ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ সেন্টার

অবশেষে ‘‘সিসিডিবি’’ নামক একটি এনজিও’র উদ্যোগে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। মার্চ (২০১৪) মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্রেড ফর দি ওয়ার্ল্ড এবং ডাইকোনিয়া দাতাগোষ্ঠীর সদস্যরা ঢাকাস্থ সিসিডিবি’র নির্বাহী পরিচালক জয়ন্ত অধিকারীর সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এ উপলক্ষে ঢাকায় আগত ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট-এর উপ-পরিচালক চন্দ্র ভূষণ বলেছেন, Bread for the World is planning to establish an `International Climate Change Center’ for capacity building, knowledge sharing and alternative technologies in Bangladesh as one of most vulnerable countries.’ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ে এই কেন্দ্রটি হবে পথনির্দেশক। কেন্দ্রটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়তা করবে, অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকে কমিয়ে আনার দিশা দেখাবে ও স্বল্প কার্বন নিঃসরণের পথ বাতলে দেবে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য জলবায়ুকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবে। জলবায়ু অভিযোজনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, আর এজন্য বিশেষজ্ঞ দরকার। একইসঙ্গে টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি, বনাঞ্চল বেষ্টনী, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে হবে। এসবই গবেষণা পরিচালনার অপরিহার্য উপাদান। এছাড়া পারস্পরিক মতবিনিময়ের জন্য দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সকলকে এ কেন্দ্র এক জায়গায় উপস্থিত করবে। অবশ্য বর্তমান সরকার এর আগের আমলে ক্ষমতায় থাকার সময় প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ও বনাঞ্চল রক্ষা, পানিসম্পদের উন্নয়ন, নৌপথের নাব্যতা রক্ষা এবং সেচ সমপ্রসারণের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছিল বহুমুখী পদক্ষেপ। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মধুমতি, গড়াই, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীর দীর্ঘ নৌ-পথসমূহের নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। মধুমতি ও গড়াই নদী খননের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণাক্ততা হ্রাস, সুন্দরবন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব হচ্ছে। উপকূলীয় বাঁধ সংরক্ষণ, মজবুতকরণ ও সমপ্রসারণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের অন্যতম হিসেবে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা-২০০৯। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। বাস্তবায়িত হচ্ছে বহুমুখী কর্মসূচি। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আগে যে ইশতেহার দিয়েছিল তাতেও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু অঙ্গীকার রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগসমূহ অব্যাহত থাকবে এবং সমপ্রসারিত হবে। ২০০৯ সালে সরকারের গৃহীত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা মূল্যায়ন এবং হালনাগাদ করা হবে। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডে অর্থবরাদ্দ অব্যাহত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক উত্স হতে সহায়তা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান বন সংরক্ষণ, নতুন বন সৃজন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূল ও চরাঞ্চলে টেকসই বনায়নের কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে পরিবেশের অধিকতর বিপর্যয় রোধ করার উদ্দেশ্যে উল্লি¬খিত পদক্ষেপ ছাড়াও পানিসম্পদ রক্ষা, নদী খনন, নদীর ভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা রোধ ও খরা মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে। সেচ সুবিধা সমপ্রসারণ, লবণাক্ততা রোধ, সুন্দরবনসহ অববাহিকা অঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ স্মরণীয় এই ইশতেহারের কোথাও আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কোনো নির্দেশনা কিংবা পরিকল্পনার কথা উচ্চারণ করা না হলেও সম্প্রতি (এপ্রিল, ২০১৪) দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব এবং বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। একারণে দুর্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যই বারবার ওই ইশতেহারে বলা হয়েছে ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ’। তবে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের দরকার রয়েছে এটাও বর্তমান সরকার উপলব্ধি করেছে। কারণ ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ’ এদেশে সংঘটিত দুর্যোগগুলোর ইতিহাস দুঃখ ও দীর্ঘ কষ্টের ইতিহাস। ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৯১ সালের ভয়ঙ্কর সাইক্লোন, ১৯৮৮, ১৯৯৭, ১৯৯৮ সালের মারাত্মক বন্যা এবং ১৯৬৮, ১৯৮৯, ২০০৭ (সিডর) এবং ২০০৯ (আইলা) সালের টর্নেডো মানুষকে নিঃস্ব করে দেয় আর সবুজে ঘেরা জনপদ পরিণত হয় বিধ্বস্ত নীলিমায়। অর্থাত্ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে সংঘটিত প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আর ‘আইলা’য় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় জনপদ। দুর্যোগের আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয় গ্রামের পর গ্রাম। গৃহহারা হয় অজস্র খেটে খাওয়া মানুষ। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সেখানেই ঘটে সলিল সমাধি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় কয়েক বছর ফসল হয়নি। ধান আবাদের চেষ্টা করেও সফল হয়নি কৃষক। মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেছে। অনেকস্থানে বালু স্তূপ আকারে জমে আছে। আবাদি জমি ৬০ ভাগ এখনো পতিত। একইভাবে ১৯৭০ সালে ৩ লাখ ও ১৯৯১ সালে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতিসাধন হয়। ১৯৮৮ ও ১৯৯৭-৯৮ সালের বন্যায় দুই তৃতীয়াংশ এলাকা জলমগ্ন হলে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল সে পরিস্থিতির কথা এখনো মানুষের মনে আছে। এই যে বাস্তবতা, এই বাস্তবতার কথা ঢাকা শহরের ক’জন মানুষ জানেন? কতটুকু সচেতন আমাদের সারাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী? এই বাস্তবতার নিরিখে দেশে আজ নির্মিত হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ সেন্টার’। খুলনায় প্রতিষ্ঠিত এই সেন্টারটি হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক। কারণ দুর্যোগ মোকাবিলায়, স্বল্পমাত্রায় গ্যাস নিঃসরণে, স্থানীয় অভিযোজন কৌশল তৈরিতে, যথার্থ প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষকে আশার আলো দেখাবে গবেষণা কেন্দ্রটি। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাফল্য অর্জিত হলে এ ধরনের সেন্টার দেশের জন্য গৌরব বয়ে নিয়ে আসবে। ( লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email : writermiltonbiswas@gmail.com)