বিড়ম্বিত চিকিত্সা প্রার্থী!

দেশে একের পর এক চিকিত্সক ধর্মঘট চলছে। অতি সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে বারডেম, মিটফোর্ট এবং রামেক হাসপাতালে যেসব ঘটনা ঘটে গেল, এক কথায় তা ন্যক্কারজনক। এতোদিন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা পরস্পর যেভাবে মারামারি করে আসছিলেন এবারে চিকিত্সকরাও একই কালচারে জড়িয়ে পড়লেন। হাসপাতাল চত্বরে চিকিত্সকরাও মানুষ পিটিয়ে রক্তে রঞ্জিত করে দিলেন। লাঠিসোটা হাতে তারাও দাঙ্গা-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ছেন। সাংবাদিকরা সেখানে ফটো তুলতে গিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই মারামারি করতে যাননি। কিন্তু লাঠি হাতে চিকিত্সকদের আক্রমণের দৃশ্য দেখে দেশ ও জাতি বুঝতে পেরেছেন, চিকিত্সকরা আজ কোন পথে! তারা চিকিত্সাকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকবেন, সময়মত যাবেন না বা অপ-চিকিত্সা করলেও ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ করলে বা সাংবাদিকরা প্রমাণ সংগ্রহ করতে গেলে তাদের ধরে পেটাবেন! প্রায় বিশ বছর আগে দৈনিক জনকণ্ঠের “চতুরঙ্গ” কলামে আমি একটি বিরাট কলাম লিখে চিকিত্সকদের অপকর্মের কিছু চিত্র তুলে ধরেছিলাম। আজ ছোট করে তেমন দু’টি ঘটনা তুলে ধরবো। ১. অনেকদিন আগে একটি নতুন সরকারের নতুন একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় পরদিন তার বাসায় গিয়ে দেখি বাসার সামনে কমপক্ষে একট্রাক ফুল স্তূপাকারে পড়ে আছে। এপিএসকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম গতকাল মন্ত্রীর নাম ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে রাতভর ডাক্তার সাহেবরা এসে এসব ফুলের তোড়া দিয়ে গেছেন। সকাল ১০ টায় মন্ত্রীর বসার ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম বারান্দাসহ সে ঘরের কোথায়ও ঠাঁই নেই। অনবরত আরো ডাক্তার আগমন দেখে চোখ কপালে উঠলো। ভাল ভাল পোশাকে সেজেগুজে আসা নারী-পুরুষ ডাক্তারদের এহেন ভিড় দেখে মনে হলো এসব ডাক্তার সাহেবরা ডিউটিতে ফিরবেন কখন, নাকি তারা সবাই ছুটি নিয়ে এসেছেন? মন্ত্রী সাহেব রুমে ঢুকতেই তাদের তদ্বির শুরু হয়ে গেলে মন্ত্রী বললেন—আমি একেবারে নতুন, আমাকে এখানে দিয়েছে কিন্তু আমি কিছুই জানি না, অফিসে গিয়ে দেখি-শুনি তারপর আপনাদের তদ্বির শুনবো। আমি এসব দেখেশুনে প্রমাদ গুনে একমিনিটে কুশল বিনিময় করেই চলে এলাম আর ভাবলাম, ঐসব ডাক্তার সাহেবরা ডাক্তারী পড়ার সময় এবং সনদ গ্রহণের সময় যে শপথ গ্রহণ করেছিলেন তাদের কাজের সাথে সেই শপথের বিন্দুমাত্র মিল আছে কি না? যদি থাকে, তাহলে দলে দলে শতশত ডাক্তার এভাবে মন্ত্রীর সাথে দেখা করতে এসেছেন কেন? ২. ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত একজন রোগী গেলে সাথে সাথে তাকে ভর্তি হতে বলায় রোগী জানালেন যে, অনেকক্ষণ হলো তার পাতলা পায়খানা বন্ধ হয়েছে, এখন ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিলে তিনি বাড়ি চলে যাবেন। কিন্তু ডাক্তার নাছোড়বান্দার মত তাকে ভর্তি করে নিয়ে রাতভর তার উপর অত্যাচার চালালেন। হরদম প্যাথলজি টেস্ট করানো হলো। তার ব্লাডপ্রেসার কমে গেলে রোগী জানালেন যে, ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়ায় তার শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি হয়েছে, এ অবস্থায় স্যালাইন দিলেই প্রেসার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ডিউটিরত অতি নবীন এমবিবিএস ডাক্তার সাহেব তার বসের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে রোগীর হার্টে ইলেকট্রিক শক দিয়ে হার্ট বন্ধ করে পুনরায় চালু করে প্রেসার বাড়াতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় শক দিতে চাইলে রোগী এবারে বাধা দিলেন। তারপরও জোর করে আবার সে কর্ম করতে চাইলে রোগী হুংকার দিয়ে বললেন—তাকে তাড়াতাড়ি স্যালাইন দেয়া হোক। অতঃপর সকালে রোগীটি বাড়ি যাওয়ার ছাড়পত্র চাইলে তাতেও ডাক্তার বাগড়া দিলেন এবং কমপক্ষে তিনদিন থাকতে বললেন। রোগী বেরিয়ে যেতে চাইলে, তখন স্বেচ্ছায় চলে গেলেন এই জাতীয় কথা লিখে ছাড়পত্র দেয়া হলো। সম্মানিত ডাক্তার সাহেবরা, দু’টি ঘটনাই অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আমার একমাত্র পুত্রটিও একজন স্নাতকোত্তর ডাক্তার। আপনারা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই। আপনাদের গায়ে কেউ হাত তুলুক তা আমাদের কাম্য নয়। তবে পেশাগত অনাচারে জড়িয়ে আপনাদের বেশির ভাগই যে অন্যায় করছেন, সে কথাটিও সত্য। আপনারাও এখন কারণে-অকারণে দল বেঁধে রোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়, দাবি আদায়ের মত অনৈতিক কাজ করছেন। আপনারা দলবাজি ছেড়ে সুস্থ ধারায় ফিরে এলে কেউ আপনাদের গায়ে হাত তুলবে বলে মনে হয় না। আর কেউ তা করলে দেশের মানুষ, আইন আপনাদের পাশে দাঁড়াবে। আমরাও তখন শক্তি নিয়ে সাহস নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়াবো। আপনারা মানুষের আস্থা অর্জন করুন। লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিষ্ট