গরমে থাকুন সতেজ
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৯
গ্রীষ্মের এই সময় রোদের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করে না। গরমের কারণে সারাদিন এক অস্বস্তি নিয়েই কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হয়। এই সময়ে নিজেকে সতেজ রাখতে প্রয়োজন কিছু প্রস্তুতির। তার জন্য খাবার অভ্যাস থেকে শুরু করে পোশাক বাছাই করতে গেলেও রাখতে হবে সচেতনতা। গরমে সতেজ থাকার পরামর্শ নিয়ে এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
গ্রীষ্মের তাপের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে বৈশাখী হাওয়া। প্রচণ্ড গরমের আঁচ এসে আছড়ে পড়ছে শরীরে। গ্রীষ্মের এই দাবদাহ থেকে রক্ষা পেতে সময়োপযোগী আরামদায়ক পোশাক বেছে নিচ্ছে সবাই। গরমের পোশাকটা হালকা ও আরামদায়ক হওয়াই ভালো। খেয়াল রাখতে হবে পোশাকটা যেন তাপ শোষণ করে কম। তাই প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য সুতি কাপড়ই আরামদায়ক। এ ছাড়া লিনেন দুপিয়ান, ভয়েল, মসলিন, চিকেন ও তাঁতের কাপড় গরমের জন্য বেশ উপযোগী। উত্সবে পরতে পারেন কৃত্রিম মসলিন বা পাতলা চোষা কাতান। গরমে চোখের আরাম বলেও একটা কথা আছে। সেদিক থেকে ভাবলে সাদা রঙই আদর্শ। তারপরও হালকা গোলাপি, জলপাই সবুজ, শ্যাওলা সবুজ, হালকা নীল, হালকা হলুদ, ঘিয়ে এসব রঙের হালকা শেড এবং টারশিয়ারি রঙগুলোও গরমে উপযোগী। কালো বা গাঢ় রঙের পোশাক একেবারেই নয়। কারণ এসব রং অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে। ছেলেদের জন্য গরমে প্রিন্টেড বা চেক কাপড়ের শার্ট আরামদায়ক। কাপড়টা শতভাগ সুতি হলেই ভালো। আর ধরনটা হবে হাওয়াই। এই সময়ে প্রতিদিনের জন্য হাফ হাতা শার্ট বা টি-শার্টই দরকার। আর সব সময় পরার জন্য দেশি সুতি কাপড়ের ক্যাজুয়াল শার্ট বেশ আরামদায়ক। সুতির মধ্যে ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড়ের শার্টের চল এখন আবার দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবি, ফতুয়া ও শালের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এখনকার সব বয়সী পুরুষের কাছে জায়গা করে নিয়েছে খাদি কাপড়ের শার্ট বা ফতুয়া। সুতি তাঁতের কাপড়, এন্ডি সুতি, নিট কাপড়, পাতলা আদ্দি, ভয়েল কাপড়সহ অন্যান্য পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে খাদি কাপড়ের শার্ট-ফতুয়া চলে এসেছে নিত্যকার জীবনযাত্রায় আর তারুণ্যের লাইফস্টাইলে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন বলতে শুধু শার্ট ফতুয়ার রং-ঢং, নকশা ও আকারে। গরমের দিনে এ শার্ট ফতুয়াগুলো বেশ আরামদায়ক। সহজে বাতাস চলাচল করে বলে কাজের সময় এসব শার্ট পরতে ভালোই লাগে। এ ছাড়া বেড়ানো বা জার্নিতে খাদির শার্ট বা ফতুয়া পরলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়।
পোশাক নির্বাচন
চাইলে কম খরচে নিজেও বানিয়ে নিতে পারেন গরমের হালকা পোশাক। বিভিন্ন শপিং সেন্টারগুলো থেকে পছন্দমতো কাপড় কিনে টেইলার্স থেকে অর্ডারের মাধ্যমে পোশাক তৈরি করা যায়। বর্ণিল লেইস, চুমকি, ফিতা দিয়ে নারীর পছন্দের পোশাক রাঙিয়ে তুলছেন দর্জিরা। ক্রুশের লেসের জালি জালি নকশাটা গরমের জন্য ভালো। হালকা একরঙা গজ কাপড় কিনে গলায় বা জামার সামনের অংশে এবং হাতে ক্রুশ কাটের লেস বসালে ভালো লাগবে। আবার সালোয়ারের নিচ থেকে ছয় ইঞ্চি ওপরেও লেস বসাতে পারেন। কামিজের হাতা স্লিভলেস বা ম্যাগি করতে পারেন। রোদ এড়াতে থ্রি কোয়ার্টার বা ফুল হাতা বানানো যায়। সেক্ষেত্রে জামার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মসলিনের কাপড় ব্যবহার করুন। ডিজাইনটাও একটু অন্য রকম হবে। একরঙা পোশাক পরতে না চাইলে সুতি চেক কাপড়ের কামিজ বানানো যেতে পারে। তবে চেক কাপড়ে কামিজের চেয়ে ফতুয়াই বেশি ভালো লাগবে। এ ছাড়া বাটিক, চিকেন বা টাইডাইয়ের পোশাকও গরমে আরামদায়ক।
যেমন হবে রূপচর্চা
