অপহরণ, স্বার্থ ও উল্টো পথে যাত্রা
প্রকাশ : ০৫ মে ২০১৪, ২১:২৩
আমরা হুজুগে জাতি। কোনো একটা হুজুগে না মাতলে আমাদের চলে না। যখন যে বিষয়টি সামনে আসে তখন আমরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ি। এজন্য কোনো না কোনো একটা ইস্যু চাই। আমাদের দেশে বেশ কিছু দিন ধরেই হুজুগে মাতবার মতো তেমন কোনো ইস্যু বা উপকরণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমাদের তো ঘুম নষ্ট, মাথা নষ্ট, দেশে কোনো ‘উত্তেজক’ ইস্যু নেই, আমরা বাঁচি কী নিয়ে। না, আমাদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। কিছু অজ্ঞাত দয়ালু ব্যক্তি নতুন আমাদের আপাতত মাতিয়ে রেখেছেন ‘অপহরণ’ ইস্যুটি উপহার দিয়ে।
এবার তুলনামূলকভাবে কালবোশেখি ঝড় আমাদের তেমনভাবে আলোড়িত করতে পারেনি। অপহরণই এবার যেন কালবোশেখি হয়ে দেখা দিয়েছে। অপহরণের হিংস্র থাবায় আমরা জর্জরিত, আতঙ্কিত। যে যেভাবে পারছে, যাকে পারছে অপহরণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে অপহূতরা ফিরে আসছেন, আবার অনেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছেন। অনেকের লাশ মিলছে। অনেকের নাম-নিশানা-লাশ কিছুই মিলছে না।
জোর করে বা কোনো ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা বা বন্দী করে রাখাকে সাধারণত আমরা অপহরণ বলি। ‘অপ’ মানে নিন্দিত, নিকৃষ্ট, খারাপ। আর ‘হরণ’ মানে হচ্ছে—চুরি। সেদিক দিয়ে দেখলে অপহরণ একটা অতিশয় খারাপ জিনিস। তবে কিছু শব্দের পেছনে বসে ‘হরণ’ শব্দটি বিচিত্র মানে নিয়ে হাজির হয়। যেমন—দুঃখ হরণ (উপশম), হূদয় হরণ (প্রণয়) প্রাণ হরণ (লাশ)। আমাদের সমাজে অপহরণ শব্দটির ব্যবহার ‘থ্রি জি’ টেলিফোনের মতোই সাম্প্রতিক। আমরা চুরি-ডাকাতি, খুন ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত থাকলেও অপহরণ বা গুমের সঙ্গে তেমন ছিলাম না। আমরা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমপর্বে হূদয় হরণ, চিত্ত হরণ ইত্যাদির প্রয়োগ দেখেছি। আমাদের মতো ছাপোষা ভেতো বাঙালিরা মোটামুটি ‘হূদয় হরণ’ ইস্যু নিয়েই যুগ যুগ ধরে সন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু অপহরণের তোড়ে আমাদের সেই হূদয় হরণের ব্যাপারটি পুরোই মার খেতে বসেছে! সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপহরণসংক্রান্ত ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অপহূত ব্যক্তির ফিরে আসার পরেও অপহরণকারীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ফলে মীমাংসা না হওয়ায় সম্প্রতি সংঘটিত অপহরণের ঘটনাগুলোর রহস্য থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালেই। কৌতুককর ব্যাপার হচ্ছে, বেশিরভাগ সময়েই অপহরণকারীরা দেশের বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পরিচয়ে অপহরণের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। ‘রক্ষক’-দের বিরুদ্ধে ওঠা এমন গুরুতর অভিযোগটিরও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
আরও একটি উল্লেখ করার মত বিষয় হচ্ছে, অপহূত অবস্থা থেকে উদ্ধার হয়ে ফিরে আসার পর অপহরণের শিকার এই ব্যক্তিরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অপহরণের বিষয়ে কোনো কথা বলতে চান না। কোনো এক অজানা কারণে হয় তারা পুরোপুরি চুপ থাকেন, না হয় অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। এটাও একটা অপার রহস্য!
