আনন্দময় হউক শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ

কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে দেশে প্রথমবারের ন্যায় তিন দিন ব্যাপী শিক্ষক সম্মেলন শেষ হইয়াছে গত বুধবার। ইহাতে সারাদেশের একশত জন শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘একুশ শতকের শিক্ষায় আলোকিত শিক্ষক’। এই আলোকিত শিক্ষকরা আসলে তথ্য-প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও দক্ষ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষকদের একুশ শতকের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের মাধ্যমে পাঠদানে উত্সাহ প্রদান, শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, পারস্পরিক মত বিনিমিয়ের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং জাতি গঠনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আশার কথা হইল, ত্রিশ হাজারেও বেশি শিক্ষক এই ধরনের প্রশিক্ষণ পাইয়াছেন এবং তাহারা নিজেরাই শিক্ষার্থীদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরি করিয়া শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করিতেছেন। এই সরকারের গত মেয়াদে গৃহীত এই ধরনের উদ্যোগ ও কর্মসূচীর কার্যকারিতা এখন সম্যক উপলব্ধি করা যাইতেছে। আধুনিক যুগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। আজকাল শুধু গতানুগতিক লেকচার বা বক্তৃতামূলক নয়, বরং উপকরণের সাহায্যেও শ্রেণীকক্ষে হাতে কলমে পাঠদানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হইয়া থাকে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তাহারই একটি উপায় বা অবলম্বন। টেক্সট, গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন, ক্লাস ওয়েবসাইট, অডিও-ভিডিও ইত্যাদির সমন্বয়ের নামই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। ইহা জ্ঞান বিতরণ ও আহরণ উভয়কে সহজ ও সাবলীল করে তোলে। শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ সৃষ্টিতে চাই মনোনিবেশ, গ্রহণশীলতা, অভিযোজন, পরিপৃক্তকরণ ও রূপান্তর। এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্য বা গুণ মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হইল, আমাদের সেই মানের শিক্ষক পর্যাপ্ত হারে নাই। অনেক শিক্ষক আছেন যাহাদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহাও বিদ্যমান। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্পর্কে তাহাদের সচেতন করিয়া তোলা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাহাদের দিতে হইবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক উপকরণ। নূতন নূতন শিক্ষক নিয়োগদানের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষতার বিষয়টি মাথায় রাখিতে হইবে। শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতির সম্প্রসারণ সার্বিকভাবে সারাদেশে ডিজিটাইলাইজেশনকেও ত্বরান্বিত করিবে নিঃসন্দেহে। তাই আমরা এরূপ কর্মসূচীর সাফল্য কামনা করি। তবে শুধু তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াইলেই চলিবে না, ক্লাসরুমে শিক্ষকদের আচরণ হইতে হইবে মানবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। সম্প্রতিকালে এনজিওদের উদ্যোগ, প্রচারণা ও সংবাদপত্রে লেখালেখি প্রভৃতি কারণে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রহারের প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পাইয়াছে। কিন্তু নূতন আতঙ্ক হইল শিক্ষার্থীদের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি। নির্ধারিত সিলেবাসের বাহিরে অতিরিক্ত বই বাণিজ্যিকভাবে চাপাইয়া দেওয়া এবং প্রাইভেট ও কোচিংয়ের জন্য দৌড়াদৌড়ির কারণে তাহারা দম ফেলিবার ফুরসত পাইতেছে না। ইহাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুন্দর শৈশব হারাইয়া যাইতেছে। মানসিক চাপে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতেছে। স্কুল হইতে ঝরিয়া পড়িবার পশ্চাতে নিরানন্দ শ্রেণী পরিবেশ একটি বড় কারণ। এই বিষয়টি এখন গুরুত্ব সহকারে ভাবিয়া দেখা দরকার এবং এজন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে যাহাতে হোমওয়ার্কের বাড়াবাড়ি বন্ধ হয়। প্রাইভেট, টিউশনি ও কোচিংয়ের চাপ কম থাকে। ক্লাসের পড়া যেন ক্লাসেই সম্পন্ন হয়। এই ধরনের উদ্যোগ অনেক স্কুল ইতোমধ্যে গ্রহণ করিয়া সাফল্যের পরিচয় দিতেছে। এভাবে ক্লাসে শিক্ষা ও পাঠদানকে আরও আকষর্ণীয় ও আনন্দময় করিয়া তুলিতে হইবে। তৈরি করিতে হইবে লেখাপড়ার সুন্দর ও প্রাণবন্ত পরিবেশ।