ঐতিহ্য রক্ষায় তারুণ্যের এগিয়ে চলা
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ১৯:১৫
ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন নিয়ে গড়ে উঠা রাজধানীর পুরান ঢাকা। তবে সময়ের ধারাবাহিকতায় এবং মানুষে আধুনিক জীবনযাপনের লক্ষ্যে পুরান ঢাকার এসব ঐতিহ্য বর্তমানে ধ্বংসের পথে। আর তাই পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করছে আরবান স্টাডি গ্রুপ (ইউএসজি) এবং গ্রুপের একদল স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সদস্য। স্বেচ্ছাসেবী এ দলের সদস্যদের কারো কারো জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। কারো আবার ঢাকারই বাইরে দেশের অন্যান্য জেলায়। তাদের এই অনন্য কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন শফিক রহমান
ভবনের দেয়াল, কার্নিশ, বারান্দায় চুন-সুরকি, ইট, কাঠ আর লোহায় খোদাই নানা কারুকাজ। ভবনের নকশায়ও স্থাপত্য কলার অপূর্বসব নিদর্শন। তারপরও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পুরোনো ঢাকার এসব স্থাপনা। ধ্বংস হচ্ছে কখনো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বহীনতা এবং সমন্বয়হীনতায়। অথবা ভবন মালিক বা দখলদারের অযত্ন, অবহেলা এবং খামখেয়ালিপনায়। তবে সবকিছুর মূলে রয়েছে এদের সবার অসচেতনতা। আর এই উভয় পক্ষের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করছে আরবান স্টাডি গ্রুপ (ইউএসজি) এবং গ্রুপের একদল স্বেচ্ছাসেবী সদস্য। স্বেচ্ছাসেবী এ দলের সদস্যদের কারো জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরোনো ঢাকায়। কারো আবার ঢাকারই বাইরে দেশের অন্যান্য জেলায়। কিন্তু লেখাপড়ার জন্য তারা এসে ছাত্রত্ব নিয়েছেন জগন্নাথ, কবি নজরুল, সোহরাওয়ার্দী, ইডেন এবং বোরহান উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ নানা প্রতিষ্ঠানে। স্থিত হয়েছেন পুরোনো ঢাকায়। এর সুবাদে ধীরে ধীরে মুগ্ধ হয়ে উঠছেন বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি খ্যাত এ নগরীর কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্থাপত্য কলার নানা নিদর্শনে। তাই তো কোনো ভবন ভাঙার উদ্দেশ্যে হাতুরির আঘাত পড়লেই স্বেচ্ছাসেবী এ দল হাতে-হাত মিলিয়ে তৈরি করে প্রতিবাদের ‘মানববন্ধন’। সক্রিয় হয়ে ওঠেন তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ছুটে যায় থানা, পুলিশ, রাজউকসহ রাষ্ট্রের নানা দপ্তরে। মুখে স্লোগান একটাই ‘সেইভ পুরান ঢাকা’। এদিকে ২০০৪ সালের ১৯ জুন রাতে শাঁখারিবাজার এলাকার একটি ৬ তলা ভবন ধসে পড়ে। তাতে নিহত হন ১৮ জন। এ ঘটনায় নড়ে চড়ে বসেন নগর পিতা। তার নির্দেশে গঠিত কারিগরী কমিটি নগরীর ৬৭২টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর মধ্যে শাঁখারিবাজার এলাকারই ৯১টি ভবন। সিদ্ধান্ত হয় ভবনগুলো ভেঙে ফেলার। কিন্তু বাধ সাধে আরবান স্টাডি গ্রুপ। শাঁখারিবাজার এলাকাসহ পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষার ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে প্রকৌশলী শহীদুল্লাহকে নিয়ে ভবন ধসের জায়গাটি পরিদর্শনে যায় আরবান স্টাডি গ্রুপের সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে প্রকৌশলী শহীদুল্লাহর মন্তব্য, জরাজীর্ণতা নয়, ভবনটির পাশের প্লটে আর একটি ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে বড় আকারের গর্ত খোড়ার কারণেই ধসে পড়েছে ভবনটি। এর পরে আরবান স্টাডি গ্রুপের ‘মিট দ্যা কমিউনিটি’ কর্মসূচির আওতায় শাঁখারিবাজার এলাকা পরিদর্শনে যান ইউনেস্কোর তত্কালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর। চলতে থাকে আরবান স্টাডি গ্রুপের মিডিয়া ক্যাম্পেইন, বিল্ডিং ডকুমেন্টেশন, বিল্ডিং সার্ভে, প্রদর্শনীসহ নিয়মিত ‘হেরিটেজ ওয়াক’। হেরিটেজ ওয়াকে অংশ নিতে থাকেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। বাড়তে থাকে স্বেচ্ছাসেবী সদস্যের সংখ্যাও। বিশেষ করে ২০১০ সাল থেকে বাড়তে থাকে স্থানীয় এ স্বেচ্ছাসেবীদের সংখ্যা। বর্তমানে এদের সংখ্যা তিন শতাধিক। যেই সদস্যরা একাধারে হেরিটেজ ওয়াকের সঙ্গী। আবার কখনো গাইড। এদিকে পুরোনো ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোকে পুরো নগরজুড়ে ছড়িয়ে দিতে গেল ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে আরবান স্টাডি গ্রুপের স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা আলোক সজ্জায় সজ্জিত করে রূপলাল হাউজ। দিনের আলোয় যেখানে পেঁয়াজ আর মরিচের ঝাঁঝে ঢোকা ভার। সেখানে রাতের আঁধার নামতেই নানা রঙের আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে পুরো রূপলাল হাউজ।