প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়িত হউক
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৪, ২১:৫৪
দুর্বৃত্তদের দুঃসাহস যেন বাড়িয়াই চলিয়াছে। নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্য দিবালোকে সাত ব্যক্তিকে অপহরণ ও খুনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার নির্মম ক্ষত শুকাইবার আগেই সিদ্ধিরগঞ্জ হইতে অপহূত হন আরও একজন। সাইফুল ইসলাম নামের এই ব্যবসায়ীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও দায়ী দুর্বৃত্তদের একজনও ধরা পড়ে নাই অদ্যাবধি। জানা যায় নাই কাহারা কীভাবে কেন এই হিংস্রতায় মাতিয়া উঠিয়াছে, তাহাদের এই দুঃসাহসের উত্স কী এবং প্রশাসনই-বা কী করিতেছে—এমন গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রশ্নের উত্তর। এইদিকে দেশব্যাপী তীব্র উদ্বেগ-আলোড়নের মধ্যেও অপহরণ, গুম, খুন থামিয়া নাই। শুধু গত বৃহস্পতিবারই রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে একাধিক খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটি অপহরণ কিংবা খুনের ঘটনা ঘটিতেই পারে। কিন্তু অপহরণের যেই চিত্রটি ফুটিয়া উঠিতেছে তাহাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যাইবে না। ইহাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উপর্যুপরি অপহরণ, গুম ও খুনের কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা শুধু ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। নিরাপত্তাজনিত এই আতঙ্ক জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে—দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য যাহা মোটেও শুভ লক্ষণ নহে।
প্রকৃত অপরাধীদের খোঁজ নাই, নাই তদন্তের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি—কিন্তু ঠিকই চলিতেছে একে অন্যের উপর দায় চাপানোর পুরনো খেলা। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুম-অপহরণ ও খুনের জন্য সরকারকে দায়ী করিয়া তাঁহার ভাষায় ‘রেড এলার্ট’ ঘোষণার পাশাপাশি জনগণকে ইহার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার আহ্বান জানাইয়াছেন। অন্যদিকে দেশে যত চোরাগুপ্তা হত্যা সংঘটিত হইতেছে তাহার জন্য বিএনপিকে দায়ী করিয়া দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানাইয়াছেন প্রধানমন্ত্রী। সমপ্রতি প্রদত্ত বিএনপির এক প্রবীণ নেতার বক্তব্য স্মরণ করাইয়া দিয়া তিনি বলিয়াছেন যে, যাহারা গুপ্তহত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়া ক্ষমতায় আসে, তাহারাই এই চোরাগুপ্তা হত্যার রাজনীতি করে এবং তাহারা তাহাই করিয়া যাইতেছে। তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছেন ভিন্ন কথা। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের জন্য স্থানীয় দুই আওয়ামী লীগ নেতাকে দায়ী করিয়া তিনি বলিয়াছেন যে, ইহার মূলে রহিয়াছে আধিপত্য লইয়া পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রোশ। রাজনৈতিক প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তার লইয়া প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি অস্বাভাবিক কিছু নহে। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন হইতে এই প্রবণতা চলিয়া আসিতেছে। আর ইহা যে শুধু রাজনীতির অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিবার, পাড়া-মহল্লা, অফিস-আদালত হইতে শুরু করিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত ইহার শিকড়। মানুষে মানুষে সুস্থ প্রতিযোগিতা সমস্যা নহে। সমস্যা হয় তখনই যখন মানুষ পশুতে পরিণত হয়; তাহার মনুষ্যত্ব লোপ পায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, আমাদের সমাজে এখন সেই পশু মনোবৃত্তিই মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। ইহার পিছনে কারণও নিশ্চয়ই আছে। সংক্ষুব্ধ মানুষ যখন আইনের আশ্রয় লইতে ভরসা পায় না, যখন তাহাদের মনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হইয়া পড়ে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অন্যায় দাপটে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে—তখনই মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া ফেলে। পা বাড়ায় পশুত্বের পথে।
সমাধান একটাই, আর তাহা হইল—আইনকে তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে দেওয়া। আশার কথা হইল, প্রধানমন্ত্রীও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সেই কথাই পুনর্ব্যক্ত করিয়াছেন। অপরাধী যেই হউক বা যতো শক্তিশালীই হউক তাহাদিগকে গ্রেফতার করিয়া বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর নির্দেশ দিয়াছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়িত হউক—ইহাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে ইহাও ভুলিলে চলিবে না যে, অতীতেও প্রধানমন্ত্রী এমন অনেক নির্দেশ দিয়াছেন—বাস্তবে যাহার প্রতিফলন দেখা যায় নাই। কারণ, প্রশাসনের ভিতরেও যে ডালপালা বিস্তার করিয়াছে অপরাজনীতির বিষাক্ত শিকড়—তাহা কে না জানে!