বিদায়, কাতালান যোদ্ধা

১৯৮৪ সালের সাধারণ এক বিকেলে ডি’এমপোরদা নামে গ্রাম থেকে কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে বার্সেলোনা শহরে এসেছিল কিশোর ছেলেটি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পা দেয়া লিকলিকে ছেলেটির স্বপ্ন ছিল তখন বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পাওয়া। তারপর দেখতে দেখতে তিনটে দশক পার হয়ে গেল। ওই লা মেসিয়ার বিন্দুশে বিন্দুতে ছড়িয়ে রইলো তার চিহ্ন, স্বপ্নের বার্সেলোনার স্বপ্ন-সারথী হয়ে উঠলো সেদিনের সেই ভীরু কিশোর। হয়ে উঠলেন বার্সেলোনা, তথা ফুটবল বিশ্বের প্রিয়তম মানুষ। কিন্তু নিয়তি সব গল্পের শেষটা রূপকথা হতে দেয় না। তাই রূপকথা হয়ে উঠলো না ‘মারকুইস’ নামে সেই ছেলেটির জীবন। হঠাত্ করেই ওপরের ডাক চলে আসায় জীবনের সিংহভাগটা বাকী রেখে সেই বার্সেলোনা শহর থেকেই চিরতরে পরপারে পাড়ি জমালেন তিনি। চলে গেলেন বার্সেলোনার ‘সন্তান’, বার্সেলোনার অভিভাবক এবং সারাবিশ্বের অন্যতম প্রিয় ফুটবল ব্যক্তিত্ব টিটো ভিলানোভা— ফ্রান্সিস ভিলানোভা আই বায়ো! প্রায় আড়াই বছর ধরে দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর গত পরশু, শুক্রবার বার্সেলোনার একটি হাসপাতালে ৪৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বার্সেলোনার এক ঐতিহাসিক যুগের কান্ডারি টিটো ভিলানোভা। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে গেল রোমান্টিক এক কাতালান যোদ্ধার সংগ্রামী জীবন। টিটো ভিলানোভা খুব বড় কোনো খেলোয়াড় ছিলেন না, কোচ হিসেবেও সাফল্য তার মাত্র একটি লা লিগা জয়। দলিলপত্রে চোখ বুলিয়ে আপনি টিটো ভিলানোভাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এই মাতামাতির ব্যাখ্যা খুঁজে পাবেন না। বুঝতে পারবেন না কেন এই ‘মিডিওকোর’ মানুষটির প্রয়াণে এভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেল ফুটবল বিশ্ব। সেটা বুঝতে গেলে আপনাকে বার্সেলোনা ও টিটো ভিলানোভার গাঁটছড়া বন্ধন এবং ভিলানোভার ব্যক্তি জীবনের সংগ্রামটা একটু বুঝতে হবে। জন্মসূত্রেই কাতালান ভিলানোভা ফুটবল বস্তুটায় লাথি মারতে শেখার পর থেকেই কাতালানদের গর্বের প্রতীক বার্সেলোনায় আসার স্বপ্ন দেখতেন। বাড়ির পাশের ফিগারেসে আয়োজিত বার্সেলোনার এক ট্রায়ালে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েও গেলেন। তারপর সেই ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বার্সেলোনার অ্যাকাডেমি ‘লা মেসিয়া’য় চলে এলেন। আর এখানেই পরিচয় হয়ে গেল লা মেসিয়ার একই ব্যাচের আরেক ছাত্র জোসেপ গার্দিওলার সঙ্গে। সেই আসলে বিশ্বকাঁপানো এক বন্ধু জুটির জন্ম হয়ে গেল। পরের প্রায় তিন দশক ধরে দুই শরীর, এক আত্মা হয়ে জীবন কাটিয়েছেন দুই বন্ধু—গার্দিওলা ও ভিলানোভা। দু’জন একসঙ্গে বার্সেলোনার যুব দলে খেলেছেন; সিনিয়র দলে একসঙ্গে দুটি প্রীতি ম্যাচও খেলেছেন। কিন্তু ভিলানোভা ঠিক গার্দিওলার মানের ফুটবলার ছিলেন না। বন্ধু গার্দিওলা যখন ইয়োহান ক্রুইফের বার্সেলোনা সোনালী দলের হয়ে খেলছেন, তখন কাতালোনিয়ারই ছোট ছোট দলে ফুটবল ভাগ্যের সন্ধান করে চলেছেন ভিলানোভা। অবশেষে ২০০১ সালে খেলা ছেড়ে দেয়ার পর বন্ধুর পরামর্শেই বার্সেলোনা কোচিং অ্যাকাডেমিতে চলে এলেন। এখানে খুব দ্রুত সাফল্যও দেখালেন। ফলে কর্তৃপক্ষ তাকে বার্সেলোনার অনূর্ধ্ব-১৪ দলটির দায়িত্ব দিয়ে দিলো। এই দল সাজাতে গিয়ে ভিলানোভা লা মেসিয়ার আবাসিক ছাত্রদের ভেতর থেকে জেরার্ড পিকে, সেস ফ্যাব্রিগাসদের খুঁজে বের করলেন। আরেকটা কাজ করলেন। সাইড বেঞ্চে বসে থাকা রোগা একটা ছেলের ওপর বাজি ধরে তাকে মূল একাদশে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কে সেই রোগা ছেলেটি? লিওনেল আন্দ্রেস মেসি! মেসি ২০১২ সালে এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে টিটোর অবদান সম্ভবত অন্য যে কারো চেয়ে বেশী। ওই প্রথম মানুষ, যে আমার ওপর আস্থা রেখেছিল। ও না থাকলে আমি কখনোই মূল একাদশে খেলতে পারতাম না।’ শুধু মেসিকে আলোয় আনার জন্যই ভিলানোভাকে স্মরণ করা যেত। কিন্তু ভিলানোভা গল্পের আসল অংশ তখনও বাকী। বার্সেলোনার কোচিং অ্যাকাডেমি থেকে বেরিয়ে প্যালাফ্রুগেল, তেরেসার মতো দু’একটা ছোট দলে কোচিং করিয়েছেন। তবে সবকিছু ছেড়ে আজীবনের জন্য আবার বার্সেলোনায় ফিরে এলেন ২০০৭ সালে। আবারও সেই বন্ধু গার্দিওলার ডাক। এবার বার্সেলোনার যুব দলে গার্দিওলার সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। যুব দলকে চ্যাম্পিয়ন করার পুরস্কার হিসেবে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের কোচিং দলের বদলে গার্দিওলা-ভিলানোভাদের দেয়া হল মূল দলের দায়িত্ব; শুরু হল ইতিহাস। পরের চার বছরে এই জুটি বার্সেলোনাকে ১৪টি ট্রফি জিতে দিয়েছেন! এর গোপনে গোপনে একটা ঘটনা ঘটে গেল। বাইরের দুনিয়া না জানলেও গার্দিওলা ও বার্সেলোনার ম্যানেজমেন্ট জেনে গেল, টিটো ভিলানোভার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। সে জন্যই কী টিটোকে শেষ স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দিতে সরে গেলেন গার্দিওলা? হতেও পারে, নাও পারে। তবে টিটো সুযোগটা দু’হাত ভরে নিলেন। যে টিটো গার্দিওলার আড়ালে হারাতে বসেছিলেন, তিনি রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে বার্সেলোনাকে যেন তুলে নিতে চাইলেন আরও আরও ওপরে। পয়েন্টের রেকর্ড গড়লেন, গোল ব্যবধানের রেকর্ড করলেন; সবচেয়ে বড় কথা ‘বিরক্তিকর’ বলে সুর উঠে যাওয়া গার্দিওলার টিকিটাকা ফুটবলকে আরও আক্রমণাত্মক এবং রোমাঞ্চকর করে তুললেন ভিলানোভা। হয়তো আরও কিছু স্বপ্ন ছিল, হয়তো আরও কিছু লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন। কিন্তু ২০১২-১৩ মৌসুমের শেষ দিকে এসে দফায় দফায় অস্ত্রোপচার আর সহ্য করতে পারছিলেন না। অবশেষে মৌসুম শেষে বার্সেলোনাকে আরও একবার কাঁদিয়ে কোচিংই ছেড়ে দিলেন। চিকিত্সা চলছিল যুক্তরাষ্ট্রে। একটু সুস্থ বোধ করায় গত কিছুদিন বার্সেলোনাতেই ছিলেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে শরীরটা বেশী খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হল ভিলানোভাকে। তারপর? তারপর নিয়মিত আরেকটা গল্প শোনালো। দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বক্তৃতায় বলেছিলেন, ফুটবল মাঠে লড়তেই জন্মেছেন তিনি। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে থাকা বার্সেলোনা ফুটবলার এরিক আবিদালের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘ওর মতো করে লড়তে চাই আমি।’ আহ্। কী নির্মম ইতিহাস। আবিদাল এখনও লড়ছেন। কিন্তু চলে গেলেন টিটো। কেন চলে গেলেন? খেলা যে এখনও শেষ হয়নি, টিটো! যে ছিলেন টিটো পুরো নাম: ফ্রান্সিস ভিলানোভা আই বায়ো ডাক নাম: টিটো পরিবার: স্ত্রী-মন্তসে চাউরে, কন্যা-চার্লোটা, পুত্র-আদ্রিয়া (বার্সেলোনা যুব দলের ডিফেন্ডার) জন্ম: ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৮; কাতালোনিয়া, স্পেন মৃত্যু: ২৫ এপ্রিল, ২০১৪; বার্সেলোনা, স্পেন খেলোয়াড়ী দল: বার্সেলোনা-বি. ফিগারেস, সেলটা, বাদাজোজ, মায়োরকা, লেইডা, এলচে, গ্রামেনেত কোচিং দল: পালাফ্রুগেল, বার্সেলোনা-বি, বার্সেলোনা