মধুর আমার মায়ের হাসি
প্রকাশ : ০৫ মে ২০১৪, ১৯:৪৩
‘মা’ ত্রিভুবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। মা কথাটি ছোট্ট হলেও মা-ই বসুন্ধরা। মমতার আধার তাঁর সহজাত মমত্ব দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন অসামান্য দরদে। সন্তানের রোগে-শোকে মাও আক্রান্ত থাকেন একই তন্ত্রীতে। মহান আল্লাহ্ তায়ালার সেরা সৃষ্টি মায়ের মতো আপন কেউ নেই, কেউ হতেও পারে না। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ সবচেয়ে আপনজন মাকে সম্মান জানাতে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘মা দিবস’। এই দিবস নিয়ে আমাদের এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে প্রতিবছর মা দিবস পালন করা হয়। তবে দেশ ভেদে মা দিবস পালনের তারিখে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। সাধারণত প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস হিসেবে পালন করার রীতি অনেক দেশেই গড়ে উঠেছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মা দিবস পালন করার রীতি এ যুগের নয়। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও অনেক জায়গায় এই দিবসটি পালন করত মানুষ। অবাক হওয়ারই কথা। খ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে থেকেই মিশর, রোম ও গ্রিসে মা দিবস পালন করা হতো। তবে সে দিবসটা ঠিক আমাদের বর্তমানের মা দিবসের মতো ছিল না। সেটাকে দেবতাদের মায়ের আরাধনা বলা যায়। সেসময় দেবতাদের মায়েদের (যেমন দেবী আইসিস, সিবিলি, রিয়া) পূজা করা হতো। এদিকে ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে মা দিবস পালন করা হতো বলে জানা যায়। এটাই ছিল দেব-দেবীদের মা ছাড়া নিজের আসল মাকে নিয়ে মানে রক্ত-মাংসের মাকে নিয়ে মা দিবস। দিবসটি তারা মাদারিং ডে হিসেবে পালন করত। সেদিন সরকারি ছুটিও ছিল। পরিবারের সবাই তাদের মায়ের সাথে দিনটি কাটাত। তবে এই দিবসটি ততোটা প্রসার লাভ করেনি। ব্রিটিশরা আমেরিকায় তাদের কলোনি স্থাপন শুরু করার পর ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে মানুষ এসে আমেরিকায় বসবাস করতে শুরু করে। আমেরিকার এই সব নতুন অধিবাসীরা ইংল্যান্ডের মাদারিং ডে’কেও আমেরিকায় আমদানি করে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে। কিন্তু নানা কারণে সেটা তারা চালু রাখতে পারে না। এর প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। তিনি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় একটি দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন। সে গানটা সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল কারণে বা অকারণে। এক মায়ের সন্তান আরেক মায়ের সন্তানকে হত্যা করছিল অবলীলায়। এই সব হত্যাযজ্ঞ দেখে জুলিয়া খুব ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি এটা বন্ধ করার জন্য আমেরিকার সব মাকে একসাথে করতে চাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করতে চাচ্ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল এই দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করার। তিনি ব্যাপকভাবে সাড়া না পেলেও তার নিজের শহর বোস্টনে দিবসটি পালিত হচ্ছিল বেশ ঘটা করেই। এদিকে ভার্জিনিয়ার একটি নারীদের দল জুলিয়া ওয়ার্ড হাওয়ের প্রস্তাবিত মা দিবসটি পালন করত বেশ মর্যাদার সঙ্গেই। এই দলের নেত্রী ছিলেন অ্যানা রিভেস জারভিস। তিনি গৃহযুদ্ধের সময়কালে ‘মাদার’স ফেন্ডসিপ ডে’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই দিবসের পালনের কারণে গৃহযুদ্ধ সময়কালে অনেকটাই শান্তির বার্তা এনে দিয়েছিল। অ্যানা রিভেস জারভিস তার জীবনের সুদীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়েছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গির্জায়। সেখানে তিনি সানডে স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মা দিবস ঘোষণা আন্দোলনের হাল ধরেন। অ্যানা জীবিত ও মৃত সব মায়ের প্রতি সম্মান জানানোর তথা শান্তির জন্য এই দিবসটি পালন করতে চাচ্ছিলেন। এই লক্ষ্যে তারা ১৯০৮ সালে গ্রাফটনের ওই গির্জার সুপারিনটেনডেন্টের কাছে একটি আবেদন জানায়। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সে বছরই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভেনিয়ার কয়েকটি গির্জায় মা দিবস পালিত হয়। এভাবে অনেকেই প্রতিবছরই মা দিবস পালন করতে শুরু করে। এরপর অনেক পথ পেরিয়ে ১৯১৪ সালে আমেরিকার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে জাতীয় মা দিবসের মর্যাদা দেয়। আরও পরে ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মা দিবস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পালন করা হয়। শুধু কী তাই, দেশভেদে এই বিশেষ দিবস পালনের রীতিও ভিন্ন ভিন্ন। তবে সব দেশের রীতিতে যত ভিন্নতাই থাকুক একটা ব্যাপারে সবাই কিন্তু এক। সেটা আর কিছুই নয়, সবাই চায় এই দিনে মাকে খুশি করতে। মায়ের সাথে সময় কাটাতে, মাকে সুন্দর সুন্দর জিনিস বানিয়ে উপহার দিতে আরও অনেক কিছু।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। এই দেশটি অক্টোবর মাসের তৃতীয় রবিবার মা দিবস পালন করে থাকে। এই সময়টা আর্জেন্টিনায় বসন্তকালের আমেজ থাকে। তাই মা দিবসে পরিবারের সবাই মিলে ঘুরতে বেরোয়। অবশ্য সবাই যে বাইরে ঘুরতে যায় এমন নয়। যারা বাড়িতে থাকে, তারা মাকে খুশি করতে নানা কাজ করে থাকে। যেমন—মায়ের সম্মানে তারা একত্রে খাওয়া-দাওয়া করে, কবিতা আবৃত্তি করে। আবার স্কুলে গিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে চিঠি লেখে বা নিজে হাতে কার্ড বা অন্যকিছু বানিয়ে মাকে উপহার দেয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এইদিনে মায়ের কথা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এদিকে এইদিনে আর্জেন্টিনায় পরিবারের বাবা রান্না ও ঘরের অন্যান্য কাজ করে। যেন আজ মায়ের ছুটি। তাছাড়া মাকে ফুল, কার্ড, ক্যান্ডি, অলংকার বা অন্যান্য চমকপ্রদ কিছু উপহার দেয়। আবার ফ্রান্স মে মাসের শেষ রবিবার মা দিবস পালন করে আসছে ১৯২০ সাল থেকে। এই দিনটি তারা সরকারিভাবে পালন করে। মজার ব্যাপার হলো, যে মায়ের যত বেশি সন্তান তার তত বেশি সম্মান। এজন্য যে মায়ের চার বা পাঁচটি সন্তান আছে তাকে মা দিবসে সরকারিভাবে ব্রোঞ্জ পদকে পুরস্কৃত করা হয়। একইভাবে যার ছয় বা সাতটি সন্তান তাকে রৌপ পদক এবং যার আটটি বা তারও চেয়ে বেশি সন্তান তাকে স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মান জানানো হয়। জাপানে মা দিবসের পৃথক একটি নাম আছে। তারা মা দিবসকে বলে ‘হাহা নো হি’। ১৯১৩ সাল থেকে জাপানি খ্রিস্টানরা আমেরিকান রীতিতে মা দিবস পালন করতে শুরু করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে পশ্চিমাদের অনুকরণে এই দিবসটি পালন করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যুদ্ধের পর থেকে আবার তারা মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালন করছে। জাপানিরা এই দিনে মাকে ফুল, রুমাল এবং হাতব্যাগ উপহার দেয়। বাড়িতে আয়োজন করা হয় জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবারের। মেক্সিকোতে অনেক আগে থেকেই মা দিবস পালন করা হয়। মেক্সিকানরা ১০ মে মা দিবস পালন করে। সকাল বেলায় পরিবারের সবাই মিলে মাকে গান শুনিয়ে মা দিবসের শুরু হয়। মাঝে মাঝে ব্যান্ড দলও ভাড়া করে আনা হয় গান গাওয়ার জন্য। মায়ের জন্য সন্তানরা ফুল আর চকোলেট কেনে।