেয়া যায় না। সে চেষ্টা করে কেবল মাত্র আহম্মকের অধম আহম্মকরা। আর ব্যর্থ হয়।
আমার বিস্ময় এখানেও যে, বিএনপি’তেও এমন মানুষ আছেন, যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, অথবা স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। তারা কি সব কিছু বিস্মৃত হয়েছেন? সত্যের কাছে কি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই? এটা আরও ভয়াবহ। গুন্ডাকে গুন্ডা বলে চিনতে পারলে তার থেকে বাঁচার একটা চেষ্টা করা যায়। বন্ধু বেশে গুন্ডা যদি ছুরি মারে তার হাত থেকে বাঁচা কঠিন। বিএনপি’র পক্ষে তাই সহজ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সব মূল্যবোধগুলোকে একে একে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ শহীদের একজনও বিএনপি যে দেশটা চায়, সে দেশটির জন্য জীবন আহুতি দেননি।
একবার স্বনামধন্য শ্রদ্ধেয় আলী যাকের চ্যানেল আই’তে তার ‘আলোয় ভুবন ভরা’ অনুষ্ঠানে কেমন করে যেন আমার মতো অভাজনকে ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি সবাইকে যেমন বলেন আমাকেও একটা শেষ কথা বলতে আদেশ করেন। আমি বলেছিলাম, সবাইকে সত্যিকারের মানুষ হতে হবে। ইতিহাস জানতে হবে। নিজের শিকড়ের খবর না জানলে দেশকে ভালোবাসা যায় না। ফাঁকা মাথা হচ্ছে ভয়ঙ্কর গ্রেনেডের মত। তাকে যে কেউ নিজের স্বার্থে সে রকম করেই ব্যবহার করতে পারে। সে কাজটাই হচ্ছে এ দেশে। পক্ষান্তরে যে ইতিহাস জানে তার কাছে তো মিথ্যে বলে পার পাবার উপায় নেই। কিছু মানুষের মত নেহাত্ বিবেক বিক্রি করে না দিলে সে প্রতিবাদী হয়ে উঠবে।
আমি সারা জীবন সেই সব সত্যিকারের মানুষের স্বপ্ন দেখেছি। দেখি এখনো, যারা সব কোলাহলের ঊর্ধ্বে গলা তুলে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারে, ‘রাজা তোমার পোশাক কই?’
লেখক :কথাসাহিত্যিক