অর্জন: ২০১২-১৩ লা লিগা, লা লিগার ইতিহাস সেরা ১০০ পয়েন্টের মালিক, বার্সেলোনার ইতিহাস সেরা গোলগড় এবং সহকারী কোচ হিসাবে ৪ বছরে ১৪টি ট্রফি শোকস্তব্ধ ফুটবল . . . একজন ভালো মানুষকে মাঝপথে জীবন হারাতে হল। সে সত্যিই একজন ভালো মানুষ ছিল। কারো বিপক্ষে কখনো কিছু করেনি, নিজের কাজটা মন দিয়ে করতো। ওর সামনে অর্ধেক জীবন পড়ে ছিল। এ অবস্থা টিটোর চলে যাওয়াটা অনেক বড় ক্ষতি। আমি নিজের ওর সঙ্গে মিশে জানি; এমনকি ও যাদের বন্ধু ছিল, তারাও মানুষ হিসেবে ওর ভক্ত ছিল। —ভিসেন্তে দেল বস্ক যেভাবে আমরা একসঙ্গে লড়েছি, একসঙ্গে বেঁচেছি, একসঙ্গে মিশেছি; সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। ভালো থেকো কোচ। দারুণ লড়েছ তুমি। —এরিক আবিদাল এই লোকটাকে আমরা কীভাবে ভুলবো! তুমি আমাদের বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে, টিটো। তোমার পরিবারের প্রতি ভালোবাসা রইলো, আমাদের ওদের লক্ষ্য রাখবো। সারাজীবন তোমার পাশে থাকার কথা দিয়েছিলাম, তাই থাকবো —লিওনেল মেসি একজন মহান মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। টিটোর পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা —রাফায়েল নাদাল টিটো ভিলানোভার চলে যাওয়াটা বার্সেলোনার জন্য, তার পরিবারের জন্য, বন্ধুদের জন্য এক ভয়াবহ শোকের খবর। তার চলে যাওয়াটা ফুটবলের জন্যই এক শোকের খবর —হোসে মরিনহো ফুটবল বিশ্বের জন্য এ এক গভীর দুঃখের দিন। টিটো আমাদের সামনে শক্তি ও অনুপ্রেরণার এক উদাহরণ হয়ে ছিলো। তুমি শান্তিতে ঘুমাও, টিটো। —ইকার ক্যাসিয়াস আমাদের সবার জন্য এক দুঃখের দিন। আমার হূদয় থেকে টিটো ভিলানোভার পরিবার ও বন্ধুদের সমবেদনা জানাচ্ছি। —রাদামেল ফ্যালকাও শান্তিতে থেকো, টিটো। ফুটবলের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি —গ্যারেথ বেল শান্তিতে ঘুমাও, টিটো। আমার পরম শ্রদ্ধা রইলো —নেইমার এক অসামান্য লড়াকু যোদ্ধা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। শান্তিতে থেকো, টিটো —ফার্নান্দো তোরেস যা দিয়েছ, সবকিছুর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। বড় অসময়ে চলে গেলে তুমি। তবে তোমার সঙ্গে যে অসাধারণ সব সময় কাটিয়েছি, সারাজীবন মনে থাকবে। তুমি সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থাকবে, টিটো। —জেরার্ড পিকে যা উপহার দিয়ে গেছ, সবকিছুর জন্য অজস ধন্যবাদ, কোচ। মাঠে আর মাঠের বাইরে তুমি আমাদের উদাহরণ ছিলে। তোমাকে ভুলবো না —কার্লোস পুওল আমি নির্বাক। তুমি আমাদের আদর্শ ছিলে, তাই থাকবে। তোমাকে ভোলা সম্ভব না। —আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ক্যান্সারকে আমি অভিশাপ দেই। তুমি আমাদের কাছে থেকে প্রিয় মানুষটাকে কেড়ে নিয়েছ। তবে যত যাই কর, তার স্মৃতিকে, ভালোবাসাকে কেড়ে নিতে পারবে না। —তেয়ো ১৪ বছর আগে তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। আমি আজ বুকে হাত রেখে বলতে পারি, জীবনে তোমার মতো মানুষ খুব একটা পাইনি। আমার ওপর যে বিশ্বাস রেখেছিলে, যেভাবে আমার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা নিয়েও মাথা ঘামিয়েছ; সবকিছুর জন্য অনেক ধন্যবাদ। —সেস ফ্যাব্রেগাস টিটো ভিলানোভার চলে যাওয়ার খবর শুনে আমি শোকাহত। এতো প্রতিভাধর, এতো প্রিয় একটা মানুষ এতো অল্প বয়সে চলে গেল! —গ্যারি লিনেকার টিটোর পরিবার ও বন্ধুদের পাশে আছি আমরা। সে ছিল লড়াইয়ের এক প্রেরণার নাম —সার্জিও রামোস কী ভয়ানক সংবাদ! টিটো, তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকবে —বোজান কির্কিচ