মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রচার যার সাধনা
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২০:১০
নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের আমাদের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা এবং স্বদেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর এক তরুণের নাম মুহাম্মদ তানভীর। এ লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন—বৃত্তান্ত ’৭১ ফাউন্ডেশন। তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে লিখেছেন সৈয়দ শিশির
মুহাম্মদ তানভীর। ১৯৮১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা শহরের ঠাকুরপাড়ায় তার জন্ম। পেশা ব্যবসা। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দ্রোহ বিলাস লি.-এর তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বর্তমানে তিনি বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের কর্মময় জীবন নিয়ে নির্মাণ করছেন গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্যচিত্র। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ফ্রান্স, স্পেন, ভারত ও বাংলাদেশে তথ্যচিত্রটির শুটিং চলছে।
এত কর্মব্যস্ত মানুষটির ধমনীতে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। নতুন প্রজন্মকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশদভাবে জানাতে এবং মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন বৃত্তান্ত ’৭১ ফাউন্ডেশন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ধরনের সংগঠন প্রতিষ্ঠার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০২ সালের শুরুর দিকে প্রথমে এ ধরনের সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রম পরিচালনার কথা ভাবতে শুরু করি। বিশেষ করে সেই সময়টাতে যখন দেখতে পেলাম যে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকাররা পাজেরো গাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা নিয়ে ঘুরে, সংসদে জোর গলায় কথা বলে—এমন সব দুঃখবোধের তাড়া নিয়েই শুরু করি এর কার্যক্রম। তখন মনে হয়েছিল এসব প্রতিরোধ করতে হলে অবশ্যই নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সম্পর্কে জানাতে হবে, সচেতন করে তুলতে হবে। তখন থেকেই শত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু করি। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের হাতে তুলে দিতে শুরু করি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক তথ্যনির্ভর বিভিন্ন মূল্যবান বই। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ২৩ জুলাই। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।’
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সংগঠনটির প্রতিনিধি রয়েছে। যারা কেন্দ্রের নিদের্শ মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠানে ‘মুক্তির উত্সব’ আয়োজন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র-প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ মুখে যুদ্ধের গল্প বলার আয়োজন, বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত পুস্তক বিতরণ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কুইজ, রচনা, চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ই-মেইল ঠিকানাসহ চিঠির বাক্স স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যে বাক্সে ছাত্র-ছাত্রীরা মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্ন প্রদান করবে। পরবর্তীতে প্রশ্নকর্তার কাছে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রশ্নে উত্তর পৌঁছে দেওয়া হবে।
সংগঠনটির স্লোগান হলো—‘মুক্তিযুদ্ধ আমার পরিচয়’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে (১৭ মার্চ) প্রতিবছর সংগঠনটির নিয়মিত উত্সবের আয়োজন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ তানভীর জানান, ‘গত বছর এ উপলক্ষে আমরা ‘চিঠি উত্সব’-এর আয়োজন করেছিলাম। যে উত্সবে শিশু-কিশোররা বঙ্গবন্ধু সমীপে প্রতীকী চিঠি লিখেছে। তাদের নির্বাচিত চিঠিগুলো নিয়ে পরবর্তীতে আমরা ‘প্রতি, জাতির পিতা’ শীর্ষক সংকলন প্রকাশ করেছি।’ সংগঠনটি পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামক বইসহ আরও বিভিন্নজনের লেখা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রায় ৩৫,০০০ বই শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি ও যেকোনো ধরনের নাশকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী লক্ষাধিক প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হরতালে কিংবা কোনো ধরনের নাশকতার শিকার অসহায়দের আর্থিক সহায়তায় পাশাপাশি চিকিত্সা সেবাও প্রদান করা হয়ে থাকে। তাদের নিজস্ব চিকিত্সা কেন্দ্রটির নাম ‘সেবা কুটির’। বিভিন্ন সময়ে ছিন্নমূল ও পথশিশুদের জন্য ওষুধ, শীতবস্ত্র ও খাদ্য বিতরণ করা হয়। সম্প্রতি শুরু করা হয়েছে ‘মুক্তির অভিযাত্রা’ শীর্ষক এক বিশেষ কার্যক্রম। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমার ভাবনা’ শীর্ষক এক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
নিজেদের কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এদেশকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত স্বনির্ভর এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’ এই পথচলায় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীলদের নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হলেও তিনি থমকে দাঁড়াননি। বলা যায়, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলছে। সংগঠনটির খরচের প্রায় অর্ধেক তানভীর একাই বহন করেন। এজন্য তিনি নিজের জমিও বিক্রি করেছেন। তার উদ্দেশ্য সফল হোক—এমনটি সময়ের দাবি।