শতবর্ষী জব্বারের বলী খেলা
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৬
কালের পরিক্রমায় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বহু মূল্যবান সম্পদ হারাইয়া গিয়াছে। কিন্তু গোটা একটি শতাব্দীর সকল ঝড়-ঝাপটা প্রতিহত করিয়া বিশাল এক বটবৃক্ষের মতো আজও সগর্বে টিকিয়া আছে চট্টগ্রামের জব্বারের বলী খেলা। বিষয়টির বহুমাত্রিক তাত্পর্য উপেক্ষা করিবার মতো নহে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর শতাধিক বর্ষ আগে, ১৯০৯ সালে, একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রাখিয়া এই বলী খেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করিয়াছিলেন। সেই উদ্দেশ্যটি ছিল, তত্কালীন পরাধীন বাংলার যুবসমাজকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা। আর ইহার জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার যে কোনো বিকল্প নাই সেই সত্যটি তিনি তখনই অনুভব করিয়াছিলেন। ভাবনাটি কতখানি মাটিলগ্ন ও দূরদর্শী ছিল শতবর্ষ পরেও এই উদ্যোগটিতে সাধারণ মানুষের অভাবনীয় অংশগ্রহণদৃষ্টে তাহা সহজেই অনুমান করা চলে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে ১০৫তম যেই বলী খেলাটি অনুষ্ঠিত হইয়া গেল, তাহাতেও দেশের নানা প্রান্ত হইতে নানা বয়সী শতাধিক কুস্তিগীর অংশগ্রহণ করিয়াছেন। সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, উদ্যোগটি কুস্তিখেলার গণ্ডি অতিক্রম করিয়া দেশের বৃহত্তম লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলায় পরিণত হইয়াছে বহু আগেই। প্রতিবারের মতো এইবারও এক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া বৈশাখী মেলা বসিয়াছে। আর সেই মেলায় রকমারি কৃষিজাত ও লোকজ পণ্যসম্ভার লইয়া দূরদূরান্ত হইতে ছুটিয়া আসিয়াছেন গ্রামীণ কৃষক, চারু-কারুশিল্পী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ। তিনদিনব্যাপী এই মেলায় একদিকে যেমন মানুষের ঢল নামে, অন্যদিকে তেমনি চলে বড়ো ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেনও। যুগ যুগ ধরিয়া এইভাবেই চলিয়া আসিতেছে। বলী খেলাকেন্দ্রিক এই বৈশাখী মেলাটিই হইয়া উঠিয়াছে বিপন্নপ্রায় আমাদের লোকজ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পণ্যসম্ভারের এক অনবদ্য বিজ্ঞাপন। বিশ্বায়নের প্রবল ঝড়ো হাওয়াও এইক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো আঁচড় ফেলিতে পারে নাই। কারণ ইহার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই যে অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনা বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় তাহার গুরুত্ব অপরিসীম। মেলা ও বলী খেলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। একদা দেশের আনাচেকানাচে এই ধরনের অসংখ্য মেলা হইত। সেই মেলাকে কেন্দ্র করিয়া শুধু যে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির চাকা সচল হইয়া উঠিত তাহাই নহে, সেই সাথে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতারও ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ ঘটিত। রচিত হইত মানবিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। উদ্বেগের বিষয় হইল, বাণিজ্য ও বিনোদনের এইরূপ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যগত ও সাংস্কৃতিক সম্পদ ইতোমধ্যে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির সম্মিলিত চাপে অবশিষ্ট সম্পদগুলিও কতদিন টিকিয়া থাকিবে বলা মুশকিল।
ইহা অনস্বীকার্য যে, পরিবর্তন শাশ্বত এবং অপ্রতিরোধ্য। সভ্যতার এই শিখরস্পর্শী অগ্রযাত্রার মূলেও রহিয়াছে এই পরিবর্তন। অতএব, ইহাতে ভীত হইবার কিছু নাই। তবে পার্বত্য জলস্রোত যেমন পলিমাটির পাশাপাশি অনেক ক্ষতিকর আবর্জনাও বহিয়া আনে, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পরিবর্তনের উদ্দাম স্রোতে দেশের প্রাণশক্তি যেন চাপা পড়িয়া না যায় সেইদিকে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে যে, সেই প্রাণশক্তির আধার হইল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। নিরন্তর গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়াই তাহার সমৃদ্ধি ঘটে। সভ্যতা আগাইয়া যায়। অগ্রযাত্রার এই মূলমন্ত্রটি হইল— ভালোকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ভিতরেও নগরে নূতন রূপে গ্রামীণ মেলার বিপুল পুনরুজ্জীবন এবং লোকজ সংস্কৃতি ও পণ্যসামগ্রীর প্রতি দেশেবিদেশে যে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হইতেছে— তাহা নিঃসন্দেহে সেই সমৃদ্ধ ভবিষ্যতেরই বার্তাবহ। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সফল সমন্বয়ে গড়িয়া উঠা ইতিবাচক এই ধারাটিকে সর্বতোভাবে সচল রাখাই হইল এই সময়ের সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জ।