[ সা ম্প্র তি ক ]

কোথায় উত্পত্তি এই ভেজালের দুনিয়ার

ভেজালের দুনিয়ায় এখন আমাদের বসবাস। ভেজাল চতুর্দিকে! তরমুজে ভেজাল, খাদ্যে ভেজাল— মায় সম্মাননা ক্রেস্টের সোনাতেও ভেজাল। এমনকি ভেজালেও এখন ভেজাল। ভেজালের রাজত্ব ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতো তা আজ গ্রাস করেছে গোটা সমাজকে। সব রকম ভেজালের মধ্যে আগে খাদ্যে ভেজাল নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। খাদ্যে ভেজালের ব্যাপারটি মানব সমাজের ক্ষেত্রে অনেকটাই একটি ‘আধুনিক’ মুসিবত। প্রকৃতিতে ও তার কোলে লালিত প্রাণীকুলের মাঝে কোনো ভেজালের কারবার কখনই ছিল না, এখনও নেই। তা আছে শুধু মানব সমাজে। অথচ মানুষই হলো ‘সৃষ্টির সেরা জীব’। এক্ষেত্রে একথাও সত্য যে, মানব সমাজের প্রাচীন ইতিহাসে খাদ্যে ভেজাল মিশানোর ব্যাপারটি ছিল অস্বাভাবিকই শুধু নয়, অসম্ভব ও কল্পনাতীত একটি বিষয়। মধ্যযুগে, কিম্বা প্রাক-বৃটিশ যুগেও খাদ্যে ভেজাল দেয়ার তেমন একটা নিদর্শন পাওয়া যায় না। কেবলমাত্র নিকট অতীতে, বৃটিশ শাসনামল থেকে, আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজাল মিশানোর ‘কারবার’ শুরু হয়েছে। তখন থেকেই দুধে পানি মিশানো, চাউলে কাঁকর মিশানো, ঘি-তেলে নানা ভেজাল মিশানো ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে এসব ‘কারবার’ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এদেশে ভেজালের রোগ প্রবেশ করেছে বৃটিশ শাসকদের হাত ধরে। মুনাফা তাড়িত পুঁজিবাদী সভ্যতার (আসলে অসভ্যতার!) অনুষঙ্গ রূপেই জন্ম নিয়েছে ভেজালের অমানবিক কারবার। ভেজালের এসব ‘কারবার’ প্রথমে গড়ে ওঠে প্রধানত শহরগুলোকে কেন্দ্র করে। মফস্বলে ভেজালের প্রচলন ছিল নগণ্য। আর গ্রামাঞ্চলে ভেজালের ‘কারবারের’ উপস্থিতি ছিল প্রায় একেবারেই শূন্য। কিন্তু দিনকে-দিন, তথাকথিত ‘আধুনিক সভ্যতার (পুঁজিবাদের) প্রসারের সাথে তাল মিলিয়ে, সর্বত্রই ভেজালের সর্বব্যাপী প্রসার ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়াতেই খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি আজকাল এক ভয়াবহ বিপজ্জনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপসহ ধনী দেশগুলোতে কঠোরভাবে খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের দ্বারা তা রোধ করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। কিন্তু খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি যে ‘নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার’ প্রয়োগ দ্বারা রোধ করার চেষ্টা করতে হচ্ছে এবং সেই ‘নিয়ন্ত্রণ-কার্যক্রম’ যে ক্রমাগত কঠোর থেকে কঠোরতর করতে হচ্ছে— তার দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, এসব দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার মাঝেই নিহিত আছে ‘ভেজাল প্রবণতার’ মৌলিক উত্স। আমাদের দেশে মুনাফা তাড়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যতোটা দ্রুত ও বেপরোয়াভাবে প্রসার লাভ করছে, ‘খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ সেই তুলনায় একেবারেই গড়ে উঠছে না। ফলে, অন্যান্য দেশের তুলনায় এবং এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও, বাংলাদেশে ভেজাল-খাদ্য ও খাদ্যে ভেজাল মিশানোর ব্যবসা একটি অনিয়ন্ত্রিত প্রাণঘাতী মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন আগে সর্বশেষ যে খবরটি জানা গেল তা হলো, বাজার থেকে তরমুজ কিনে খাওয়াটা নাকি খুবই বিপজ্জনক। এমনকি তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তরমুজ খাওয়ার কারণে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি মৃত্যু সংবাদ ইতোমধ্যে