মিসরের গণমৃত্যুদণ্ড ও নির্মম বাস্তবতা
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৬
সমপ্রতি মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষনেতা মোহাম্মদ বদিসহ ৬৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করিয়াছে আদালত। একজন পুলিশ হত্যা এবং একটি থানায় হামলার অভিযোগে তাহাদের বিরুদ্ধে এই গণমৃত্যুদণ্ড ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই ব্রাদারহুডের নেতাকর্মী কিংবা সমর্থক। একই দিন একই আদালত পৃথক মামলায় গত মাসে ৫২৯ জনকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার শুনানি গ্রহণ করে। ইহার পর ৩৭ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং বাকি ৪৯২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। গত সোমবারের রায় মিসরের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্বের ইতিহাসেও একটি রেকর্ড। কেননা একসাথে এক মামলায় এত মৃত্যুদণ্ডের নজির আর নাই। এই দুইটি বিরল রায়ে সারাবিশ্বে তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছে। টাইম ম্যাগাজিন ইহাকে ‘উপহাসের রায়’ হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছে। আল জাজিরা প্রশ্ন করিয়াছে, ন্যায়বিচার কি হইয়াছে? নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করিয়াছে, এই রায় ব্রাদারহুড কর্মীদের আরও উগ্র ভাবাপন্ন করিয়া তুলিবে। আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকাইয়া দিবে। দ্য টিউনিশ টাইমস তাহাদের সম্পাদকীয়ের শিরোনাম করিয়াছে, ‘জাস্টিস ডান, দ্য ইজিপশিয়ান স্টাইল’। এই পত্রিকার একটি কার্টুনে দেখা যাইতেছে, তিনটি লাশের পিরামিডের সম্মুখে সেনাপ্রধান আব্দুল্লাহ আল সিসি হাস্যোজ্জ্বল বদনে ছবি তুলিতেছেন। মূলত সামরিক অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির পতনের প্রেক্ষিতে মিসরের শত শত মানুষ নিহত হয়। ইহার পর আমরা ইত্তেফাকে একটি কার্টুন ছাপাইয়াছিলাম। তাহাতে দেখা যায়, নীলনদ লাল নদে পরিণত হইয়াছে। অনুরূপভাবে মিসরে দমন-পীড়ন ও রক্তের খেলা আজও অব্যাহত আছে। আরব বসন্ত যেন বা সেইখানে কালবৈশাখের ঝড়ের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে।
মোহাম্মদ বদি ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা ব্রাদারহুডের আধ্যাত্মিক নেতাও বটে। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি অন্তরাল হইতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলিয়া আসিয়াছেন। ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটির অষ্টম শীর্ষনেতা তিনি। কিন্তু মিসরে ব্রাদারহুড একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ হইলেও অনেকাংশে পশ্চিমা বিশ্বের সাহায্যে পুষ্ট সেনাবাহিনীর শক্তির তুলনায় তাহা কিছু নহে। বর্তমান মিসর সরকারের ডিফ্যাক্টো মাস্টারমাইন্ড প্রধান সেনাপতি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল সিসি যখন চলতি মাসে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার ঘোষণা দিয়াছেন, তখন সামরিক বাহিনী সমর্থক আদালত বিরোধী মত দমনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে এই রায় প্রদান করিয়াছে, এমন অভিমত অনেক বিশ্লেষকের। তাহাদের মতে, আদালত পরিণত হইয়াছে সেনা আদালতে। ইহার আগে সাবেক ক্ষমতাসীন ও মিসরের সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডকে শুধু নিষিদ্ধ করাই নহে, বরং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়। বস্তুত ব্রাদারহুড নেতৃত্বাধীন ডানপন্থীদের জোট ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ন্যায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও বয়কট করিবার ঘোষণা দিয়াছে। আর ইহার কারণে দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করিতেছেন।
দীর্ঘদিন ধরিয়া সামরিক শাসন থাকিলে কোন দেশেই গণতন্ত্র খুব একটা সুবিধা করিতে পারে না। আরব বিশ্বের সমস্যা হইল, এতদঞ্চলে আজও রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ়। জামাল আবদুল নাসের, আনোয়ার সাদত, আহমেদ বিন বেল্লা, হোসনি মোবারক, কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি প্রমুখ শাসক একনায়ক হইলেও আরব নেতা হিসাবেও পরিচিত। আরব জাতীয়তাবাদের পটভূমিকায় তাহাদের রহিয়াছে ঐতিহাসিক অবদান। মিসরের বর্তমান সরকারের পিছনে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ধনাঢ্য দেশেরও রহিয়াছে নৈতিক সমর্থন। তাহাছাড়া সারাবিশ্বে ইসলামপন্থীদের দুর্দিন চলিতেছে। মুসলিম ব্রাদারহুড কাতার, জর্ডান, মরক্কো, তিউনিসিয়াসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তার করিবার কারণেও প্রতিপক্ষ মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। এই কঠিন বাস্তবতায় মিসর কোন পরিণতির দিকে আগাইয়া যাইতেছে, তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।