জীবনমান উন্নয়নে অগ্রগামী একজন
প্রকাশ : ০৪ মে ২০১৪, ২০:২১
প্রজন্ম এগিয়ে চলে তার আপন ধারায়, নিত্য নতুন কর্মস্পৃহা, কর্মপদ্ধতি প্রজন্মকে করে তোলে আরও বেশি সফল। বহির্বিশ্বে নিজের মেধা এবং মননকে কাজে লাগিয়ে সফল হওয়া প্রজন্ম বরাবরই নিজের সাথে তুলে ধরেন দেশের নাম। সফলতার মঞ্চের নিত্য নতুন যোগ করেন আরও একটি সাফল্যের গল্প। এমনই একজন যুক্তরাষ্ট প্রবাসী বাংলাদেশি নীনা আহমেদ। যিনি প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এশিয়ান-আমেরিকান অ্যান্ড প্যাসিফিক আইল্যান্ডার্সবিষয়ক (এএপিআই) পরামর্শক কমিশনের সদস্য হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। যা তার এবং দেশের জন্য এক অভাবনীয় সম্মান। এই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী সফল এই নারীকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
‘এই প্রশাসনে যোগ দিতে যারা রাজি হয়েছেন আমি আনন্দের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধদের নাম ঘোষণা করছি এবং সামনের দিনগুলোতে তাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছি।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এশিয়ান-আমেরিকান অ্যান্ড প্যাসিফিক আইল্যান্ডার্সবিষয়ক (এএপিআই) পরামর্শক কমিশনের নাম ঘোষণার পর ওবামা মন্তব্য ছিল এমনই উচ্ছ্বাসে ভরা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারাক ওবামার প্রশাসনে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে উচ্চারিত হয় নীনা আহমদের নাম। ১৪ সদস্যের ওই কমিশনে নীনার পাশাপাশি তিন ভারতীয়র নামও প্রস্তাব করা হয়। এএপিআই’র অন্য সদস্যরা হলেন—মিকায়েল বিউন, রবি চৌধুরী, লিয়ান চিউন, বিলি ডেক, বিল ইমাদা, ক্যাথি কো চিন, ডি জয় মাইলার, ডায়ানে নারাসাকি, শেখর নরসিমহান, মেরি এ্যান ইয়ং ওকাদা, মলিক পাঞ্চলি, লিন্ডা এক্স, ফান ও লরনা মে হো রেন্ডলেট। উল্লেখ্য, এএপিআই কমিশন যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আমেরিকান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপবাসী সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে। এই কমিশন সদস্যরা দেশজুড়ে এএপিআই নাগরিকদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার উপায় উদ্ভাবনের বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেবেন।
নীনা ফিলাডেলফিয়ার উত্তর-পশ্চিমের মাউন্ট এয়ারিতে স্বামী আহসান নসরতউল্লাহ এবং দুই মেয়ে ২১ বছর বয়সী জয়া আহমদ ও ১৩ বছর বয়সী প্রিয়া আহমদকে নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি ১৯৯০ সালে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া থেকে প্রাণ রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। অভিবাসীদের সহায়তার জন্য ১৯৯৪ সালে গড়ে ওঠা ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক রিয়েল এস্টেট ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালটিং কোম্পানি-জেএনএ ক্যাপিটলের অন্যতম উদ্যোক্তা নীনা। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই নারীকে নিজের এশিয়ান-আমেরিকানবিষয়ক ২৫ সদস্যের কমিশনের চেয়ারপারসন নিয়োগ করেন ফিলাডেলফিয়ার মেয়র মাইকেল নাটার। নীনা আহমদ ২১ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা পাড়ি দেন। ১৯৯০ সালে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া থেকে প্রাণ রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে কাজ করেন তিনি। তিনি মূলত চক্ষুরোগ ও হাড়বাতের ক্ষেত্রে কোলাজেন ও জিনগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও আবিষ্কারের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। এ-সংক্রান্ত তার একটি প্যাটেন্টও রয়েছে। ফরেনসিক ডিএনএ বিশেষজ্ঞ হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশিসহ এশিয়ান আমেরিকানদের উন্নয়নে নিরলস কাজের জন্য তিনি সমাজকর্মী হিসেবেই বেশি সমাদর পান। রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি পরিচিত।
হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে নীনার নাম ওবামার উপদেষ্টা হিসেবে প্রস্তাবিত হওয়ার কথা জানিয়ে তার সংক্ষপ্তি জীবনী তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, ড. নীনা আহমদ যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক রিয়াল এস্টেট ও ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি জেএনআই ক্যাপিটাল ইনকরপোরেশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সহ-স্বত্বাধিকারী। তিনি প্রতিষ্ঠানটির ৪৯ শতাংশ মালিক। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটির তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা। ড. নীনা ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী আইনি সহায়তাকারী ‘লিমিডেট লায়াবিলিটি কোম্পানি’ গ্লোবাল সিটি রিজিওনাল সেন্টারের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাওয়ার রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উইলস আই হসপিটাল ও জেফারসন মেডিক্যাল কলেজের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে সেবা দিয়ে আসছেন। এ সময়ের মধ্যেই তিনি উইলস আই হসপিটালের মিলকিউলার বায়োলজির গবেষণা বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ২০১১ সালে তিনি ফিলাডেলফিয়া ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব ম্যানেজার্স হিসেবে যোগদান করেন।
এদিকে ফিলাডেলফিয়া ফাউন্ডেশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ড. এন নীনা আহমাদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ফরেনসিক ডিএনএ বিশেষজ্ঞ। তিনি ফরেনসিক ডিএনএ পর্যালোচনা ও এ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে এক ধরনের চক্ষুরোগের জন্য কোলাজেন (তন্তুজাতীয় টিস্যু) টাইপ-২-এর রূপান্তর দায়ী। চক্ষুবিজ্ঞানে কোলাজেন নিয়ে তিনি গবেষণাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া ‘হাড়ের বাতের ক্ষেত্রে বংশগতি প্রবণতার শনাক্তকরণ পদ্ধতির’ অন্যতম পেটেন্টের অধিকারী তিনি।
নীনা জীবনে সফল হতে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া উদার মানসিকতা ও নমনীয়তার শিক্ষা দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তার সব পছন্দে স্বামীর সমর্থন ও সত্যিকারের জীবনসঙ্গী হিসেবে ভূমিকা রাখার কথাও স্মরণ করেন তিনি। প্রথম সন্তান জয়ার জন্ম ও নিজের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকে জীবনের সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে দেখেন তিনি।