আগামী বাজেট ও সামগ্রিক চাহিদা

বর্তমান অর্থবত্সর শেষ হইবার পথে। তাই আগামী অর্থবত্সরের বাজেট প্রণয়নের কাজ চলিতেছে এখন। যতদূর জানা যায়, আসন্ন বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মূল লক্ষ্যকে সামনে নিয়া অগ্রসর হইতেছে সরকার। গত কয়েক বত্সরে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির তেমন কোন পরিবর্তন হয় নাই। অর্থাত্ সরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি বাড়িলেও বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি তেমন একটা বাড়ে নাই। অথচ আমাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের যে লক্ষ্য সেই লক্ষ্যে পৌঁছাইতে হইলে সামগ্রিক বিনিয়োগকে বর্তমানের জিডিপির ২৫ শতাংশ হইতে বাড়াইয়া ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশে তুলিয়া আনিতে হইবে। প্রতি ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের বিনিয়োগ করিতে হইবে জিডিপির ৪ শতাংশ। সেই হিসাবে ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছাইতে হইলে আমাদেরকে অবশ্যই ৩২ শতাংশ জিডিপি বিনিয়োগ করিতে হইবে। যেইসব দেশে প্রচুর পরিমাণে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে তাহাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। তাহাদের আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ খানিকটা কম হইলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্লথ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এফডিআই-এর প্রবাহ তেমন একটা নাই বলিয়া আমাদেরকে আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ তথা সঞ্চয়ের উপর নির্ভর করিতে হয় প্রবৃদ্ধির জন্য। এই নির্ভরতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হইল আমাদের আভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ৮০ শতাংশই বেসরকারি বিনিয়োগ। এই বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি স্লথ হইলে সামগ্রিক বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হইয়া পড়ে। এমনি একটি চক্রের মধ্যে পড়িয়া গিয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ হইতে নামিয়া আসিতেছে ৫.৭ শতাংশের দিকে। তাহার কারণ একটাই বিনিয়োগ স্বল্পতা। তাহার মানে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও রহিয়াছে নিম্নমুখী চাপ। আর কর্মসংস্থানের স্লথ গতি স্লথ করিয়া দেয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাহিদা কমিবার আরেকটি কারণ বৈদেশিক আয় প্রবাহে ভাটা। প্রবাসীদের আয়ের একটি বড় অংশ সর্বাগ্রে আসে ভোগে। আর এই ভোগ আমাদের আভ্যন্তরীণ চাহিদার একটি বড় অংশ। আমাদের দ্রব্যের রপ্তানির মাধ্যমে বিদেশে চাহিদা খানিকটা বাড়িতেছে সকল প্রতিকূল অবস্থার পরেও। কিন্তু প্রবাসী আয় কমিয়া যাওয়ায় তাহার প্রভাব পড়িতেছে সামগ্রিক চাহিদার উপর। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্লথ হইবার কারণেও সামগ্রিক চাহিদার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে। সবকিছু মিলিয়া যদি সামগ্রিক চাহিদা অনেকটা কমিয়া যায় তখন কিন্তু বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়াও ব্যক্তি কিংবা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো যাইবে না। সরকার সুদের হার ও কর্পোরেট করের হার কমাইয়া বিনিয়োগ প্রণোদনা বাড়াইবার চেষ্টা করিতেছে আসন্ন বাজেটে। কিন্তু সামগ্রিক চাহিদা কমিয়া গেলে তাহা খুব একটা কার্যকর হইবে না। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় সামগ্রিক চাহিদা কিভাবে বাড়ানো যায় তাহার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। অন্যদিকে, প্রবাসী আয়ে টান পড়িবার আসল কারণগুলি কী তাহা খতাইয়া দেখিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। অন্যথায়, শুধু সামগ্রিক চাহিদা নহে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও টান পড়িবে। ফলে টাকা আর ডলারের বিনিময় মূল্যের স্থিতিশীলতাও নষ্ট হইবে, যাহার উপর নির্ভর করে সার্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতি।