আর কত অপহরণ গুম খুন!
প্রকাশ : ০৭ মে ২০১৪, ২১:৩২
এক আতংক, অভূতপূর্ব উত্কণ্ঠা নিয়ে প্রতিদিন শুরু হচ্ছে যাত্রা। ঘরে ফিরবো তো? বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখন নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া অপহূত হওয়ার ঘটনার উত্স পরিব্যাপ্ত দেশময়। নারায়ণগঞ্জে অপহূত কাউন্সিলর, আইনজীবীসহ সাতজনের লাশ নদীতে ভেসে উঠেছে। চারদিন আগে অপহূত হওয়া সাত হতভাগ্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অথচ তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। যে কাউন্সিলরের জনগণের সেবায় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর কথা তিনি হারিয়ে গেলেন। অপহরণ হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের কাছে সোপর্দ করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত প্রভাব, সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ সব রাঘব বোয়ালেরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন দলমত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এদের শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ব্যক্তি-বিদ্বেষ সমাজে তীব্র হয়ে উঠেছে। অপহরণ, গুম, খুনের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। অথচ কী নির্বিকার আমরা। সমন্বিত প্রতিরোধ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। দৈনিক ইত্তেফাক ৩০ এপ্রিল ২০১৪-তে এক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে ১২ বছরে ১০ হাজার ১৬১ জন অপহরণ ও নিখোঁজ হওয়ার খবর। এর মধ্যে ৩শ’ জনের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ২,৫০০ জন। ৭,০০০ নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে ৩,০০০ অপহরণকারী ধরা পড়েছে। অপহরণ হওয়ার পর অপহূত ব্যক্তির স্বজনেরা থানায় ডায়রি করে।
জনসংখ্যা অনুপাতে সেবাদানকারী পুলিশের সংখ্যা কম। অপহরণকারীদের জাল ছিন্ন করে অপহূত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অপহরণকারী হাত বদল করে। অপহূত ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে কখনো মুক্তিপণ আদায় করা হয়। কখনো হত্যা করে লাশ নদীতে কিংবা অন্যত্র গোপন করে রাখা হয়। এই কি সভ্যতা? একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একটি উন্নয়নশীল দেশে কোন নাগরিকই আজ নিরাপদ নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার কল্যাণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের শনাক্ত ও তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করা সম্ভব হলেও অপহরণ, গুম, খুন কমছে না। বরং বাড়ছে। বাড়ছে জনগণের উদ্বেগ, উত্কণ্ঠাও।
সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত নারায়ণগঞ্জ ব্যবসা, বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। সেই নারায়ণগঞ্জ এখন অশান্ত। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় নিমজ্জিত নারায়ণগঞ্জবাসী স্তব্ধ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলইপুর গ্রাম থেকে অপহরণ করা হয়েছে এক ব্যবসায়ীকে। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা এই ব্যবসায়ী দেশে ফিরে মাটি ও মাছের ব্যবসা করছিলেন। সাত ব্যক্তিকে অপহরণের পর নারায়ণগঞ্জে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তত্পরতা চালাচ্ছে। দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান চলছে। জড়িতদের চিহ্নিত করা গেলেও ধরা সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জে অবরোধ, ভাংচুর আগুন দেয়া চলছে। যাদের অপহরণ করা হয়েছে সবাই সরকার দলীয় সমর্থক। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে এদের অপহরণ করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সদস্যদের উপর কেউ কেউ দোষারোপ করেছেন। সাধারণত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কোন মামলা নিতে চায় না। সাতটি লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠেছে। একদিন ছয়টি, পরের দিন একটি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও তদন্ত কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
নারায়ণগঞ্জসহ সর্বত্র প্রশাসনে সরকার দলীয় সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ থাকে। শ্রমিক দিবসের ছুটি কাটানো আনন্দও অনেক ক্ষেত্রে মাটি হয়ে গেছে অপহরণ সংবাদে। নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করেন তাদের সাফল্যের। কিন্তু তাদের ব্যর্থতা কম নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের তদারকি ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের সামর্থ্যের ঘাটতি কম দায়ী নয় সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এই ব্যর্থতায়।
কিছুদিন আগেও সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তির যে ভূমিকা ছিল তা এখন অপসৃয়মান। চোখের সামনে অনাচার ঘটছে। সাধারণ মানুষ নির্বিকার। কেউ কারো বিপদে আগের মত এগিয়ে আসে না। শাশ্বত মূল্যবোধ সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে এও বলা যায় না। প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব সমস্যায় জর্জরিত। তার বাড়তি সময় কোথায়? মানুষের সমস্যা, সংকট যতই ঘনীভূত হোক না কেন এই মানুষই মানুষের বন্ধু। শত্রুও সে। কল্যাণের জয় হয়, মঙ্গল জাগ্রত থাকে। বিবেক ও মনুষত্ব মানুষের সহযাত্রী। কোথায় যেন একে একে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ। যোগ্য নেতৃত্বের অভাব আর ঐক্যবদ্ধ সামাজিক শক্তির জাগরণ না ঘটলে সমাজের অসঙ্গতি, অঘটন ও নৃশংসতা থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না।
অভাব একটি ঐক্য রচনার। একজন যোগ্য নেতার অভাব আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি। সম্পদ, প্রতিপত্তি ও প্রভাব আকাঙ্ক্ষী মানুষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ, প্রতিবাদী মানুষ। কোথায় হারিয়ে গেল অহংকার ও গৌরবের সেই মুখগুলো। এরাই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সামিল হয়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল লাল সবুজ পতাকা। পৃথিবীতে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আর পরিচিত হয়ে ওঠার স্রষ্টা তরুণদের কথা আমরা এখনও ভুলিনি। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও হিমালয় চূড়ার জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন ব্যক্তিকে অপহরণের পাঁচদিন পর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের ২৭ ঘণ্টা পর র্যাব-৪ তাকে উদ্ধার করে। মানবাধিকার নেত্রী রেজওয়ানা হাসানের স্বামী আবুবকর সিদ্দিক ও সাইফুল ইসলাম ভাগ্যবান ব্যক্তি। তারা অপহূত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে ফিরে আসতে পেরেছেন।
চলমান গুম অপহরণ খুন নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতি। অজ্ঞাত অন্তর্ধানের কূল কিনারা মিলছে না। এইসব অপরাধের সাথে জড়িতদের যথাযথ বিচার করা যাচ্ছে না। দুই বৃহত্ রাজনৈতিক জোট একে অপরকে দুষছে। সংবিধানের ৩২ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে ‘No person shall be deprived of life of person liberty, save accordance law’। আইন সুরক্ষা দিয়ে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার বিধান করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারি সংস্থা জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। কিন্তু সীমিত জনবল নিয়ে কাজ চলছে। গুম অপহরণ, খুন দিন দিন উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা আমাদের নিত্যসঙ্গী। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলছে। অপহরণ, গুম ও খুনের হোতাদের আইনের কাছে সোপর্দ করা জরুরি। কেউ অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। নিরীহ মানুষকে বিপদে ফেলে অপহরণ, গুম ও খুন করে যারা সমাজে অশান্ত ও স্বাভাবিক বাঁচার পথ রুদ্ধ করতে চায় তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অপরাধীর হাত যত লম্বা হোক না কেন তা রাষ্ট্র ও সংগঠনের শক্তি থেকে বড়ো ও শক্তিশালী নয়। রাজনৈতিক মত-মতান্তরের ঊর্ধ্বে উঠে আজ জননিরাপত্তার বিষয়ে সবাইকে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে যারা প্রতিনিয়ত যাত্রা শুরু করছেন তাদের অনেকেই আবার ঘরে ফিরে আসবেন এ নিশ্চয়তা আমাদের দিতে হবে। কর্মক্ষেত্র ও ঘর উভয় স্থানকে নিরাপদ করে তুলতে হবে। সামষ্টিক উদ্যোগ গুম, খুন, অপহরণ প্রতিরোধে সহায়ক হবে—এই-ই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রাবন্ধিক
saifuzzaman.bnm@gmail.com