সত্যিই অপহরণের ঘটনাগুলো কেন ঘটছে, যারা ছাড়া পাচ্ছেন তারা কোন্ শর্তের ভিত্তিতে পাচ্ছেন, আর যারা গুম কিংবা খুন হচ্ছেন, তারাই বা কেন এমন নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছেন—এসব প্রশ্নের কোনো জবাব মিলছে না। সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার পথ ধরে সুযোগসন্ধানী মহল ঠিকই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশে তো ‘ঘরপোড়া’ বাড়িতে ‘আলু-পোড়া’ খেতে আসা মানুষের অভাব নেই!
না, আমাদের মধ্যে সততা নেই। আমরা বুদ্ধিমানও নই, তবে আমরা অবশ্যই চালাক। নিজের চামড়া বাঁচাতে, অপকর্মের দায় এড়াতে, অন্যের ঘাড়ে দায় চাপাতে আমাদের জুড়ি নেই। এ ব্যাপারে আমরা ভীষণ দক্ষ। কীভাবে আরেকজনকে ফাঁসানো যায়, জব্দ করা যায়, এ কৌশল আমরা সহজেই আয়ত্ত করি। এজন্য আমাদের বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও দরকার হয় না। চতুর ও ধূর্ত হওয়ার জন্য আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ লাগে না, কোনো বিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয় না। জন্মসূত্রেই এই গুণ অর্জন করি। আমাদের দেশে কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের কথা শুনলে মনে হয়, তারা প্রত্যেকেই একেকজন ফেরেস্তা, কারো কোনো দোষ বা সীমাবদ্ধতা নেই, জীবনে কেউ কোনো অন্যায় বা অপকর্মের ধারে-কাছেও ঘেঁষেননি, কারো মধ্যে কোনো রকম লোভ-মোহ-কাম-ক্রোধ নেই, দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ কামনা ছাড়া। যদিও আমরা জানি কিছু ব্যতিক্রম বাদে স্বার্থপরতা-সংকীর্ণতা-হিংসা-প্রতিপক্ষের অনিষ্ট কামনা আর মিথ্যাচার ভিন্ন সেসব লোকের জীবনে অন্য কোনো ব্রত নেই। নিজের স্বার্থ উদ্ধার, রাতারাতি বড়লোক হবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের দেশে এই শ্রেণির মানুষকে উন্মাদ বানিয়ে ফেলেছে। এ ব্যাপারে তারা সবচেয়ে বেশি সমর্থন পায় রাজনৈতিক দলের। তারা রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে সাড়ম্বরে চুরি, খুন, গুম, লুটপাট, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য সব রকম অপকর্মই করে থাকেন। যদিও এই সত্য তারা স্বীকার করেন না। রাজনীতিবিদরাও এটা কবুল করেন না। সব বাস্তব ঘটনাকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। নিজেদের ধোঁয়া তুলসি পাতা হিসেবে উপস্থাপন, পক্ষান্তরে সব অপকর্মের দায়ভার প্রতিপক্ষ বা অন্যের উপর দায়ী করাটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিপক্ষকে ভিলেন আর নিজেদের মহানায়ক হিসেবে উপস্থাপনের এই ধারা চলছে তো চলছেই। আমাদের সমাজ বর্তমানে একদল চতুর ও ধূর্ত ব্যক্তির ভণ্ডামি আর মিথ্যাচারের মাধ্যমে স্বার্থোদ্ধারের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জীবনের একটা বড় ট্রাজেডি!
আমাদের রাজনীতিটাও কিছু মতলববাজ ধূর্ত রাজনীতিকদের কারণে পচনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ আমরা জানি বেঁচে থাকার জন্য রাজনীতি চাই। এ রাজনীতি যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় গিয়ে আখের গোছানোর রাজনীতি নয়, জনমানুষের কল্যাণের রাজনীতি, সমাজকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতি। এজন্য রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ-নৈতিকতার চর্চা প্রয়োজন। প্রয়োজন ত্যাগ-তিতিক্ষা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, সততা ও আন্তরিকতা। কিন্তু আমাদের দেশে ভিন্ন নিয়ম। এখানে এমনিতেই ভালো কিছু করার লোকের খুব অভাব। কেউ একজন ভালো কিছু করার চেষ্টা করলে অন্যরা উঠে-পড়ে লাগে সেটাকে নষ্ট করতে। এ ব্যাপারে নীতি-নৈতিকতা চর্চার কোনো বালাই নেই।
কিছু ব্যক্তি রাজনীতিকে পরিণত করেছেন স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে। এ রাজনীতি অবশ্যই ক্ষমতার রাজনীতি। ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি আছে—এমন রাজনৈতিক দলের উপর ভর করে একটি বিশেষ সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ফুলে-ফেঁপে উঠছে। পুরনো মূল্যবোধ ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। গজিয়ে উঠেছে নতুন মূল্যবোধ। একটি নতুন জীবনদর্শনে তালিম দেয়া হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। সমাজ নয়, স্রেফ নিজের কথা ভাবো। নিজের আখের গোছাও। চুরি করে হোক, ডাকাতি করে হোক, কাউকে ঠকিয়ে, মেরে, খুন করে, লাশ গায়েব করে—যেভাবে হোক। যদি কোনো কেরামতিতে অনেক টাকা তুমি করতে পারো তাহলেই তুমি নমস্য।
অর্থ-বিত্ত-সম্মান-প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভের আশ্চর্য যাদুর চেরাগ খুঁজে বেড়াচ্ছেন নবপ্রজন্মের এই চতুর লোকগুলো। তাদের কাছে দেশের চেয়ে দল বড়। দলের চেয়ে নেতা বড়। সবার চেয়ে নিজের স্বার্থ বড়। এই বৃত্তেই যেন আমাদের জীবন আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
যদিও এ জীবন নিয়ে আমাদের বড় বেশি খেদ বা অভিযোগ আছে বলে মনে হয় না। সবাই দিব্যি খাচ্ছি-দাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি। যেখানে যতটুকু পরচর্চা আর আঁতলামি করা দরকার অকৃপণভাবে তা করছি। সরকার নিজের মত করে পথ চলছে, কারও কোনো পরামর্শ বা সমালোচনাকে পাত্তা দিচ্ছে না, নিজেদের কোনো ব্যর্থতাকেও স্বীকার করছে না। বিরোধী দল যথারীতি সরকারের বিরুদ্ধে ‘কাছা-খোলা’ ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সরকারকে বিপদে ফেলতে যা যা করা দরকার তার সবকিছুই করছে।
সবাই নিজ নিজ বিশ্বাস ও কর্মসূচি নিয়ে পথ চলছে। এদিকে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আমাদের ভাগ্যের চাকা অদৃশ্য নিয়তির হাতেই ঘুরছে। অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারকে আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন। জনগণ তাদের পক্ষে রয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন। তাতে অবশ্য অনিশ্চয়তা কাটছে না। আমরা উল্টো পথের যাত্রী হয়ে বসে আছি।
একবার এক ভদ্রলোক তীর্থযাত্রায় বের হয়ে উল্টো পথে হাঁটছিলেন। পথে একজন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে পথিক, এমন গেরুয়া বেশে তুমি কোথায় চলেছ?
পথিক জবাব দিলেন, দেখে বুঝছ না আমি তীর্থে চলেছি?
কিন্তু এদিকে তো কোনো তীর্থ নেই। আমার জানা মতে তুমি যেদিক থেকে এসেছ তীর্থ তো সে দিকেই।
এবার তীর্থযাত্রীর ভুল ভাঙলো। তিনি বললেন, ভাই দয়া করে আমাকে ঘুরিয়ে দাও।
আমরাও বর্তমানে ওই তীর্থযাত্রীর মত উল্টো পথে চলেছি। কিন্তু হায়, আমাদের ঘুরিয়ে দেবে কে?
লেখক : কলামিষ্ট