সুষম শুল্কায়নের স্বার্থে ‘আইটি পণ্য’ শনাক্ত করতে চাই নবতর দৃষ্টিভঙ্গি

কৃষি ও শিল্প বিপ্লবের পর বিশ্ব এখন এগিয়ে চলছে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের দিকে। এখানে কায়িক শ্রমের সাশ্রয়ে যুক্ত হয়েছে মেধা। খনিজ সম্পদের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে মানবসম্পদ। কম্পিউটার বিপ্লব আর ই-যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে পৃথিবীর অনেক দেশই দারিদ্র্য জয় করে পা রেখেছে উন্নত দেশের তালিকায়। উন্নয়নের এ মহাসড়কে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। বেকার জনসংখ্যার তুলনায় তাদের চাকরির বাজার একেবারেই ছোট হলেও কম্পিউটার আর ই-যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই তরুণরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই আয় করতে শুরু করেছে বৈদেশিক মুদ্রা, পাচ্ছে বিশ্ব নাগরিকের মর্যাদা। তথ্যপ্রযুক্তির অন্যতম বাহন হচ্ছে কম্পিউটার আর এর নানা অনুষঙ্গ। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে কম্পিউটার আমদানিতে সরকারের শুল্কমুক্ত সুবিধাপ্রদান মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। একই কারণে মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তি বিপ্লবের মৌলিক বাহন কম্পিউটার। সমাজে সুষম উন্নয়নের স্বার্থে এই কাতারে সংযুক্ত করতে হবে প্রান্তিক মানুষকে। একইভাবে সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার না হলে ব্যাহত হবে আমাদের এই এগিয়ে চলা। সমাজে যেন ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি না হয় সেজন্য সচেষ্ট হতে হবে এখনই। আমরা আশাবাদী বর্তমান সরকার ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের পথে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রত্যয় বাস্তবায়নে এর বিকল্পও নেই। ইতোমধ্যেই আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে সচেতনতা গড়ার মূল পাঠ সফলতার সাথে শেষ করেছি। এখন প্রয়োজন এই খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার। এই খাতের প্রতিটি স্তরে বিশেষ দৃষ্টি দিলে আগামীতে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পকেও ছাড়িয়ে যাবে। এখন আর বলতে দ্বিধা নেই, আনুপাতিক হারে দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পোশাক শিল্প থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশমানতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। এই খাতে কঠোর কায়িক শ্রম না দিয়েও কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইস আর ইন্টারনেট ব্যবহার করে বছরে আয় হচ্ছে মিলিয়ন ডলার। ঘরে বসে নারীরাও এতে অংশগ্রহণ করে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। সাথে সুগম হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের পথ। এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে এখন আমাদের সরকারি কার্যক্রমকে পরিপূর্ণভাবে ডিজিটালাইজড করা দরকার। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে চিকিত্সা, কৃষি, ভূমি ও সেবা ব্যবস্থাপনাকে পরিপূর্ণভাবে ডিজিটাল ডিভাইসের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। সচিবালয় থেকে শুরু করে সংগঠন পর্যায়ে ই-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ যেন এই ডিজিটালাইজেশন সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করতে পারে সে জন্য এ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, বিকাশমান ই-কমার্সের ওপর ৯ শতাংশ মূসক এবং সর্বোপরি আইটি পণ্য আমদানী ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং আইটি সেবা খাত বিকাশের পথে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা আমাদের অমিত সম্ভবনার এই খাতকে পূর্ণদ্যোমে বিকশিত হবার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তি খাতকে সরকার গুরুত্ব দিলেও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিন্যাসে বিদ্যমান ‘এইচএস কোড শ্রেণীবিন্যাসের’ বাড়তি শুল্ক চাপ, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম বাণিজ্য কর, সরবরাহ পর্যায়ে উেস কর এবং প্রযুক্তি সেবার ওপর দ্বৈত হারে করারোপ সরাকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার পরও এই খাতে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাজার সম্প্রসারণের গতি দিন দিন শ্লথ হচ্ছে। ফলে যে গতিতে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো সেখান থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাত সেই গতিতে এগিয়ে যেতে পারছে না। তাছাড়া দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়ে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রতিটি খাতকে ডিজিটালাইজশনের আওতায় আনতে হলে ডিজিটাল ডিভাইসগুলোকে সহজলভ্য না করলে কোনো পরিকল্পনাই শেষতক আলোর মুখ দেখবে না। কম্পিউটারকে একমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর যন্ত্র বলে আমাদের একটা বদ্ধমূল ভুল ধারণা আছে। যথাযথ তথ্য এবং তথ্যের প্রবাহ না থাকায় আমরা জানি না—ব্যবহারের ব্যাপ্তিতে এবং প্রযুক্তগত প্রয়োজনীয়তায় কম্পিউটারের সাথে অঙ্গাঙ্গী যুক্ত হয়ে আরও অনেক যন্ত্র এবং যন্ত্রানুষঙ্গ তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের কাতারে চলে এসছে। বিশেষভাবে, এই ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কিং ডিভাইসের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাই সুষম শুল্কায়নের স্বার্থে ‘আইটি পণ্য’ শনাক্ত করতে চাই নবতর দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদার বিবেচনা। একইসাথে সফটওয়্যার খাতেও চাই উত্সাহব্যঞ্জক পৃষ্ঠপোষকতা। নগদ সাহায্য চাই না, শুল্ক ও করের বোঝা আরোপ না করলেই এই শিল্প নিজস্ব শক্তিতেই স্বতঃস্ফূর্ততায় শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছে যাবে। এখন তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিশ্বমানের আইটি কোম্পানিগুলো যেন যৌথ উদ্যোগ আকৃষ্ট হয় সেদিকটিতে নজর রাখা দরকার। চাহিদা নিরূপণ আমদানি ও সরবরাহ ব্যস্থাপনাকে সহজতর করে নিয়ত পরিবর্তনশীল বাজারের সাথে এই খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাল মিলিয়ে চলতে পারে সে জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া দরকার। ভুলে গেলে চলবে না, মাইক্রোসফট, গুগল, ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই আজ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশেও যেন এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশ থেকেও তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উত্পাদন এবং পরিসেবা বিপণনের পথে; এমন কি রপ্তানিতেও যুক্ত হবে নতুন পালক। লেখক :প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড