[ সা ম্প্র তি ক ]

গুম, অপহরণ ও জননিরাপত্তা

চলমান গুম ও অপহরণ সহিংসতার শেকলে এক নতুন সংযোজন হলো শীতলক্ষ্যায় কাউন্সিলরসহ ছয় জনের লাশ উদ্ধার। সে এক বিভত্স দৃশ্য! মুখে পলিথিন মোড়া, হাত-পা বাঁধা লাশগুলো ইট বেঁধে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। খোঁজ না পেলে তা হতো গুম। এখন হয়েছে অপহরণ ও খুন। অপহরণোত্তর অনেকে হয়তো ব্যবসায়ী এ বি সিদ্দিকের মতো ভাগ্যক্রমে উদ্ধার পেয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশের ভাগ্যে জুটেছে ‘গুম’ নামক এক হিমশীতল অজ্ঞাত অন্তর্ধান। অনেকের আপনজনেরা হয়তো বুক বেঁধে আছেন গুম হয়ে যাওয়া প্রিয়জনের নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের আশায়। কিন্তু কে জানে! তাদের ভাগ্যে হয়তো ঘটেছে-শীতলক্ষ্যার বুকে ভাসমান লাশগুলো উদ্ধার না করা গেলে যা ঘটতো, তাই। অসীম, অনন্ত প্রাণহীন অজ্ঞাতবাস। গুমের বিষয়টি সত্যিই বড়ো মর্মান্তিক। লোকমান বিবেচনায় গুম এবং সাক্ষাত্ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে হয়তো তেমন পার্থক্য নেই, তারপরও স্বজনের মৃতদেহ স্বচক্ষে দেখে নিজহস্তে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করার ভেতর দিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক শোক-মোচন, এক ধরনের ক্যাথারসিস ঘটে; যা গুমের ক্ষেত্রেও একেবারেই অনুপস্থিত। গুমের নিদারুণ মর্মবেদনা আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। গুম, অপহরণ কিংবা গুপ্তহত্যা যে কেবলমাত্র সাম্প্রতিক সময়ের ব্যাপার তা নয়। এর ইতিহাস মানব ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। সমাজে যেমন অপরাধ থাকে, সভ্য সমাজে তা প্রতিকারেরও উপায় থাকে। সহিংসতা সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই, কিংবা তা প্রতিকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা কিংবা কার্যকারিতা না দেখা গেলেই জনমনে প্রশ্ন ওঠে। এখন যেমন উঠেছে। চলতি বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময়েই অর্ধশতাধিক মানুষ অপহরণ, গুম কিংবা গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সূত্রমতে জানা যায়। অর্থাত্ সাম্প্রতি গড়ে দশজনের অধিক মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছে। এই সংখ্যা কি উদ্বেগজনক নয়। অবশ্যই গভীরভাবে উদ্বেগজনক। স্বয়ং সরকারি দলে এমনকি প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে বর্ধিষ্ণু গুম এবং অপহরণ নিয়ে অস্বস্তি আছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি দুঃসহ বলে স্বীকার করেছেন। গুম ও অপহরণের ঘটনাকে বড়ো অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তা সর্বশক্তি দিয়ে দর্শন করার প্রত্যয় জানিয়েছে সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোর কমিটির সভায়। শুভ উদ্যোগ। ঘটনার সভ্যতা স্বীকার কিংবা গুরুত্ব অনুধাবন তা প্রতিকারের অন্যতম প্রধান উপায়। এখন প্রশ্ন হলো গুম, অপহরণের এই অপরাধগুলো কারা করছে এবং কেনই বা করছে? এর সদুত্তর কে দিতে পারবে তা আমার জানা নেই। এদেশে সত্যি এখন রাজনৈতিক মোড়কে বন্দী কিংবা দলীয় দর্পণে বিকৃতরূপে প্রতিফলিত। তাই গুম/অপহরণের ঘটনাগুলোও পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক ভাষ্যে বিকৃত, অসত্য কিংবা অর্ধসত্য। বিএনপি সন্দেহের তীর ছুঁড়ছে সরকারের দিকে, তার আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে। আবার সরকারি তীর ছুটন্ত বিএনপি-জামায়াতের দিকে। বস্তুত, এই ধনুকযুদ্ধ বিদ্যমান সমস্যার কোনো কিনারা করতে পারবে না। এই প্রাণঘাতী অপরাধসমূহ যে কারণেই কিংবা যার দ্বারাই সংঘটিত হোক না কেন আসলে কথা হলো-তা বন্ধ করা এবং তা বন্ধ করার দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপরই। আমাদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার সংবিধান সংরক্ষিত। