নারায়ণগঞ্জে নরবলি
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৪, ২১:৫৫
প্রাচীনকালে বাংলাদেশে এক সময় নরবলিদানের প্রথা ছিলো। এই নরবলি রাজারাজড়ারা দিতেন। আবার ধনী সমাজপতিরাও দিতেন। নবাবি আমলে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে হিন্দু জমিদার কর্তৃক দেবীর তুষ্টি সাধনের জন্য প্রজার কুমারী মেয়ে ধরে এনে বলিদানের কাহিনীও ইতিহাসে রয়েছে। এই নিষ্ঠুর নরবলিদান প্রথা বহু আগে উঠে গেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আবার নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে মনে হয়। নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা। শীতলক্ষ্যা নদীতে ইট বাঁধা অবস্থায় এ লাশগুলোর ভেসে ওঠার খবরে মনে হয় বাংলাদেশ আবার সেই মধ্যযুগের বর্বরতায় ফিরে গেছে।
নিহতদের লাশ সনাক্ত হওয়ার পর খবরের কাগজেই তাদের পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। এরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলার নজরুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি চালক ইব্রাহিম প্রমুখ। আমার এই লেখার সময় খবর পেয়েছি, চন্দন কুমার সরকারের এবং নজরুল ইসলামের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের লাশ সনাক্ত হয়েছে এবং জানা গেছে, অপহূত সপ্তম ব্যক্তির লাশটি লিটন নামে এক ব্যক্তির। এই সপ্তম ব্যক্তির লাশও উদ্ধার হয়েছে। এই সাত ব্যক্তির অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের পরও আরো এক ব্যক্তি অপহূত হয়েছিলেন। তাকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে।
এই গণ-অপহরণ ও নরবলিদানের উদ্দেশ্যটা কি? তাহলে বাংলাদেশ কি আবার মধ্যযুগের মগের মুল্লুকে ফিরে গেছে? দেশে অপহরণ, গুম, খুনের সংখ্যা আতঙ্কজনক হারে বাড়ছে। ঢাকার একটি কাগজের খবরে বলা হয়েছে, ‘একের পর এক গুম খুনের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে। গত ক’দিনে অস্ত্র উঁচিয়ে অপহরণ করা হয়েছে রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, শিক্ষকসহ অনেক ব্যক্তিকে। ঢাকায় অপহরণের পর যুবদল নেতার লাশ পাওয়া গেছে লক্ষ্মীপুরে। অপহরণের ১৩৫ ঘণ্টা পর ফিরে এসেছেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এ. বি. সিদ্দিক। গাজীপুরে দুই ভাই অপহূত হওয়ার পর পুলিশ তাদের উদ্ধার করেছে। কেরানীগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ কর্মী রিন্টু অপহূত হয়েছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। ময়মনসিংয়ের ভালুকায় একই দিনে অপহরণ করা হয়েছে দুই শিক্ষককে। প্রায় একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনা।’
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এই চিত্র ভয়াবহ। বিএনপি-নেতা ইলিয়াস আলী অপহূত হয়েছেন আজ বহুদিন হয়। তার কোনো সন্ধান মেলেনি। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা আজ পর্যন্ত পুলিশ করতে পারেনি। এসব কি পুলিশ ও র্যাবের ব্যর্থতা, না এর পেছনে কোনো রহস্য কাজ করছে? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে? বেশ কিছুকাল আগে প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন তার কলামে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমাকে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কে দেবে?’ বাংলাদেশে এখন এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারছে না। না আইন, না সরকার, না সমাজ শক্তি! গোটা সামাজিক নিরাপত্তাই বাংলাদেশে আজ বিপন্ন।
এই অব্যাহত গুম, খুন ও অপহরণের পেছনে কারণটা কি? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একটা কারণ হতে পারে। দেশে উগ্র বাম ও মৌলবাদীদের দ্বারা রাজনৈতিক সন্ত্রাস এক সময় ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। বর্তমানে তা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। তাহলে এগুলো কি সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি ও ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল? কিন্তু তা কি এতোটা গণ-হত্যাকাণ্ডের রূপ ধারণ করতে পারে? দিনে-দুপুরে একই শহরের সাত ব্যক্তিকে অপহরণ, অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করা এবং তারপর শরীরে ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া এটাতো সঙ্ঘবদ্ধ পরিকল্পনা ছাড়া হতে পারে না।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার প্রাথমিক বক্তব্যে বলেছেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক কারণে ঘটেনি। যতোদূর জেনেছি, জমিজমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।’ প্রশ্ন হলো, জমিজমা নিয়ে বিবাদ ও ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে কি এই ধরনের পরিকল্পিত এবং সাত ব্যক্তিকে ধরে একসঙ্গে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে? অপহূত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘নূর হোসেন ও হাজি মো. ইয়াসিন নামক দুই ব্যক্তি এলাকায় জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি করে আসছিলেন। তার স্বামী এসব কাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তাকে কয়েকবারই হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।’
এই অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিহত নজরুল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত নূর হোসেন এবং হাজি ইয়াসিনও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। তাহলে এই হত্যাকাণ্ড কি আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল? এই জিজ্ঞাসা থেকে কেউ কেউ সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করছেন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের শামীম ওসমানের গ্রুপের দিকে। এই গ্রুপের অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতার ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোরের’ মতো। নারায়ণগঞ্জে অঘটন কিছু ঘটলেই এই গ্রুপটির কাঁধে দোষ চাপান হয়। নাসিম ওসমানের মৃত্যুতে এই পরিবারটি এখন শোকাভিভূত। সুতরাং কোনোপ্রকার তদন্ত না করেই এই পরিবারটির উপর দোষ চাপানো সমীচীন মনে হয় না।
ঢাকায় যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কেউ কেউ র্যাবের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান। র্যাব সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে বা ক্রসফায়ারে হত্যা করে। কিন্তু এক শহরের সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে, যাদের কারো কারো গায়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির গন্ধ থাকলেও র্যাব তাদের সন্ত্রাসী কায়দায় অপহরণ করে হত্যার পর নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এটা কষ্টকল্পনা। নিহতেরা যদি বিএনপি বা জামায়াত-ঘেঁষা লোক হতেন, তাহলে সরকার বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা যেতো। কিন্তু নিহতেরা তা নন। তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিএনপি বা জামায়াত তাদের রাজনৈতিক কারণে হত্যা করেছে এটা সন্দেহ করাও কষ্টকর। অতিসম্প্রতি বিএনপি ও জামায়াত দেশব্যাপী রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টি থেকে বিরত হয়েছে। তারা কি এতো শীঘ্র পরিকল্পিতভাবে এমন একটি বর্বর গণ-হত্যাকাণ্ডে জড়িত হতে যাবে?
তথাপি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নারায়ণগঞ্জে যে নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে, তার প্রতিবিধানের জন্য সঙ্ঘবদ্ধ আওয়াজ না তুলে একে অন্যকে দোষারোপের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই নির্মম নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় করা মোটেই উচিত নয়। ভাগ্যের পরিহাস এই যে, বেগম খালেদা জিয়া যে ব্যক্তির আয়োজিত সভায় দাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগের উপর দোষারোপ করে বক্তৃতা করছিলেন, সেই ব্যক্তিই বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের শেষদিকে ঢাকার সূর্যসেন হল থেকে সাতজন ছাত্র ও যুব নেতাকে তুলে নিয়ে মহসিন হলের প্রাঙ্গণে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার “নায়ক” ছিলেন বলে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জে সাত ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড নিকট অতীতের ঢাকায় সাত ছাত্রনেতা হত্যার বর্বর ঘটনা আবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
ঢাকার সেই হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। নারায়ণগঞ্জের বর্তমান হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক বলে এখন পর্যন্ত মনে করা যাচ্ছে না। অনেকে সন্দেহ করেন, এককালের ইতালির দুর্ধর্ষ মাফিয়াতন্ত্রের মতো বাংলাদেশেও এখন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমি দস্যুতা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভিন্ন মাফিয়াতন্ত্র গজিয়ে উঠেছে। এই মাফিয়ারা প্রয়োজনে স্বদলের অন্য মাফিয়া গ্রুপের গলা কাটতেও দ্বিধা করে না। এই মাফিয়াদের সঙ্গে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকাতে অপরাধীরা কখনো ধরা পড়ে না এবং ধরা পড়লেও তাদের কখনো সাজা হয় না।
নারায়ণগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ডটি যাদের দ্বারা যে কারণেই ঘটে থাকুক অবিলম্বে এই বর্বরতার নায়কদের গ্রেফতার ও শাস্তি বিধান দরকার। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসঙ্কেত। ’৭৫ সালের আগেও এই ধরনের অপহরণ, গুম, খুন ও হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হয়েছিল। সেগুলোও ছিল সামাজিক অপরাধ। কিন্তু তা ব্যবহূত হয়েছে অসাধু রাজনীতিকদের দ্বারা অসাধু উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্যটি ছিল দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ প্রমাণ করে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা।
বর্তমানেও সারা দেশে গুম খুন অপহরণের ঘটনার ব্যাপক বিস্তার ঘটলে এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে অশুভ গণবিরোধী শক্তি তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। সরকারকে দেশ শাসনে ব্যর্থ প্রমাণ করে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে তারা পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তির চেষ্টা চালাতে পারে। হাসিনা সরকার সতর্ক হোন। গুম খুন অপহরণের বিস্তার রোধে কেবল পুলিশের উপর দোষ না চাপিয়ে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে মাফিয়াতন্ত্র গজিয়ে উঠেছে, এবং যে মাফিয়াতন্ত্রের দাপটের কাছে পুলিশ এবং প্রশাসনও অসহায় সে সম্পর্কে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল সচেতন হোন এবং এই মাফিয়াতন্ত্র উচ্ছেদে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। নইলে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হবে।
সর্বশেষে একটি কথা। বর্তমানে আমাদের কোনো পূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেই। দেশের বর্তমান অবস্থায় কেবল একজন প্রতিমন্ত্রী দ্বারা সবদিক রক্ষা পেতে পারে না। শেখ হাসিনা একা কতোদিক সামলাবেন? একজন টাফ এবং রাফ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার মতো কেউ কি আওয়ামী লীগে নেই? না থাকলে মহাজোটের ভেতর থেকে অথবা টেকনোক্রাট কাউকে বাছাই করে আনা হোক। সেইসঙ্গে পুলিশ ও র্যাবকে আরো বেশি সক্রিয় ও শক্তিশালী করে তোলা প্রয়োজন।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার আরও পাঁচ বছর নিশ্চিন্তে ক্ষমতায় থাকবেন এটা ভেবে যদি লাস্যে আলস্যে দিন কাটান তাহলে দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। নারায়ণগঞ্জের নরবলি আমাদের কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভাঙুক। দোষীরা যদি দলের লোকও হয় তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করা হোক এবং কঠোর শাস্তি দেয়া হোক।
[ লন্ডন, ২ মে শনিবার, ২০১৪ ]