জানা গেছে। ডাব কিনে চোখের সামনে তা কেটে তার পানি খেলেও সেই ডাবের পানিও যে ভেজাল হতে পারে তার কথা আগেই জানা। দেশি-বিদেশি প্রায় সব ধরনের ফল-ফলারিতে মিশানো হচ্ছে কার্বাইড। এমনকি, পচন রোধের জন্য এসবের উপর স্প্রে করা হচ্ছে ফরমালিন। শাক-সবজির ক্ষেত্রেও একই দশা। তাছাড়া, শাক-সবজি ও ফলমূল চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত ও হাই-পটেন্সির সব কীটনাশক। এসব বিষ গাছের সিস্টেমে প্রবেশ করে শেষ পর্যন্ত ফলমূল শাক-সবজির একেবারে কোষের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। একারণে, শতবার পানি দিয়ে ধুয়েও এই বিষের প্রভাব দূর করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। দোকানে জিলাপি, চানাচুর, ডালপুরি ইত্যাদির চেহারা ও রং আকর্ষণীয় করার জন্য সেসব ভাজার সময় তেলের সাথে মবিল মিশানো হচ্ছে। বিস্কুট, সেমাই, লজেন্স, আইসক্রিম ইত্যাদিতে কাপড় বা চামড়া কালার করতে ব্যবহূত বিষাক্ত রাসায়নিক রং মিশানো হচ্ছে। ধবধবে সাদা ও মচমচা মুড়ি বাজারজাত করার জন্য তা ভাজতে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউরিয়া, হাইড্রোজ ইত্যাদি। পশু খাদ্যে ভেজালের কোনো সীমা নেই। দ্রুত মোটা-তাজা করার জন্য দেদারসে চলছে ইউরিয়া মিশ্রিত পশুখাদ্যের ব্যবহার। ট্যানারির বর্জ্য থেকে শুরু করে ফেলে দেয়া সব রকম অখাদ্য মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এ্যানিমেল-ফিড। খামারের গরু, হাঁস-মুরগি, মাছ ইত্যাদিকে খাওয়ানোর জন্য তা ব্যবহার করা হচ্ছে। গরু, মুরগি, মাছ ইত্যাদি খাচ্ছে বিষাক্ত খাদ্য— আর মানুষ খাচ্ছে সেই মাংস-মাছ। সেসব খেয়ে সাধারণ মানুষ বিষাক্রান্ত হচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল যুক্ত হচ্ছে কয়েক ধাপে। উত্পাদনের সময় প্রথমে নানা ধরনের কীটনাশকের মাধ্যমে একবার খাদ্য সামগ্রীতে ঢুকে পড়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক বিষ। বাজারজাত করার সময় দ্বিতীয় দফায় তার সাথে ফরমালিন, কার্বাইড ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ মিশানো হয়। তাছাড়া, গরমা-গরম তৈরি খাবার প্রস্তুতের সময় তৃতীয় দফায় যুক্ত হয় ভেজাল ও নানা রাসায়নিক বিষ। প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে জীবনধারণের জন্য ভেজালমুক্ত প্রাকৃতিক খাদ্য অপরিহার্য হওয়া সত্ত্বেও তার প্রাপ্যতা আজকাল প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ভেজাল খাবার খেয়ে অনেকের দেহে অজান্তেই বাসা বাঁধছে নানা রকম মরণব্যাধি। বেড়ে যাচ্ছে নতুন নতুন রোগ ও আক্রান্তের সংখ্যা। ফুটপাতে, কাঁচা বাজারে, মুদি দোকানে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, সুপার শপে— যেখানেই মানুষ খাদ্য সামগ্রী কিনতে যাক না কেন, ভেজালমুক্ত খাদ্য প্রাপ্তি সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত হতে পারেন না। ভয়ে ফলমূল বা শাক-সবজি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অনেকে। মাছ খেতে আতঙ্ক অনেকের। এমনকি পানিতেও দূষণ। বোতলজাত পানিতেও ভেজাল। মানুষ যাবে কোথায়? খাবে কি? বাঁচবে কিভাবে? ভেজাল খাদ্য মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর প্রভাবে মানুষ হূদরোগ, কিডনি, লিভার, ক্যান্সারসহ হরেক রকম মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি সমস্যা, খাদ্যে অরুচি, আলসার ইত্যাদি সাধারণ অনেক রোগের পাশাপাশি লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলইউর, ক্যান্সার, অস্থিমজ্জার অস্বাভাবিকতা, লিউকোমিয়া ইত্যাদির মতো মারাত্মক রোগ জন্ম নিতে পারে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে সৃষ্ট রোগ সাধারণত তাত্ক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। খাওয়ার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসেবে তার লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। এ কারণে সাধারণ মানুষ ভেজাল খাদ্যের বিপজ্জনক কুফল সম্পর্কে ততোটা সচেতন ও সর্তক থাকে না। খাদ্যে ভেজালের ‘কারবার’ এখন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ঘাতক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভেজাল খাদ্য খেয়ে ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যেকের আয়ু কিছুটা করে কমছে। যোগ করলে তা হবে লক্ষ লক্ষ মানুষের মোট আয়ুষ্কালের সমান। তাছাড়া ভেজাল খেয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে মরছে হাজার হাজার মানুষ। তাই, একথা বলা যায় যে, একাত্তরের গণহত্যার ৩০ লাখ শহীদের চেয়ে ভেজাল-খাদ্য নামের নীরব হত্যাকারীর শিকারের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। তদুপরি, এই নীরব ও ছদ্মবেশী গণহত্যার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। বরঞ্চ তার আক্রমণের রূপ ও ভিকটিমের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। খাদ্যে-ভেজাল মানুষের শরীর, স্বাস্থ্য, আয়ু ও জীবনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। যারা খাদ্যে ভেজাল দেয় তাদের সরাসরি উদ্দেশ্য কিন্তু মানুষের শরীর, স্বাস্থ্য, জীবনের ক্ষতি করা নয়। এই ক্ষতি সাধিত হয় পরোক্ষভাবে। ‘ভেজালদাররা’ খাদ্যে ভেজাল মিশায় প্রধানত আরো বেশি অর্থ বানাবার লোভে। মুনাফার জন্য দানবীয় লালসায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রাণ ভোমরা হলো ‘মুনাফার তাড়না’। মুনাফা বাড়ানোর সেই উন্মত্ত লালসাই পুঁজিবাদের গতির প্রণোদনার মৌলিক উত্স। সেই তাগিদ থেকেই উত্সারিত হয় অর্থ বানানোর নানা পন্থা। ভাল-মন্দ বা শুভ-অশুভের ফারাকটা সেক্ষেত্রে তখন গৌণ হয়ে যায়। কেনা-বেচা ও ব্যবসার সামগ্রীতে ভেজাল মিশিয়ে বাড়তি মুনাফা করার প্রবণতা হলো পুঁজিবাদের স্বাভাবিক প্রবণতা। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্বারাই কেবল ভেজালের সম্ভাব্য প্রসারকে সীমিত করে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু অর্থনীতিই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক উপরি কাঠামোকে। তাই শেষ পর্যন্ত জয় হয় বিপুল পরিমাণে অর্থ বানানোর ‘সহজ’ পথের— ভেজালের কারবারে। সমাজে অন্যান্য যেসব সামগ্রী তৈরি হয় (খাদ্য বাদে) সেসব ক্ষেত্রে ভেজালের কারবার খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। সেক্ষেত্রে যেনতেন পন্থায় অর্থ বানানোটাই ভেজালের কারবারের প্রত্যক্ষ ও একমাত্র উদ্দেশ্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘গলা কাটা প্রতিযোগিতার’ স্বাভাবিক ফলাফল হলো এ ধরনের ‘অনৈতিক’ প্রবণতা। খাদ্যে ভেজালের তুলনায় খাদ্য বহির্ভূত অন্যান্য সামগ্রীতে ভেজাল মিশানোর বিষয়টি আরো পুরানো ও প্রাথমিক। নকল হলো ভেজালের আরেকটি বিশেষ রূপ। কোন পণ্য নকল হয় না? সস্তা উপাদান দিয়ে একটি সামগ্রী তৈরি করে সেটিকে অনেক দামি বলে চালিয়ে দেয়াটা ভেজালের আরেকটি রূপ। এসব পন্থার আশ্রয় নেয়া হয় স্রেফ অর্থ বানানোর প্রতিযোগিতা-মূলক দানবীয় লালসায়। এই লালসার সামনে নীতি, নৈতিকতা, মানবিকতা, বিবেক, দেশপ্রেম ইত্যাদি সব মূল্যবোধই তুচ্ছ ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। আমাদের চতুর্দিকে ভেজালের এসব খেলামেলা কারবার আমরা হরহামেশাই দেখে চলেছি। ভেজালের এই বিবেকহীন দানবীয় কারবারের সর্বশেষ একটি নির্দশন দেখা গেল রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সম্মাননা