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে: ‘No. Person shall be deprived of life or personal liberty, save in accordance with law,” যা ৩১ অনুচ্ছেদে পুনঃনিশ্চিত হয়েছে এই মর্মে যে, “to enjoy the protection of law...is the inalienable right of every citizen”. দল মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক আইনী সুরক্ষা পাচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। তারপরও কথা থাকে। সরকারের হাতে আলাদীনের যাদুর চেরাগ নেই। কিংবা সরকার যাদুটোনা জানে না যে ঘষা কিংবা ফুঁ দিয়ে সমাজের সকল অশুভ শক্তি তাড়াবে। রাজনৈতিক দলসমূহেরও সমভাবে এগিয়ে আসতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী রচনায় পূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে। গুম, অপহরণের শিকার হচ্ছে যারা তারা কোনো একক রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ নয়। সব দল, সব মতের মানুষই আক্রান্ত হচ্ছে। কাজেই আক্রমণকারীরাও সব দল, সব মতের হতে পারে। আবার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যে অনেকে অন্তর্ঘাত কিংবা কূটঘাতের আশ্রয় নিতে পারে। তাই ঘটনার শিকার এবং শিকারীদের ঢালাওভাবে ব্র্যান্ডিং না করে ঘটনা সংঘটনকে অপরাধ এবং সংঘটককে অপরাধী মেনে কঠোর আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। একই অপরাধের কোন গুরুত্ব ভেদ থাকা উচিত নয়, যেমন উচিত নয় অপরাধীর কোন অবস্থান ভেদ। অপরাধী অপরাধীই। আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ বেশি সমান নয়। বিরোধী দল/ রাজনীতি দমনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে সরকার এগুলো করছে বলে যারা ঢালাও দাবি করছেন, তাদের যুক্তি দলীয় সমর্থক, কথিত সুশীল সমাজ কিংবা পোশাকী প্রতিষ্ঠানবিরোধী চটকদার টক শো অতিথিদের কাছে মুখরোচক মনে হতে পারে। কিন্তু তাতে বাস্তবতার ঘাটতি আছে। বর্ধিষ্ণু সহিংসতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ। একথা জেনেও সরকার অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়ে ব্যর্থতার পাল্লা ভারি করে আত্মহত্যার পথ সুগম করবে- এতো বোকা সরকার সম্ভবত আওয়ামী লীগ নয়। তাছাড়া, সরকারি দল বা আদর্শের কিংবা দল নিরপেক্ষরাও যে গুম অপহরণের শিকার হচ্ছেন না, তাও নয়। তবে সরকার যেখানে সমালোচনা যোগ্য তা হলো, সমাজে ক্রমবর্ধমান এরকম একটি গুরুতর সমস্যাকে তারা এতোদিন খুব একটা আমলে নিতে চায়নি এবং এর সমাধানে শক্তি, দ্রুত এবং নিশ্চিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। সহিংসতার বীজ মহীরুহের আকার নিতে বসেছে। সরকারেরও টনক নড়েছে। অপহরণ ট্রাজেডির নারায়ণগঞ্জ উপাখ্যানের পর লজ্জিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দু’চার দিনের মধ্যেই ঘটনার দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাথে, বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সহিংসতার মাধ্যমে আতঙ্ক ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টার একটা সংযোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। সাঈদীকে