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় সব কিছুরই আলাদা আলাদা নাম আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক ভাষার সাথে আরেক ভাষার কোনো মিলই নেই। কিন্তু পৃথিবীর সব দেশের শিশুর প্রথম ভাষা ‘মা’। তাই এক কথায় ‘মা’ শব্দটি আসলে কোনো ভাষার নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এই শব্দটি সার্বজনীন। যেমন—ফান্সে মা বলা হয় মেরি, জার্মানিতে মাটার, হিন্দিতে মাজি, উর্দুতে উমি, ইংরেজিতে মামি, মাম, মামা, মাম্মি, বাংলায় আম্মা, আম্মি, আম্মাজি, মাগো, মা। ভালো মতো খেয়াল করে দেখুন, মা শব্দটি কী খুব বেশি পার্থক্য সৃষ্টি করছে? অবশ্যই না। তাই মা কিন্তু হেলাফেলার কোনো কিছু নয়। মা দিবসটিও পালন করতে হবে সুন্দর ও অর্থপূর্ণভাবে। এই দিনে অনেকেই ফুল, বই, গানের সিডি, চকোলেট বা অন্য বিশেষ কোনো কিছু উপহার হিসেবে বেছে নেয়।
সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে মায়েরা অসামান্য অবদান রাখেন। একটি জাতির শিক্ষিত হয়ে ওঠার পেছনে মায়েদের অবদান সবচেয়ে বেশি। যে পরিবারে মা শিক্ষিত সেই পরিবারের সন্তানেরা সহজেই সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে। এসব বিবেচনা করেই বর্তমান সরকার মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশে মায়ের মর্যাদাকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য পাসপোর্ট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরমে মায়ের নাম বাধ্যতামূলক করা হয়। বয়স্ক মায়েদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। চাকরিজীবী মায়েদের কষ্ট লাঘবের কথা বিবেচনায় রেখে সচিবালয়সহ বিভিন্ন ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতোমধ্যে তাদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আজ সমাজে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আগামী ১১ মে ‘মা দিবস’ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে।
পৃথিবীর প্রায় সব কবিই মাকে নিয়ে ছড়া-কবিতা লিখেছেন। বাংলাভাষার কবি বা ছড়াকারও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। কবির কল্পনায় মায়ের নানা রূপ ফুটে উঠেছে ছড়া-কবিতাতে। এসব ছড়া-কবিতায় মা কখনও মমতাময়ী, কখনও খেলার সাথি, কখনও তার শিশুমনের আজব কল্পনায় সবচেয়ে আপন চরিত্র, কখনোবা একমাত্র অবলম্বন। একেক কবি মাকে একেকভাবে চিত্রিত করেছেন তাদের ছড়া-কবিতায়। তেমনি কবি কাজী কাদের নেওয়াজ লিখেছেন—‘মা কথাটি ছোট্ট অতি/কিন্তু জেনো ভাই/ইহার চেয়ে নাম যে মধুর/ত্রিভুবনে নাই।’
মা দি ব সে আ প নি যা ক র তে পা রে ন
সারাদিন মা কত পরিশ্রম করেন সেটা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? মা দিবসে মাকে একটু বিশ্রাম দিতে বাড়ির কাজগুলো না হয় নিজেই করুন। বাড়ির ঘরগুলো যতটুকু
পারেন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখুন। শুধু মা দিবসেই নয় অন্যান্য দিনেও মাকে নানাভাবে সাহায্য করতে পারেন।
মায়ের প্রিয় কোনো খাবার রান্না করতে পারেন। আর রান্না যদি করতে না পারেন তাহলে অন্তত একটা আইসক্রিম তো বানাতে পারবেন, তাই না? নিজের হাতে একটা আইস ক্রিম বানিয়ে মাকে দিন।
মায়ের জন্য কিনে নয় নিজেই তৈরি করতে পারেন একটি কার্ড। দেখতে সুন্দর না হোক আপনার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এই সামান্য জিনিসটাই মায়ের কাছে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
মাকে নিয়ে একটি ছবি এঁকে ফেলুন।
যারা বিশেষ কারণে এই দিনে মায়ের কাছে থাকতে পারছেন না তারা মাকে চিঠি লিখতে পারেন। আর ফোন কল, এসএমএস
তো পাঠাবেনই। যারা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তারা মজার মজার মা দিবসের ই-কার্ড পাঠাতে পারেন।