ক্রেস্টের সোনায় ভেজালের ঘটনায়। স্বাধীনতার চার দশক পূর্তি উপলক্ষে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে সরকার সাত পর্বে ৩৩৮ জন বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে সম্মানিত করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা ও মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা— এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে এসব সম্মাননা দেয়া হয়েছে। সম্মাননা প্রাপ্ত সবাইকেই অন্যান্য উপহার সামগ্রীসহ একটি করে ক্রেস্ট দেয়া হয়েছে। এসব ক্রেস্টের প্রতিটিতে এক ভরি সোনা ও ৩০ ভরি রূপা আছে বলে বলা হয়েছে। সম্মাননা ও ক্রেস্ট দেয়া শেষ হওয়ার পর এখন সেসব ক্রেস্টে ভেজাল থাকার তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ল্যাবরেটরিতে সেসব ক্রেস্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, সেগুলোতে আসলে রয়েছে নির্ধারিত পরিমাণের মাত্র এক-চতুর্থাংশেরও কম সোনা। আর, ৩০ ভরি রূপার বদলে তাতে আছে সমান ওজনের পিতল, তামা ও দস্তা মিশ্রিত শংকর ধাতু। সম্মাননা প্রাপ্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে এভাবে ভেজাল ক্রেস্ট প্রদান করে প্রতারিত করা হয়েছে। এর ফলে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে সাথে দেশের মান-মর্যাদা-সম্মানকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। ভেজাল ও নকলের ছড়াছড়ি এখন চতুর্দিকে ও সর্বত্র। জামা-কাপড় পোশাক-পরিচ্ছদে ভেজাল, বিছানাপত্র-আসবাব সামগ্রীতে ভেজাল, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে ভেজাল, যানবাহন-পরিবহন উপকরণে ভেজাল, নির্মাণ সামগ্রীতে ভেজাল, কৃষি উপকরণে ভেজাল— ভেজাল ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। লেখাপড়ায় ভেজাল, পড়াশুনার সার্টিফিকেটে ভেজাল, বিশেষজ্ঞ পরিচয়ের মধ্যে ভেজাল, কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখায় ভেজাল চালু হয়েছে। নিত্যদিনের সংসার জীবনের হাজারটি প্রয়োজনীয় উপকরণ হোক, কিম্বা ঘরের বাইরের রাস্তাঘাট অফিস-আদালত ইত্যাদি ক্ষেত্রেই হোক— ভেজালের মাঝেই আমাদেরকে বাস করতে হচ্ছে। দূষণও এক ধরনের ভেজাল। এই ভেজালের প্রকোপে প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষেত্রে এমন ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটি মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে আর হয়তো বেশি দেরি হবে না। জীবনের অস্তিত্ব এখন শংকার মুখে পতিত হয়েছে। আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের অপপ্রয়োগ করে অর্থ বানানো, তথা ঘুষ-দুর্নীতিও এক ধরনের সামাজিক ভেজাল। ঘুষ দুর্নীতির প্রকোপ সামাজিক জীবনকে কলঙ্কিত ও অসহনীয় করে তুলেছে। এক্ষেত্রে অবস্থা আরো খারাপ। ঘুষ-দুর্নীতির জগতে ভেজালেও ‘ভেজাল’ ঢুকেছে। ঘুষ নেয়ার পরও আজকাল অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত কাজটি করা হয় না। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয় না। ‘ঘুষের মধ্যেও এখন দুর্নীতি প্রবেশ করেছে’। আরো বেশি-বেশি অর্থ বানানোই হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল প্রণোদনা। ভেজালের কারবার হলো অর্থ বানানোর একটি উত্কৃষ্ট ও সহজ উপায়। সে কারণে একথা এখন খুবই স্পষ্ট যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই হলো ভেজালের কারবারের জন্মদাতা। ভেজাল মুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করতে হলে সে কারণে প্রয়োজন পুঁজিবাদ মুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করা। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : selimcpb@yahoo.com