জীবন যাদের নিত্য পরিহাস
প্রকাশ : ০২ মে ২০১৪, ২১:২১
রানাপ্লাজা ধসের শোকগাথার যেন শেষ নেই। হতাহত পোশাক শিল্প শ্রমিকদের আহাজারি এখনও আকাশ বাতাস মথিত করে রাখছে।
‘মায়ার সংসার’ ছায়াছবির জন্য রচিত আমার একটি গান-‘শহরবাসী শোন, তোমরা যাদের মানুষ বল না, বিধিও যাদের কান্না শোনে না, তারাও মানুষ কাঁদে তাদের প্রাণ, আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান। তাদের বুকের রিক্ত হাহাকার, কেউ বোঝে না ওগো কেউ শোনে না সর্বহারার মর্মবেদনা। দুঃখে যাদের জীবনগড়া মানুষ যাদের নাম, আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান। জীবন তাদের নিত্য পরিহাস, কেউ দেখে না ওগো কেউ লেখে না এ সংসারে তাদের ইতিহাস। পথের মলিন ধূলায় যাদের ঝরে মাথার ঘাম, আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান’। রানাপ্লাজা ধসের শোকগাথা তথা হতাহত পোশাক শিল্প শ্রমিকদের যে মর্মন্তুদ কাহিনী প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, এ গানটিতে যেন সেই আহাজারির প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।
চৈত্র-বৈশাখের তাপদগ্ধ রাজপথে ঠেলাগাড়িওয়ালাদের প্রায়ই চোখে পড়ে। ক্লান্ত-শ্রান্ত, ঘর্মাক্ত কলেবরে তারা বলছে- হেঁই মারো, মারো টান, সাবধান। আশ-পাশে লরিবাস ছুটছে, পীচঢালা রাজপথ পুড়ছে। কড়া রোদে মাথায় ঘাম ঝরছে, আইঢাই তৃষ্ণায় ফেটে যায় ছাতিখান। হেঁই মারো, মারো টান, সাবধান। রিকশাওয়ালার কণ্ঠঃ কড়া রোদে ঘেমে ঘেমে বৃষ্টিতে ভিজে, দেহখানি নিস্তেজ ভেঙ্গে পড়ে কী-যে! দুঃখ নাই তবু যদি ন্যায্য ভাড়া পাই। আমি এক রিকশাওয়ালা রিকশা টেনে খাই।
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির এমনসব দৃশ্য চোখে পড়লে আমার সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রে অনুভব করি ছোটবেলার একটা স্মৃতি।
জন্ম আমার মাতুলালয়ে। শৈশব-কৈশোর এমনকি যৌবনের প্রারম্ভ কেটেছে সেখানে। এক জৈষ্ঠ্যে মামার সাথে মামার মামাবাড়ি বেড়াতে গেলাম। ২/৩ দিন থাকার পর ফেরার পথে ওরা একঝুড়ি আম দিলো আমাদের। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যে আম এবং ফাল্গুন-চৈত্রে মাছ বিতরণের রেওয়াজ ছিল সেকালে। আমের বোঝাটা ছিল বেশ ভারী। মামা তো আমার কাঁধে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত। ১০/১২ মাইল দূরের পথ, চলছি পায়ে হেঁটে। গ্রামাঞ্চলে যানবাহন বলতে তখন সাঁকো পারাপার, নৌকা, গরুর গাড়ি আর ছিল পালকি। আমের বোঝা কাঁধে, মাঝে মাঝে থামছি আবার চলছি। গ্রাম্য পথের ধূলা, হাসিহাসি বাজার, ভাঙ্গাপথের রাঙাধূলা মেখে কোনমতে ক্লান্ত-শ্রান্ত, ঘর্মাক্ত কলেবরে যখন বাড়ি পৌঁছালাম, সারা শরীর কষ্টে ভেঙ্গে পড়লো। প্রায় মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। স্নেহকাতর নানি ভয়ে-উদ্বেগে দিশেহারা। মামাকে খুব বকাঝকা করলেন। আমার মাথায় পানি, হাতপাখার বাতাস। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। জাগলাম যখন সারা শরীর ব্যথায় আড়ষ্ট। নড়াচড়ায় কী যে অসহনীয় কষ্ট।
