বর্তমান রাজনীতির চালচিত্র

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলতঃ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির হাতে বন্দী হয়ে আছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির পাশাপাশি টিমটিম করে জ্বললেও মোটামুটিভাবে গণনায় আসে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলাম। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রশি টানাটানিতে জাতীয় পার্টির অবস্থা বর্তমানে সংকটাপন্ন। বিশেষভাবে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে দলের প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ এবং দলের দ্বিতীয় শক্তি মিসেস এরশাদের দ্বন্দ্বের সুযোগে জাতীয় পার্টির শৃংখলায় বড় ধরনের আঘাত আসে। জাতীয় পার্টির ব্যাখ্যাহীন এমন ধরনের রাজনীতি ঠিক তাদের রাজনৈতিক ক্ষতিই করেছে। একদিকে তাদের কেউ কেউ সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে কাজ করছেন। ঠিক যেন মিলতে চায় না তাদের কাজ-কর্ম। কোথায় যেন তারা শুভংকরের ফাঁকির শিকার হয়ে গিয়েছে। আর তারই হাত ধরে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বেশ নড়বড়ে অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে। তাদের এই দুর্বল অবস্থানের সাক্ষী হয়ে আছে সদ্য সমাপ্ত কিছু উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল। খুবই করুণ ফলাফল তাদেরকে মেনে নিতে হয়েছে।এক চরম বিশৃংখলার মধ্যে পড়ে গিয়ে জাতীয় পার্টি তাদের রাজনৈতিক জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। আমার বিবেচনায় জাতীয় পার্টির এই দুর্বল অবস্থান জাতীয় পার্টির জন্য তো বটেই বরং আওয়ামী লীগের জন্য দুঃসংবাদ বটে। কেননা জামায়াতসহ বিএনপিকে মোকাবিলা করার জন্য আওয়ামী লীগের পাশে শক্তিশালী জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব প্রয়োজন ছিল। জামায়াত মূলতঃ কর্মীনির্ভর ধর্মীয় রাজনৈতিক দল। একটি কট্টর মৌলবাদী ধ্যান-ধারণার কর্মী সমন্বয়ে গঠিত জামায়াত তাদের কট্টর অবস্থানের জন্য কখনও পূর্ণ বিকশিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারেনি। বর্তমান সরকারের যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইস্যুর প্রেক্ষিতে জামায়াত আরও কট্টর পথে চলে যায়। সহিংসতা দিয়ে তারা সরকারের গৃহীত যুদ্ধাপরাধী বিচারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। সহিংসতার পথে তারা বিএনপির সমর্থন লাভ করে। সরকারি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, ব্যক্তিগত সম্পত্তি সবকিছুই তারা ধ্বংস করে। তারা হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলে, রাস্তা-ঘাটের ক্ষতি করে, সাধারণ মানুষের ব্যবসা ও জানমালের ক্ষতি সাধন করে। অর্থাত্ একটি রাজনৈতিক দল হয়েও তারা চরম অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ফলে তাদের নিজস্ব কর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি বিরূপ ধারণার জন্ম হয়। তাদের সহিংসতা প্রচার লাভ করে দেশে-বিদেশে। ফলে সন্ত্রাসী দল হিসাবে জামায়াত দেশে ও বিদেশে কুখ্যাতি লাভ করে। ৫ জানুয়ারিতে নির্বাচনে না এসে বিএনপি তার রাজনীতি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেগেটিভ ভোটের শক্তিতে বিএনপির ফলাফল ভাল হবে তা সমস্ত মাধ্যম বুঝতে পারলেও বিএনপি বুঝতে সমর্থ হয়নি। বেগম খালেদা জিয়ার বয়স এবং বিএনপির সাংগঠনিক অব্যবস্থা সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত প্রদান করে যে, নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ করাটা ছিল একমাত্র ভাল সিদ্ধান্ত। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে তাদের দাবিটি কিন্তু ইতিমধ্যেই যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনগুলো বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বিএনপির দাবিকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে তুলেছে। আজ হোক, কাল হোক বিএনপিকে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে হবে এটা এখন প্রায় পরিষ্কার। যদি বাস্তবতা তা-ই হয়, তবে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনার মুখে বিএনপি নেত্রীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসাবেই গণ্য করা হবে। ভোটের বাজারে ভাল অবস্থা হলেও বিএনপি সাংগঠনিক দুর্বলতায় ভুগছে বেশ কয়েক বছর ধরে। বিএনপি নেত্রী যথাযথভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। অন্যদিকে, দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি তারেক রহমান দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। একজন বয়সের ভারে দুর্বল আর অন্যজন রাজনৈতিক মাঠে অনুপস্থিত- বিএনপির এমন অবস্থান তাদের রাজনীতিকে ক্রমশঃ দুর্বল করে তুলছে। রাজনৈতিক আন্দোলন করার মত যথেষ্ট সাংগঠনিক ক্ষমতা বিএনপির আছে এমনটা তারা প্রমাণ করতে পারছে না। তাদের বরং ভরসা জামায়াতের মত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সহিংস অবস্থানের ওপর। জামায়াতের সহিংসতা দিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করতে চাচ্ছে তা একেবারেই ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত- তা সকলে বুঝলেও বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব বুঝতে সক্ষম নয়। ভোট থাকলেও সংগঠন নেই এমন অবস্থার শিকার বিএনপি নিজ সংগঠনকে চাঙ্গা করার মত রাজনীতি করতে পারছে না বহুদিন ধরেই। দুর্বল সংগঠনের রাজনীতি অন্যের কারণে ভোট পেলেও কাঁচের ঘরটি ছোট একটি পাথরেও ভেঙ্গে খানখান হয়ে যেতে পারে। রাজনীতি এবং নির্বাচন যেখানে জনগণের ম্যান্ডেটের উপর নির্ভরশীল, সেখানে জনগণের পূর্ণ সমর্থন ব্যতীত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অর্থই হবে কাঁচের ঘরে বসবাসের নামান্তর। সরকারের হাতে প্রশাসন এবং রাজনীতি দু’টি বিষয়ই আছে। জঙ্গি তত্পরতা এবং জঙ্গি সহিংসতা সরকারের প্রতিরোধ করার কথা প্রশাসনিকভাবে আর বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান করার কথা রাজনৈতিকভাবে। সরকার ভুল করে দুটোকেই প্রশাসনিকভাবে সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির সকল পক্ষ যেন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে কাঁচের ঘরে বসবাস করছে। একটুখানি ঢিল দিয়েই তাদের কাঁচের ঘরটি ভেঙ্গে ফেলা যায় এমন একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কেন তারা গ্রহণ করছে তা শুধু তারাই ভাল করে বলতে পারে। জনগণকে পাশ কাটিয়ে কেন তারা তাদের স্ব স্ব রাজনীতি করছে তাও কেবল তারাই বুঝে। তবে জনগণ তাদের কারো ওপরই খুশি হতে পারছে না তা কিন্তু সুযোগ পেলেই জনগণ বুঝিয়ে দিচ্ছে। জনগণ একদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বিএনপির সহিংস রাজনীতি পছন্দ করছে না, আবার অন্যদিকে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও গ্রহণ করছে না। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে তাই রাজনীতির ভাষায় রাজনীতিকে বুঝতে হবে, জনগণের চোখে রাজনীতিকে দেখতে অভ্যস্ত হতে হবে। লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা sudhirsaha2014@gmail.com