অর্থনীতি
কিছু সংখ্যক লোক রাষ্ট্রকে ঠকিয়ে ধনী হচ্ছে
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪০
সমপ্রতি একটি পত্রিকায় দেখলাম যে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ভুয়া এলসির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ডলার বিদেশে পাচার করে সে দেশে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে বিদেশে বাড়ি কিনছে। আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রা যা বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ হিসাবে রয়েছে তার প্রধান অংশ হল প্রথমে আমাদের ভাই-বোনেরা প্রবাসে চাকরি করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশে ডলার পাঠাচ্ছে। পরবর্তী উত্স হল গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা গার্মেন্টস সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। পরবর্তী উত্স হল চা, মাছ ইত্যাদি রপ্তানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এই কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা যদি অন্যায়ভাবে পাচার হয়ে বিদেশে চলে যায় তা হলে তো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় ধ্বংস নেমে আসবে। যারা আমাদের দেশে ইমপোর্ট ব্যবসা করে তারা প্রায় অধিকাংশ আন্ডার ইনভয়েজ ওভার ইনভয়েজ-এর আশ্রয় নেয় এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ প্রেরণ করে বেশি লাভের লোভে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি একটি ব্যাংকের একটি শাখার ম্যানেজার।
১১/১২ বছর আগের কথা। ঐ সময় একজন ইমপোর্ট ব্যবসায়ী এলসি করত ও ব্যাংকে পিএডি সৃষ্টি হত। ধরে নেন একটি পিএডির বুক ভ্যালু ১০ লক্ষ টাকা। এ রকম অনেক পিএডি তার হতো। অনেক সময় ঐ ব্যবসায়ী পিএডি পরিশোধ করে ডকুমেন্ট ছাড় করাতে দেরি করত। একদিন ঐ ব্যবসায়ী আমাকে বললেন স্যার, ১০ লক্ষ টাকার পিএডির জন্য আপনি আমাকে এতো তাগাদা দিচ্ছেন কেন? ঐ ডকুমেন্টে তো আমার ৭০ লক্ষ টাকার মালামাল আসবে। আমি ব্যাপারটি না বুঝে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে? উনি উত্তর দিলেন, আমি এলসি করেছি ১০ লক্ষ টাকার কিন্তু এক এক্সপোর্টারকে আরো ৬০ লক্ষ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে প্রেরণ করেছি; তাতে এলসির ১০ লক্ষ টাকার মাল ও হুন্ডির মাধ্যমে প্রেরিত ৬০ লক্ষ টাকার মাল মোট ৭০ টাকার মাল আসবে। চিন্তা তো আমার স্যার, আপনি চিন্তা করছেন কেন? আমি বললাম আপনি কত টাকার মালের ডিউটি পেমেন্ট করবেন? উনি বললেন, আমি মাত্র ১০ লক্ষ টাকার মালের ডিউটি পেমেন্ট করব বাকি ৬০ লক্ষ টাকার মাল আমি ডিউটি ছাড়াই ছাড় করাব। আমি প্রশ্ন করলাম কাস্টমস আপনাকে আটকে দিবে না? উনি উত্তর দিলেন প্রশ্নই আসে না, আমার সি এন্ড এফ এজেন্ট-এর মাধ্যমে আমি কাস্টমস-এর সবাইকে ম্যানেজ করে নেই। উনি আরো বললেন-একটি এলসিতে আমি যা ইনভেস্ট করি আর হুন্ডির মাধ্যমে যে টাকা প্রেরণ করি তার বিপরীতে ৭০ লক্ষ টাকার মালামাল বিক্রি করে আমি অনেক গুণ বেশি লাভ করি। আমি বললাম, আপনার প্রধান লাভ তো ডিউটি ফাঁকি দেয়া। এতে তো রাষ্ট্র লোকসান দিচ্ছে। উনি বললেন- স্যার, রাষ্ট্রের কথা বলবেন না। আমি যদি লাভই না করতে পারি তাহলে কর্মচারীদের বেতন ভাতা দিতে এবং গুলশানে অথবা বারিধারায় বাড়ি কিনবো কি দিয়ে? আমি আর কথা বাড়ালাম না। থেমে গেলাম, উনি বলেই যাচ্ছেন স্যার, আপনি রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করছেন কিন্তু শুধু আমি না, প্রায় সব ইমপোর্ট ব্যবসায়ী ডিউটি ফাঁকি দিয়ে সবাই রাষ্ট্রকে ঠকিয়ে লাভ করে। আমাকে একা আপনি চোর ভাববেন না। খবর রাখেন না স্যার? দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্থানে বসে পাচার করে দিচ্ছে। তার ব্যাপারে আপনি কি তাগাদা দিবেন? পারবেন না স্যার, পারবেন না। নিজেই ম্যানেজারির চাকরিটা হারাবেন। আমি চুপ করে বসে সব শুনলাম আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এই লোকের আর কোন এলসি খুলব না।
পত্রিকান্তরে পড়লাম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত বলেছেন দেশের ভিভিআইপি ও সিআইপিরা প্রায় সবাই চোর। উনি তো না জেনে বলেননি। আর উনার কথা যে আমি অবিশ্বাস করব তার তো কোন যুক্তি নেই। তা হলে আমাদের ভবিষ্যত্ কি? আর যেভাবে ডিউটি ফাঁকি দিয়া হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা প্রেরণ করে কসমেটিক, খেলনা ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করা হচ্ছে তাতে আমাদের দেশ তো এক সময় দেউলিয়া হয়ে যাবে। সরকার যদি রেভেনিউ আয় করতে না পারে তা হলে সরকার দেশের উন্নতি করবে কি দিয়ে? জনাব আবুল বারাকাত সাহেবের কথা পেপারে পড়ে আমি সত্যি সত্যিই হতাশ হয়েছি। সরকারকে আমি সবিনয় অনুরোধ করব আপনারা দ্রুত এই সব ব্যবসায়ীদের এই অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিন।
লেখক : ব্যাংকার ও সাবেক ছাত্রনেতা