এবিএম মূসা: তাঁর জীবন-দর্শন

আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় প্রথিতযশা সাংবাদিক এবিএম মূসা বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। শারীরিক নানান জটিলতার কারণে মোটেও স্থির হতে পারছিলেন না। শারীরিক শক্তি কেবলই নিঃশেষ হয়ে আসছিল। জীবন চলার পথের নিস্তব্ধতা আর নিঃশব্দতায় অনুমান করা যাচ্ছিল তিনি হয়ত আর বেশিদিন আমাদের মাঝে থাকবেন না। চলে যাবেন সেই পরপারে- সেই বার্তা বড় নিকটে। দীর্ঘ অসুস্থতার ধারাবাহিকতায় ২৯ মার্চ তিনি ফের ল্যাবএইড হাসাপাতালে ভর্তি হন। পরিবার পরিজন, শুভার্থী, গুণমুগ্ধ এবং সারাদেশে তাঁর অসংখ্য ভক্তরা আশায় বুক বাঁধলেও সাংবাদিকদের এই অভিভাবকের আর ফিরে আসা হয়নি। ৯ এপ্রিল দুপুরে এই প্রথিতযশা সাংবাদিককে ইহজগত্ থেকে চিরবিদায় নিতে হয়। ঐ দিন লাইফসাপোর্ট খুলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। অবসান হয় বর্ণিল, বর্ণময় চরিত্রের এক দুর্দান্ত কলমযোদ্ধার। যিনি কিনা জীবনের শেষ অব্দিও জনগণের অধিকার আর গণতন্ত্রের বিষয়ে ছিলেন উচ্চকিত ও আলোকিত এক কণ্ঠস্বর। শ্রদ্ধেয় এবিএম মূসার ইকবাল রোডের নিকটবর্তী এলাকায় আমার বসবাস। মোহাম্মদপুরে আমার বাসা থেকে তাঁর বাসার দূরুত্ব মাত্র কয়েকশ’ গজ। তাঁকে চিনি সেই কৈশর থেকে। বরাবরই নিরহংকার, নিপাট এক মানুষ। কয়েক বছর আগেও দেখেছি ছোট্ট একটা গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে ঘুরতেন মোহাম্মদপুর এলাকাতে। টাউন হলে গিয়ে নিজে বাজার করতেন। হেঁটে হেঁটে ইকবাল রোডের মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তে যেতেন। সম্প্রতি এই মহান মানুষটির সাথে খানিকটা নৈকট্যও হয়েছিল আমার। অবশ্য এর আগে টেলিভিশনের টকশোতে তাঁর ইতিহাস বিস্মৃত আলাপচারিতা, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার দৃঢ়তা দেখে যারপরনাই আমি মুগ্ধ হই। সেই মুগ্ধতা আমাকে বড় বেশি তাঁর কাছে টেনে নিয়ে যায়। স্বভাবতই একটা সুযোগ খুঁজছিলাম এই অনন্য, বরেণ্য গুণী সাংবাদিক, কলমযোদ্ধা, সমাজের উচ্চকিত কণ্ঠস্বরকে যেনো আরও কাছ থেকে গভীরভাবে দেখতে পারি। গত বছর এটিএন বাংলা ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে সংসদীয় বিতর্কের আদলে ‘স্টুডেন্ট পার্লামেন্ট’ প্রতিযোগিতা চলছিল। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। ১৩ জুলাই একটি পর্বে অংশগ্রহণ করবে আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। বিতর্কের বিষয় মহাজোট সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে। প্রতিযোগিতায় আমরা একজন প্রধান অতিথি খুঁজছিলাম এরকম যে, যিনি কিনা রাজনৈতিক মতপার্থক্যসহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে বিষয়টি মূল্যায়ন করবেন। যা থেকে তরুণ বিতার্কিকরা নতুন ধারণা আর চিন্তার উত্স খুঁজে পাবেন। প্রধান অতিথি খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়লো মহান সাংবাদিক এবএিম মূসার নাম। মনে হলো এই মানুষটিই বিষয়টির উপর সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবেন। মূসা ভাইয়ের ফোন নাম্বার জোগার করলাম দ্রুত। তাঁকে ফোন করলাম এবং উনার সাথে বিষয়টি নিয়ে দেখা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম। বিষয়টিতে উনি সাঁয় দিলেন। এক সন্ধ্যায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর আমন্ত্রণপত্র নিয়ে উনার বাসায় যাই। দেখা করলাম তাঁর সাথে। বিনয়ের সাথে অনুষ্ঠানের কথা বলে তাঁর মতামত চাইলাম। তিনি এমন একটি অনুষ্ঠানের কথা শুনে বেশ উদীপ্ত হলেন। অতঃপর সায় ও সম্মতি দিলেন এই বলে যে, তিনি অনুষ্ঠানে আসবেন। তিনি যথার্থই আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। আমরা যে ধরনের ডিবেট অনুষ্ঠান করি সে ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে তাকে কখনই যেতে দেখিনি। স্বভাবতই এবিএম মূসার মতো বর্ষীয়ান, খ্যাতনামা সাংবাদিক আমাদের অনুষ্ঠানে আসবেন, খুশির ইয়াত্তা নেই। ১৩ জুলাই আমাদের প্রতিযোগিতার দিন, একই সাথে অনুষ্ঠানটির রেকর্ড হবে। উনি সময়মতো বসুন্ধরা সিটিস্থ এটিএন বাংলার স্টুডিওতে এলেন। মাথায় টুপি পড়ে এসেছেন। তখনও শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো না। ধীর পায়ে হাঁটছেন। তাঁকে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিলেন। অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে একটি ফুলের তোড়া তুলে দেয়া হলো। এবিএম মূসা ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান মঞ্চে উঠলেন। আমাদের বিতার্কিকরা চোখের সামনে সাংবাদিকতার এই মহান পুরুষকে দেখে যারপরনাই অভিভূত হলেন। অনেকেই তাঁর সাথে ছবি তুললেন। অনুষ্ঠান শুরু হলো। ছায়া সংসদের আদলে ‘স্টুডেন্ট পার্লামেন্ট’ সরকারি আর বিরোধী দলের বিতার্কিকরা তুখোড় বক্তব্য রাখলেন। দু’পক্ষই বাকযুদ্ধের ঝড় তুললো। এবার প্রধান অতিথির বক্তব্য। পুরো অডিটরিয়ামে নিস্তব্ধতা। সবাই উনার বক্তব্য শোনার জন্যে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন। দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিতর্কের বিষয়ের উপর নিজের বক্তব্যের শুরুতেই বললেন, ‘শুধু একটি পতাকার জন্যে এদেশ স্বাধীন হয়নি। এ দেশে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে অবশ্যই প্রধান দুটি দলের মাঝে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি। দেশে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ দু’দলের মাঝে রাজনৈতিক সংলাপ করে সব বিভক্তি কমিয়ে আনা। সংলাপের মধ্যে দিয়েই সব সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে হবে। বিভক্তি নয়, সমঝোতার রাষ্ট্র তৈরি করাটাই এখন জরুরি। এবিএম মুসা আরো বললেন, কোন সরকার কতোটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে তা এখন একটি গণভোট দিলেই পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।’ বর্তমান সরকার প্রসঙ্গে বললেন, সরকার যদি এখনও দলের প্রবীণ নেতাদের গুরুত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনা করে তাহলে বর্তমান ব্যর্থতা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারবে। তিনি বার বার বিভক্তির বদলে রাজনৈতিক সমঝোতার উপর জোর দিলেন। তিনি সমস্ত বিভক্তি পরিত্যাগের কথা বললেন। আমরা দেখলাম এই ছোট্ট মঞ্চে বসেও তিনি ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতার উপর জোর দিলেন। বরং যা বললেন দৃঢ়চিত্তেই। এবিএম মূসার বড় পরিচয় সাংবাদিক হলেও জীবনের শেষলগ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যায়ের এক তুখোড় প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে। যা সত্য তাই বলেছেন নির্বিবাদে, নির্বিঘ্নে। ভালো-মন্দের তোয়াক্কা করেননি। কোনো স্বার্থের দিকেও তাকাননি। ফলে সমসাময়িক সময়ে যেটা সত্য, ন্যায্য সেটাই মুখে বলতে চেয়েছেন এবং বলেছেনও। বিশেষ করে রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি কখনই নিশ্চুপ থাকেননি। টকশো বা বিভিন্ন আলোচনাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন সত্য কথাগুলো। ফলে জাতির এক অনন্য বিবেকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। সত্য কথা বলতে গিয়ে তিনি বিরাজভাজন হয়েছেন ক্ষমতাসীনদের দ্বারা। এ কারণে শাসকগোষ্ঠীর অনেকেরই নানান উক্তি, কটুক্তিও তাকে শুনতে হয়েছে। তবে তিনি কখনই দমেননি, হার মানেননি। নিজের বিশ্বাস আর আদর্শকে বরাবরই উপরে তুলে ধরেছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও সত্য কথা বলতেই তিনি পছন্দ করতেন। মৃত্যুর আগে তিনি টকশোতে যেমন সরব ছিলেন- তেমনি পত্র-পত্রিকায়ও লিখেছেন। টকশোতে সবসময়ই তুলনামূলক নতুন চিন্তার কথা বলতেন। কখনই কাউকে খুশি করার জন্য কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি খুশি হলো বা না হলো তা তিনি কখনই ভাবেননি, ভাবতেনও না। ফলে আমরা দেখতে পেয়েছি কট্টর রাজনৈতিক অনুসারীদের অনেকেই তাঁর সমালোচনায় মেতে উঠেছে। কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচরণও করেছেন। সমসাময়িক রাজনীতির উচ্চমানের এক বিশ্লেষক ছিলেন তিনি। রাজনীতিকদের ভুল ধরিয়ে দেয়া আর গণতন্ত্রের ভুল যাত্রার সমালোচনা করেছেন তিনি সবসময়। তবে আর তাই জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও কথা বলেছেন, মাথা নত করেননি কারো কাছে। অনেক অরাজনৈতিক সভার মধ্যমণি হয়ে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। সরকারের নির্মোহ সমালোচনা করেছেন। স্পষ্টভাষী প্রিয় মানুষ এবিএম মূসা চলে গেলেন। তাঁর একটি কথা এখনও হূদয় মাঝে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বার বার- ‘শুধুমাত্র একটি পতাকার জন্যে এদেশ স্বাধীন হয়নি।’ লেখক: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি kirondebate@gmail.com