সন্তান যখন অবাধ্য

বিভিন্ন কারণে আপনার সন্তানের আচরণ পরিবর্তন হতে পারে। একান্ত বাধ্যগত সন্তানটিও কখনো আপনার সঙ্গে অসভ্য আচরণ করে বসতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে আপনার করণীয় সম্পর্কে জানাচ্ছেন ফয়জুল আল আমীন জন্মের পর থেকেই যে সন্তানটিকে আপনি বিনয়ী, নম্র ও ভদ্র হিসেবে দেখে আসছেন, তাকে হঠাত্ করে অবাধ্য হতে দেখে আপনি নিশ্চয়ই অবাক হবেন। আপনি হয়তো বা ভাবতে থাকবেন তাকে কড়া শাসন করতে হবে। কিন্তু না। এক্ষেত্রে প্রথমেই আপনাকে যে কাজটি করতে হবে তা হলো সন্তানের আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করা। তা-না করে আপনি যদি তার সঙ্গে কঠোর আচরণ শুরু করেন তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনার আদরের সন্তানটি হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি বেশি জেদি ও অবাধ্য। শিশুদের প্রত্যেকের স্বভাব এক ধরনের হয় না। কেউ ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার বাধ্য থাকে, আবার কারো প্রকৃতিগত ভাবেই কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারীরা নিজেদের প্রবৃত্তিগত মতামত স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করতে চায়। নিজেদের ইচ্ছামতো চলতে চায়। আর এক্ষেত্রে মা-বাবা তাদের স্বাধীনতায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করলে তারা তা সহজে মেনে নিতে পারে না। তাদের মনে সাংঘাতিক রকমের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ক্ষেত্রবিশেষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নিষেধ শুনতে শুনতে তাদের মনে তৈরি হয় এক ধরনের ‘পাওয়ার গেম’। তখন তারা স্বকীয়তা বজায় রাখার লক্ষ্যে শুরু করে ‘ফোর্স’ অ্যাপ্লাই। দিনে দিনে জেদি হয়ে ওঠে। নানা ধরনের বায়না ধরে। মুখে মুুখে তর্ক করে। তাদের মনে হয় যে, মা-বাবা কিংবা বড়রা তাদের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে। যৌক্তিক কোনো কারণে তাদের সঙ্গে মনের অজান্তে তর্ক করার ফলে তারা মন থেকে আদর-স্নেহ করছে না, কেউ তাদের ভালোবাসছে না। যে ভাবনা তাদের আরও জেদি করে তুলে। সন্তান মুখে মুখে তর্ক করে—একতরফা এমন অভিযোগ করাও উচিত নয়। যে বিষয়টি নিয়ে সে তর্কে লিপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা যায়, তাকে সেই বিষয়টি শান্তভাবে বুঝাতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে সন্তানটি তার চারপাশের জগত্ দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে। মনে হাজারো প্রশ্ন আর নানা আবেগ-অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। যদিও পরিপক্বতার অভাবে বিষয়গুলো যথাযথ উপায়ে প্রয়োগ করতে পারছে না। তাই কঠোর শাসন না করে বুঝিয়ে বলাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ধরুন, আপনার সন্তানটি ভোর পাঁচটায় খেলার মাঠে যাবে বলে জেদ ধরল। কিন্তু আপনি তাকে যেতে দেবেন না। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে, যখন তার বন্ধুরা খেলার মাঠে থাকবে, তখনই সে মাঠে যেতে চাইবে। বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর ফাঁকা মাঠে সে কেন যাবে? তবু তাকে নিষেধ করার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ থাকলে তাকে অবশ্যই বুঝিয়ে বলতে হবে। এতে করে দু’দিন পরে হলেও সে আপনার নিষেধাজ্ঞা মেনে নিবে এবং আপনার সঙ্গে তর্ক করার বা জেদ ধরার কারণে অনুতপ্ত হবে। অনেক সময় টিভি দেখে বাচ্চারা কোনো বাজে কথা শিখে। যা জেদের সময় উচ্চারণ করতে থাকে। এমন হতে পারে যে, সে কথাটির কোনো মানে না বুঝেই বলছে। এক্ষেত্রে তাকে শাসন না করে বলা যেতে পারে, ‘তুমি এত্ত বোকা! টিভিতে বাজে লোকটি যা বলেছে তুমি তা বলছ কেন? লোকে তোমাকে মন্দ বলবে।’ ফলে ধীরে ধীরে সে বাজে কথাটি বলা বন্ধ করে দিবে। বাচ্চাকে যদি টিভি দেখার নেশায় পেয়ে বসে তো তাকে বারণ করে কিংবা টিভি বন্ধ করে দিয়ে ফেরানো যাবে না। বরং আপনি তাকে বলতে পারেন, ‘দেখো, বেশি করে ওই বোকা বাক্সটা দেখো। তাহলে তুমিও একদিন বোকা হতে পারবে। তোমাকে দেখে লোকে তখন হাসবে।’ এ কথা শোনার পর বাচ্চাটি নিশচয়ই নিজেকে চালাক কিংবা বুদ্ধিমান প্রমাণের জন্য অন্তত পড়াশোনার সময় টিভির সামনে গিয়ে বসবে না। আপনাদের জরুরি কোনো কাজ বা আলোচনার সময় কোনো কারণে যদি আদরের বাচ্চাটি লাফালাফি, হৈচৈ কিংবা বিরক্ত করে তবে উত্তেজিত হবেন না। এক্ষেত্রে তার মানসিকতা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। তাকে বলতে পারেন, ‘ড্রয়িং রুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো তোমাকে কত সুন্দর দেখাচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা ছড়া পাঠ কর, আরও মজা পাবে। তোমার নানা ভাই এলে অভিনয় করে ছড়া শুনাতে পারবে।’ নানাকে খুশি করার জন্য হলেও সে ছড়া পাঠ করতে থাকবে। এ সময়ে নিজেদের কাজ শেষ করে গিয়ে তাকে আরও উত্সাহ দিন। আপনার প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ হয়তো বা যত্ন করে ওয়ার্ড্রোবের উপর রেখেছেন। কিন্তু আদরের বাচ্চাটি জেদ ধরেছে এসব কাগজেই সে ছবি আঁকবে। এক্ষেত্রে রেগে না গিয়ে তাকে বুঝিয়ে বলুন, ‘এসব অফিসের কাগজপত্র। নষ্ট করলে চাকরি চলে যাবে তোমার বাবার। তখন তোমার জন্য জন্য খেলনা আনবে কী করে?’ এতে করে কিছুটা হলেও তার মনের পরিবর্তন ঘটবে। অযথা তার মনে রাগ, হতাশা জন্মাবে না। সর্বোপরি, কোনো অবস্থাতেই বাচ্চার গায়ে হাত তুলবেন না। কারণ ওটা ওর সংশোধনের কোনো পদ্ধতিই নয়। ওর যুক্তি শুনতে, জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। ওর আবেগ, অনুভূতির গুরুত্ব দিতে হবে। জেদ চাপলে বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। শান্ত সংযত থেকে তার ভুলগুলো তাকে ধরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই তাকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।