গরমে মেয়েদের সাজসজ্জার ক্ষেত্রে কানে মুক্তার ছোট দুল এবং গলায় সরু চেইনের সঙ্গে মুক্তার লকেট পরতে পারেন। তা ছাড়া পাথরের টপ বা ছোট ঝুমকা পরতে পারেন। বড় দুল একদম এড়িয়ে চলুন। হাতে হালকা একটা ব্রেসলেট থাকতে পারে। পায়ে আংটি বা পায়েল থাকতে পারে। চুল উঁচু করে পনিটেলও করতে পারেন বা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়েও আটকে রাখতে পারেন চুলটা। দিনে কি রাতে, এই ঋতুতে আপনার মুখকে সতেজ রাখতে হালকা মেকআপের উপর নির্ভর করুন। আর কেমন মেকআপ হবে, তারও সহজ পদ্ধতি আছে। ত্বকের রং যা-ই হোক, এই সময় কড়া মেকআপ কারও বেলাতেই ভালো নয়। তাই দিনে-রাতে প্রয়োজন ও পরিবেশ বুঝে হালকা মেকআপই স্বস্তিদায়ক। মেকআপ সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে পরিচ্ছন্ন, নিখুঁত ত্বকে। তাই যথাসম্ভব মুখটা পরিষ্কার রাখা দরকার। বিশেষ করে মেকআপের আগে খুব ভালো করে মুখটা ধুয়ে নিতে হবে। পরিষ্কার মুখে ময়েশ্চারাইজার ও টোনার লাগিয়ে চার-পাঁচ মিনিট রাখুন। দিনের মেকআপে রুক্ষ ত্বকে ময়েশ্চারাইজার দরকার হলেও তৈলাক্ত ত্বকে তা দরকার নেই। এরপর সানস্ক্রিন লোশন লাগাবেন ত্বকের ধরন অনুযায়ী। মুখের কোথাও কালো, কোথাও সাদা হলে কালো অংশে (যেমন চোখের নিচে, ঠোঁটের চারপাশে, থুঁতনি, কপালের দুই পাশ) কনসিলার লাগাতে হবে। বাজারে নানা রকম কনসিলার পাওয়া গেলেও এই গরমে ম্যাট কনসিলার সবচেয়ে ভালো। কনসিলার কেনার সময় ত্বকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে কিনলেও যদি দেখেন দাগ ঢাকছে না, তবে কনসিলারের রং এক শেড বাড়িয়ে দেবেন। ফাউন্ডেশন বা কমপ্যাক্ট ফেস পাউডারও গায়ের রঙের চেয়ে সর্বোচ্চ এক শেড উজ্জ্বল হতে পারে, এর বেশি নয়। রুক্ষ ত্বকে বিশেষত পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব যারা, তারা তরল ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন।
যা খাবেন
গরমে এ শারীরিক সুস্থতা রক্ষা করতে খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। গরমে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিক পুষ্টির লক্ষ্যে যে দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে তা হলো—
প্রথম ও প্রধান সাবধানতা হলো বাইরের খোলা জায়গার পানি, শরবত, আখের রস পরিহার করা। এগুলো গ্রহণের ফলে সৃষ্ট ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস আপনার আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে মৃত্যু ঝুঁকিও বহন করে।
নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি পান করা, ঘরের তৈরি শরবত, পানিসমৃদ্ধ শাক-সবজি ও ফল বেশি খাওয়া। উল্লেখ্য, ডাব, তরমুজ, বাঙ্গি, বেলের শরবত এগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে খেতে হবে। এবং অবশ্যই খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
গরমে মাছ, মাংস, ভুনা, ভাজি, খিচুরি, পোলাও, ফাস্টফুড কমিয়ে পাতলা আম ডাল, পাতলা দুধ, টকদই, করলার তরকারি, লেবু-চিনির শরবত, সালাদ, রসালো ফল খাওয়া উচিত।
গরমে পোলাও, বিরানি, খিচুরি, পরোটা থেকে সাদাভাত অনেক বেশি ভালো।
যারা নিয়মিত হাঁটেন, তাদের শুধুমাত্র সময় পরিবর্তন করলেই চলবে। যেমন সকালে না হেঁটে বিকাল বা সন্ধ্যার পর হাঁটা খুব স্বস্তিকর হবে।
গরমে খুব বেশি হাঁটা, ব্যায়াম, অত্যধিক পরিশ্রম, অত্যধিক খাদ্য গ্রহণ পরিহার করুন।
আরাম দায়ক পোশাক পরুন। হালকা রঙের পোশাক বেছে নিন।
নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
কিছু টিপস
রোদ এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে ছাতা ব্যবহার করুন। তবে অবশ্যই কালো রংয়ের ছাতা নয়।
সবসময় সুতির কাপড় ব্যবহার করুন।
বাইরে যাওয়ার আগে ও বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করুন।
গরম থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফুল স্পিড ফ্যানের নিচে দাঁড়াবেন না কিংবা গোসল করবেন না।
সুযোগ পেলেই একটু পানি খেয়ে নিন। ঘাম বেশি হলে স্যালাইন খেয়ে নিন।
ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিন।
বাজারে গিয়ে তরমুজের মতো রসালো ফল কিনতে ভুলবেন না।
এ সময় কোনো অবস্থাতেই বাসি খাবার খাবেন না।
ঘামাচি চুলকাবেন না।
ফেরিওয়ালাদের বিক্রি করা শরবত কিংবা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি করা আখের রস খাবেন না।
গরমকালে শুধু শরীরই নয়, যখন-তখন মাথাটাও গরম হয়ে যায়। মেজাজ তাই দ্রুত চটে যায়। এ ছাড়া দুর্বল লাগা, হাত-পা ম্যাজম্যাজ করা, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, কর্মস্পৃহা কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। গরমে তাই অহেতুক মেজাজ গরম না করে ঠাণ্ডা মাথায় এই পরামর্শগুলো মেনে নিজেকে রাখুন সতেজ।