সকলের উচিত সীমার মধ্যে থাকা

রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের ভূমিকাই প্রধান। তাহারাই আইন-কানুন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করিয়া থাকেন। আর সেই অনুযায়ী প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ কাজ করিয়া থাকেন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহে প্রায়শই দেখা যায়, রাজনীতিবিদগণ বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ নিজেদের প্রণীত আইন-কানুনের বিধিবিধান নিজেরাই লংঘন করিয়া থাকেন। তাহারা প্রশাসনকে নিয়ম-কানুনের বাহিরে গিয়া তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী কার্য করিতে বাধ্য করিতে চাহেন। সত্য বটে, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন কিংবা রাষ্ট্রের অন্য সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে রাজনীতিকদের প্রশাসনের উপর নির্ভর করিতে হয়। আর সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিগণ সরকার বা রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত থাকেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের নিমিত্ত। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এই রাজনীতিবিদদের সহিত কার্য বাস্তবায়নের ব্যাপারে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থার অভাব, বোঝাপড়ার অভাব বা সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হইলে সন্দেহাতীতভাবে দেশের যাবতীয় উন্নয়ন বা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম মুখ থুবড়াইয়া পড়িতে বাধ্য। দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্যি যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহে ক্ষমতাসীনেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কথাটি উপলব্ধি করিতে চাহেন না। ফলে এক ধরনের অর্বাচীনতা, অহংবোধ, হীনমন্যতা, এমনকি বালখিল্যতাপূর্ণ মানসিকতা ও আচরণ তাহাদের অনেকের মাঝে ফুটিয়া উঠিতে দেখা যায়। ইহাতে রাজনীতি বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা পদাধিকারিগণ তাহাদের অধীনস্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে এমনসব কাজ করিতে বাধ্য করিতে চাহেন যাহা কিনা আইন-কানুনের নির্ধারিত সীমা লংঘনের পর্যায়েই পড়ে। জীবনের যে কোন ক্ষেত্রে সীমা লংঘনের পরিণতি যে ভাল হয় না উহা উন্নয়নগামী দেশসমূহের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাইয়া থাকেন। নিয়ম-কানুন না মানিবার এক ধরনের আত্মবিনাশী মনোবৃত্তি যদি রাষ্ট্র পরিচালকদের গ্রাস করে তাহা হইলে জনগণ যাইবে কোথায়? ভরসা পাইবে কোথায়? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের পর ক্ষমতাসীনদের মাঝে এবং অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও সাংসদদের মাঝে এমন মনোভাব দৃষ্টিগোচর হয় যে, তাহারা যেন দেশটির ইজারা লাভ করিয়াছেন। কিন্তু তাহারা ভুলিয়া যান যে, এই ইজারা এমনই এক বন্দোবস্ত যাহা কিনা যে কোন সময়ই বাতিল হইয়া যাইতে পারে। অতীতে কোন না কোন উপায়ে এই জাতীয় ইজারা বাতিলের ঘটনা দেশে-বিদেশে বহুবারই ঘটিয়াছে। নিয়ম-শৃংখলা এবং সর্বোপরি নিজের কাজ ও ক্ষমতার সীমার মধ্যে না থাকিয়া যে বা যাহারা উহার অপব্যবহার করিয়াছেন প্রকৃতির আপন নিয়মেই তাহাদের মূল্য দিতে হইয়াছে। সুতরাং দেশকে ব্যক্তিগত বা দলগত সম্পদ মনে করিয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের কিংবা সীমা লংঘনের মাধ্যমে যাহারা অধঃস্তনদেরকে হুকুম-হাকামের দাস বানাইতে অভিলাষী তাহাদের উদ্দেশ্যে আমরা শুধু এই কথাই বলিতে চাহি যে, দয়া করিয়া চক্ষু মুদিয়া থাকিবেন না, চক্ষু উম্মিলিত করিয়া একবার চারিদিকে তাকাইয়া দেখেন তাহা হইলেই বুঝিতে পারিবেন যে, কাহারও উপর ছড়ি ঘোরানো, খবরদারি করা বা নিয়ম-কানুন বহির্ভূত কাজ করিতে বাধ্য করানোর পরিনাম কালে কালে দেশে-বিদেশে কেমন ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের শাসকদলের সহিত সংশ্লিষ্ট সকলেই নিয়ম-কানুনের থোড়াই পরোয়া করেন। এই সকল দেশের রাজনৈতিক সরকার এবং সরকারি দলের লোকেরা মনে করে দেশ তাহাদের খেয়াল-খুশি মতো চলিবে। কিন্তু ইহাতে যে দুরবস্থা সৃষ্টি হয় উহার কাফফারা গনিতে হয় দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। অর্থাত্ একের অন্যায়ের বোঝা বহন করিতে হয় সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে। তাহারা নিজেরা যে আইন বা নিয়ম-কানুন তৈরি করেন উহা আবার ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে ভাঙিতে এতটুকুও বাধে না তাহাদের। মোদ্দাকথা, নিয়ম না মানিলে বা সীমার মধ্যে না থাকিলে অপরিণামদর্শীদের বরাতে কী বিপর্যয় ঘটে উহা জানিয়া বুঝিয়া লইবার কাজে যত্নবান হওয়া অবশ্য কর্তব্য। নচেত্ বিপদ আসিলে তরী কিন্তু তীরেই ডুবিয়া যাওয়া অসম্ভব নহে।