সে যাইহোক, আজকাল রাজধানী ঢাকায় সর্বস্বান্ত মানুষের ভীড় লেগেই আছে। নদী ভাঙ্গন ও ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষ জীবিকার তাগিদে রাজধানীতে ছুটে আসছে সপরিবারে। কোন্ জাহান্নাম থেকে আগমন, পা বাড়ালেই ঠোক্কর, মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি। পৃথিবীর সব অপদার্থ অকেজো মানুষ গিজগিজ করছে স্টেশন, লঞ্চঘাট, ওভারব্রিজ, ফুটপাতে। সামনে এগিয়ে যাও, যদি খাবার চাও তোমাকে পরতে হবে ঘোড়ার সাজ, যদি মাথা গোঁজার ঠাঁই চাও, পড়বে বিপাকে।
শহরটা যেন জনজোয়ারে ভাসছে। অবিরল জনস্রোতের মধ্যে এদের আলাদা কোনো পরিচয় নেই। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে কষ্ট বারো মাস। শহরের আনাচে-কানাচে গাছতলায় কিংবা ফুটপাতে ভাসমান নামগোত্রহীন এক ধূসর জনগোষ্ঠী, মাথা নিচু করে খায়-দায়, হাই তোলে।
বলাবাহুল্য, শহর কেন্দ্রিক আধুনিক সভ্য ভোগবাদী সমাজ যুগে যুগে গ্রাম এবং অরণ্য কেন্দ্রিক মানুষকে উচ্ছেদ ও উত্পীড়ন করে আসছে সভ্যতার অজুহাতে। অর্থনীতির শেকড়ে কিন্তু থেকে যায় বেকার সমস্যা। এখন শ্রমজীবী মানুষের দুরবস্থা এবং তাদের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এক গভীর সামাজিক বিষয়।
বাস্তবে দারিদ্র্যকে সুনজরে দেখে না কেউ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক অর্থনীতিবীদের বক্তব্যঃ বৈষম্য একটি প্রাকৃতিক সত্য। বৈষম্য না থাকলে উন্নয়ন হয় না। সাম্যবাদ পালন করতে গেলে প্রগতি হয় না। জীবনটাকে গোটা জগত্টাকে নতুন একটা চোখে দেখতে পারার ক্ষমতা যেন রয়েছে তাঁর।
কিন্তু যে দেশ শস্যের দেশ, অথচ যে দেশে আদিগন্তু দারিদ্র্য আর অশিক্ষা, সেখানে ১লা মে কেবল মোহজালাই সৃষ্টি করে। এ দেশে কৃষকরা গরিষ্ঠ ও দরিদ্র, শ্রমিকরা লঘিষ্ঠ ও ক্লিষ্ট। এই শ্রমিক শ্রেণীর অর্থনৈতিক সংগ্রাম সংকীর্ণ ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের পক্ষে নিজেদের উদ্যোগে ব্যাপক চেতনা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একদল পর্যুদস্ত হয়ে ফিরে আসে, অন্যদল হয় তো এগিয়ে যায়।
বর্তমানে ধনতন্ত্রের বিজয় পতাকা পতপত করে উড়ছে। দুনিয়া জুড়ে মুক্তবাজারের জয়জয়কার। বিপণনের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে দারিদ্র্য। বস্তুত বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি বিশ্বকে পরিণত করেছে এক গণ্ডগ্রামে।
শিল্পী সাগর সেনের গাওয়া কবিগুরুর অমর বাণী- ‘সুখে আছে যারা সুখে থাক তারা, সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা। দুখিনী নারীর নয়নের নীর, সুখীজনে যেন দেখিতে না পায়। তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বুঝে না, তারা ফিরেও না চায়, আহা আজি এ বসন্তে’।
লেখক: গীতিকার ও কবি