ঘিরেও তেমনি ধর্মান্ধদের একটা ধ্বংসাত্মক উত্তেজনা আছে যা তার রায়কে কেন্দ্র করে একবার সহিংসতায় ফেটে পড়েছিলো। রায় বাস্তবায়নে তা যে সর্বাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের পাঁয়তারা করবে তা ভাবা অমূলক নয়। অতএব চলমান গুম ও অপহরণে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারের শত্রুপক্ষ বিচ্ছিন্ন কিংবা সমবেতভাবে সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে-তেমনটি ভাবাও অযৌক্তিক নয়। তবে এটি সত্য হলেও তা দমনে ব্যর্থতার দায় সরকারের কোনভাবেই এড়াতে পারবে না। উদ্বিগ্ন, উত্কণ্ঠিত এবং আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ বারবার আশ্রয় খুঁজবে দেশের সরকারের কাছেই। ঘাতকদের কাছে করুণা ভিক্ষা করে বাঁচতে চাওয়া তাদের জন্য সম্মানজনক নয়। সম্মানজনক নয় সরকার কিংবা রাষ্ট্রের জন্যেও। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার দৃঢ়প্রত্যয়ে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে রচিত এদেশের সংবিধান ব্যক্তিগত ও জাতীয় নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। এছাড়াও বাংলাদেশ UN Rights Watchdog-এর সূচনা লগ্ন থেকেই দীর্ঘ দিন Human Rights Council-এর সদস্য থেকেছে। ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে International Covenant on Civil and political Rights (ICCPR)-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চুক্তিনামাটির ২ এবং ৬ অনুচ্ছেদ মেনে চলতে দায়বদ্ধ, যেখানে বলা আছে “ Bangladesh has the obligation to ensure the right to life of its people and ensure prompt and effective reparation where violations occur.” কিন্তু দুঃখের বিষয়, কার্যকারিতা বিবেচনায় এ সকল চুক্তিনামার অঙ্গীকার কাজির গরুর মতো লিপিবদ্ধ কিন্তু অস্তিত্বশীল নয়। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ তো দূরের কথা, সহিংসতার ক্ষতিপূরণের কোন কার্যকর তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণও অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। Asian Human Rights Commission (AHRC)-এর ভাষ্যমতে বাংলাদেশে গুম ও অপহরণের ঘটনা ভীতিকর ভাবে বেড়ে চলেছে। অনেকে পুলিশ-র্যাব এবং বিজিবি-এর দিকে আঙুল তুলছেন। আবার তাদের ছদ্মবেশে মহলবিশেষও কাজ হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। যাই হোক, যেই করে থাকুক, বা যেজন্যই করে থাকুক, গুম অপহরণ নামক জীবন্ত নাটকের শেষ দৃশ্যে পৌঁছুতে হবেই। এর সাথে জড়িত আসল কুশীলবদের হাতকড়া পরাতেই হবে। নীহার রঞ্জনের কিরিটী রায় কিংবা সত্যজিতের ফেলুদার মতো গোয়েন্দার আকাল আমাদের দেশে এখনও পড়েনি। দরকার শুধু জনমতের চাপ এবং সরকারের আন্তরিকতা। গুম অপহরণের হোতারা যেখানেই থাক না কেনো—যে দলেরই হোক না কেনো—যতো বড়ো শক্তিশালীই হোক না কেনো তাদের প্রশ্রয় দিয়ে কেউ জনতার আদালতে পার পাবে না। পার পাবে তাদের পরাস্ত করে। সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য যেমন সহিংসতা রোধে, রাজনৈতিক দলগুলোর সাফল্য তেমনি অহিংসা চর্চায়। রাষ্ট্র কাঠামো মানবসভ্যতার শেষ ভরসাস্থল। সেই রাষ্ট্রে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী, মতাবলম্বী-মতবিরোধী, ধনী নির্ধন, সরকারি অসরকারি প্রত্যেকে এবং সবাই জীবনের নিরাপত্তা পাক। সদাশয় সরকার এবং সদর্থক রাজনীতির কাছে-আপাতত এটুকুই চাই। লেখক: সাহিত্যিক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক