নারায়ণগঞ্জকে আতঙ্কের নগরী বানালো কারা

নারায়ণগঞ্জ এখন এক আতঙ্কের নগরী। গুম-খুন, আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে যেন পুরো নগরবাসীকে। এ শহরের আতঙ্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়। গত দুই সপ্তাহ ধরেই চলছে এ ঘটনা। পরিবেশ নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের মাধ্যমে এ আতঙ্ক পর্বের সূচনা হয়। ব্যাপক আলোচনা, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দেয়। প্রাণে বেঁচে গেলেও ওই পরিবার এখনও আতঙ্ক থেকে বেরোতে পারেনি। তাদের চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ। এরপর সাতদিন পার না হতেই আবার সেই নারায়ণগঞ্জ থেকে দিনে-দুপুরে এক সঙ্গে সাতজন গুমের ঘটনা ঘটে। অবশ্য বেশি সময় নেয়নি ব্যাপক ক্ষমতাবান ওই গুমের নায়কেরা। তিন দিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনের লাশ নদীতে ফেলে রাখে। ঘাতকেরা এসব ঘটনা এত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেছে যে প্রশাসন এখনও কোনো ক্লু খুঁজে বের করতে পারেনি। স্থানীয় লোকজন সন্দেহ করে একজন ওয়ার্ড কমিশনারের অফিসে আগুন দেয়ার পর পুলিশ এখন তাকে খুঁজতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে সাতদিন। কিন্তু এ ঘটনায় কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এরপর গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ঘটে আরেকটি অপহরণের ঘটনা। শেষ পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টা পর সাভারের নবীনগর এলাকায় চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। অবশ্য ভাগ্য ভাল যে তিনি অন্তত জীবিত আছেন। লাশ নদীতে ভেসে ওঠেনি। এ সান্ত্বনা নিয়েই হয়ত তিনি এখন ভাল থাকার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এভাবে কি ভাল থাকা যায়, ভালো থাকা যাবে? নারায়ণগঞ্জের গত কয়েকদিনের ঘটনায় সারাদেশেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। কে, কোথায়, কখন অপহূত হবেন, কে চিরদিনের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যাবেন, কার লাশ কোথায় পাওয়া যাবে, এসব নিয়ে চলছে এখন ব্যাপক আলোচনা। জনগণের আলাপচারিতায় এসব প্রশ্ন কি চলতেই থাকবে? এমন উদ্বেগ আর আতঙ্কের মধ্যে কতদিন থাকবে মানুষ? আর যারা এসব গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তারা কি ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবেন? গোটা দেশে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হতে চলেছে এ থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই নারায়ণগঞ্জের এই গুম-খুনের রহস্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে বের করতে হবে সরকারকে। খুনীরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন। নারায়ণগঞ্জকে যারা আতঙ্কের নগরী বানিয়ে তা ছড়িয়ে দিয়েছে সারাদেশে, তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এ অবস্থা আর বাড়তে দেয়া যায় না। যারাই এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তারা দেশ, সরকার, রাজনৈতিক দল, মানুষ-সকলের শক্র। এ গণদুশমনদের এখনই চিহ্নিত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তাহলে যদি কিছুটা হলেও জনমনে স্বস্তি ফেরে। কারণ মানুষের খুব বেশি চাওয়ার নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের কাজ করে বাঁচতে পারে। দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। তারা চায় একটু নিরাপদ জীবন। যেখানে বাড়ি ফেরার পথে কিংবা অফিসে যাবার পথে তিনি গুম হয়ে যাবেন না। কেউ তাকে ধরে খুন করে ফেলবে না। নারায়ণগঞ্জের মতো পরিস্থিতি যাতে আর কোন স্থানে তৈরি না হয়, সেজন্য এখন থেকেই খুব সূক্ষ্মভাবে সংশ্লিষ্টদের কাজ শুরু করতে হবে। গত দুই সপ্তাহের খুন-গুমের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না।  লেখক : সাংবাদিক