অর্থনীতি
উত্পাদনশীল শ্রম নিয়ে ভাবতে হবে
মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৪, ২১:৫৫
উত্পাদনশীল শ্রম নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অভাব নেই, ফিজিওক্রাট অর্থনীতিবিদদের মতে, যে শ্রম চূড়ান্তভাবে উপযোগ (Utility) সৃষ্টি করে, সেটা উত্পাদনশীল শ্রমের মধ্যে পড়ে। কেননা কোন রাজমিস্ত্রি একতলা ইমারত তৈরি করে, কিন্তু জটিলতার কারণে পুনরায় যদি ভেঙ্গে ফেলে, তা উত্পাদনশীলতার মধ্যে পড়ে না। এদিকে 6 M’s (Man, Money, Machine, Method, Motivation & Market) নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা আবর্তিত হলেও Man তথা শ্রমজীবী মানুষ নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয়। কেননা শাশ্বত সত্যের আবরণে মানুষের স্বভাবজ প্রকৃতি ও মনগত দিক দিয়ে জটিল বিধায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে তারা তাদের মতো করে চলতে চায়, যা অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নেতিবাচক ছাপ পড়ে। আবার একইভাবে মালিকের খাম-খেয়ালীর জন্য খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের প্রাপ্য অধিকারের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে রানা প্লাজার ট্রাজেডি তার প্রমাণ। যাহোক, এহেন পরিস্থিতিতে শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দর কষাকষির লক্ষ্যে সঙ্গতকারণেই ট্রেড ইউনিয়নইজম প্রবর্তিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই কৃষি নির্ভরশীল বাংলাদেশে কোটি কোটি কৃষি শ্রমিকসহ অন্যান্য খাতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিকই তেমন সংগঠিত নয়। তাছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক বলে শ্রম বাজারের অর্ধেকের বেশি শ্রমিক শ্রেণী ট্রেড ইউনিয়নের দর্শনের ছাতার তলে আসতে পারে না বিধায় আইনের প্রয়োগ নেই। এ প্রেক্ষাপটে বহুবিধ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। এমন দেখা গেছে যে, কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি পর্যন্ত ভোগ করতে পারে না। উল্লেখ্য যে, এদেশে শ্রম আইন বৃটিশ আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আর এতে এমন কতগুলো বিধি আছে, যা অপ্রয়োজনীয়। আবার বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে অনেক বিধির কমতি রয়েছে বিধায় যুগোপযোগী করার জন্য কিছুটা সংযোজন ও বিয়োজনের আবশ্যকতা আছে বলে মনে করি। সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে কোন বিধিবদ্ধ আইনে বা বিধিতে শ্রম ও শিল্প আইনের সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। তবে ১৯৬৫ সালের কারখানা আইন এবং ১৯৬৯ সালের শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ প্রণিধানযোগ্য। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ম্যানুয়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বাস্তবে সিবিএ’র কার্যক্রম অনেকাংশে সাধারণ ও সরলমনা শ্রমিকদের থেকে দূরে অবস্থান করে বলে প্রতীয়মান হয়। এদিকে বর্তমানে অন্যতম প্যারামিটার হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নের বিষয় নিয়ে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে আন্তর্জাতিকভাবে জটিলতা দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিক গার্মেন্টস শিল্পের উপর হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যদিও চলমান সরকার এটি নিরসন করতে দেন-দরবার অব্যাহত রেখেছেন।
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশ সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে যতগুলো ফ্যাক্টর আছে, তার মধ্যে সস্তা শ্রম অন্যতম। এরই সুবাদে বাংলাদেশ শত বাধা-বিঘ্নের মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে গার্মেন্টস শিল্প আশে-পাশের দেশের সাথে বলতে গেলে প্রতিযোগিতা করে বহাল-তবিয়তে টিকে আছে। এখানে বারো লাখ মহিলা শ্রমিকসহ প্রায় পনের লাখ শ্রমিক দিবা-নিশি কাজ করে চলেছে এবং এদের চাহিদা খুব একটা নেই এবং অল্পে তুষ্ট বলে এক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট নিয়ে মালিকরা অনেক সময় ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে। এখন শ্রম বাজার স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে ম্যাক্রো অর্থনীতির আওতায় দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক প্রতিনিয়ত বিশ্ব শ্রম বাজারে ঢুকছে এবং বয়ে নিয়ে আসছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে দক্ষ শ্রমের চাহিদা বেশি বলে, এই পথ ধরে যুগপত্ যে মেধা চলে যাচ্ছে (Brain-Drain) তা অনেক ক্ষেত্রে ফিরে আসে না এবং এটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে শুভ নয়। তাছাড়া বর্তমানে শিশু শ্রম (Child Labour) আর এক ফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বায়নের (Globalisation) পথ ধরে শ্রম বাজারে যতটুকু সংগঠিত হয়েছে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে পরিসরে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, তার পিছনে রয়েছে মে দিবসের আওতায় আমেরিকার শ্রমিকদের চরম দুঃখের কাহিনী এবং ত্যাগের প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তবে মে দিবসের দুঃখজনক ঘটনার পূর্বে মে মাস ছিল রূপকথার আওতায় আনন্দঘন পরিবেশ ও মিষ্টি আবহাওয়ায় হিল্লোল সম্বলিত বাতায়ন। কিন্তু পট পরিবর্তন হয় ১৮৮৬ সালে। সেই বছরের মে মাসের ১ তারিখে সর্বস্তরের শ্রমিকশ্রেণী কর্মক্ষেত্রে সব কাজ বন্ধ রেখে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে সমাবেশ করে শিকাগোতে।
যা হোক, শ্রমের মূল্য বৃদ্ধিতে শ্রমিকের দক্ষতা ও মানোন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে।
লেখক :গবেষক
Email: abdulbaki85@yahoo.com