নিশি প্রহরী

রাতের প্রাণী জগত্টা কিন্তু মোটেই নীরব নয়। নিশাচর প্রাণী হিসাবে সুখ্যাতি আছে কিছু প্রাণী ও পোকা-মাকড়ের। নিশাচর প্রাণী, সারা রাত জেগে চরাচরে প্রাণীজগতের অস্তিত্ব জানান দেয়। গভীর আঁধারেও রাতের বুকে বাদুরেরা উড়ে বেড়ায়, জোনাকি আলো ছড়ায়, শিয়াল আর পেঁচা শিকার ধরে, র্যাকুন খুঁজে ফেরে খাবার। এসব প্রাণীদের প্রত্যেকেরই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা ওদেরকে রাতের আঁধারেও কাজ করতে সাহায্য করে। তাদের নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম জোনাকি পোকা :এই পোকার নাম কমবেশি আমাদের সবারই জানা। বিশেষ করে, গ্রামে যারা থেকেছেন তারা তো জানেনই। পেটের মধ্যে যেন চার্জ লাইট জ্বালিয়ে তারা দলবেঁধে নেচে বেড়ায় ঝোপঝাড়ে, খাবার খোঁজে। অন্ধকার ঝোপের চারপাশে জোনাকি পোকাদের এই ওড়াওড়ি সত্যিই এক অভাবনীয় দৃশ্য। জোনাকি পোকাকে ইংরেজিতে বলে ‘ফায়ার ফ্লাই’। মজার ব্যাপার হলো দিনের বেলা এদের টিকিটিও দেখা যায় না। কিন্তু যেই সন্ধ্যা নামে অমনি ওরা দলবেঁধে বের হয় খাবারের খোঁজে। ফুলের মধু খায় আর নেচে বেড়ায়, যেন এক উত্সব চলছে। জোনাকির জীবনকাল এক থেকে তিন সপ্তাহ। আমাদের দেশে যেসব জোনাকি দেখা যায় তাদের শরীর থেকে কেবল সবুজ আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে কিন্তু পৃথিবীতে এমনও জোনাকি আছে যারা সবুজ ও লাল দুটো রঙের বিচ্ছুরণই ঘটাতে পারে। আলোর এই ব্যাপারটি নিয়ে নিশ্চয়ই তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। আসলে জোনাকিদের শরীরে লুসিফারিন নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় যেটা অক্সিজেনের সাথে মিশে তৈরি করে লাল-সবুজ আলো। একটা জোনাকি আরেক জনের সাথে কথাবার্তা বলে ওদের দেহের আলোকে নানাভাবে ছড়ানোর মাধ্যমে। পেঁচা :পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে বেশি দৃষ্টি শক্তির অধিকারী হলো পেঁচা। শীতের আঁধার রাতে টু-হুইট-টু-হুউ শব্দ শুনে অনেকেই বুঝতে পারে পেঁচা ডাকছে। কিন্তু মজার ব্যাপারটি হলো এমন ডাক কিন্তু দুটো পেঁচা মিলে ডাকে। সারা পৃথিবী জুড়ে ১৭০ ধরনের বিভিন্ন প্রজাতির পেঁচা দেখা যায় যাদের অধিকাংশই রাতের বেলা বের হয় শিকারের জন্য। আগে আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর হুতোম পেঁচা দেখা যেত। এখনও খুঁজলে দেখা যাবে হয়তো। পেঁচাদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ওদের বড় বড় গোল দুটো চোখ। একদম যেন গাড়ির সাদা হেড লাইট। চোখদুটো পেঁচার এতই বড় যে অক্ষিগোলকের মধ্যেও সেগুলো ঢোকে না। মাথা ঘুরিয়ে এরা প্রায় পুরোপুরি পেছনের দিকে তাকাতে পারে। এ কারণেই এক জায়গায় চুপটি করে বসেই ওরা চারদিকে নজর রাখতে পারে। দিনের আলো এই বড় বড় চোখের পেঁচা সইতে পারে না, এ কারণই বেচারা পেঁচা রাতের পাখি খেতাব পেয়ে গেল। চাকতির মতো ওদের মুখমণ্ডলের সুবিধা হলো এর ফলে খুব সূক্ষ্ম শব্দের প্রতিধ্বনিও হয় এদের কানে। পেঁচার শ্রবণ শক্তি কিন্তু দুর্দান্ত। অন্ধকারে খসখস নড়াচড়ার শব্দ শুনেই সে বুঝে ফেলতে পারে শিকারের অবস্থান। পেঁচা এক মারাত্মক শিকারি পাখি। বেশির ভাগ পেঁচারই লম্বা ও ধারালো নখর আছে। পাখা দুটো বেশি না দুলিয়েই এরা উড়তে পারে, এবং সে কারণেই শব্দ না করে খোলা বাতাসে পাক খেতে পারে অনায়াসে। একবার যখন তার শিকারকে খুঁজে পায় অমনি সে বাঁকানো নখরের থাবা নিয়ে নেমে আসে শিকার ধরতে। ওদের খাবারে তেমন কোনো বাছবিচার নেই। ক্ষুদে ইঁদুর, শুঁয়োপোকা, ঢোঁড়া সাপ, ব্যাঙ—সবই আছে তাদের খাবারের তালিকায়। বাদুড় :পা দিয়ে গাছের ডালে আটকে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকে বাদুড়। গাঢ় আঁধারে ইকোলোকেশন ব্যবহার করে এরা যে যেকোন জিনিসের অস্তিত্ব টের পায়। লক্ষ্য বস্তুর দিকে তীক্ষ শব্দ ছুড়ে দিয়ে ওরা সেটার অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে। তাই অন্ধকারে চলাফেরা করতে মোটেও অসুবিধা হয় না। দিনের আলো বাদুড়ও সহ্য করতে পারে না। তাই এ সময়টা ওরা পুরোনো ভাঙা বাড়িতে, বনের ভেতর গাছের ডালে ঝুলে থেকে বিশ্রাম নেয়। রাত হলেও ওরা চলে যায় নাইট ডিউটিতে, মানে খাবার খুঁজতে। এদের খাবার তালিকায় আছে বিভিন্ন ফলমূল যেমন—আম, লিচু, কলা ইত্যাদি। এসব নিরীহ বাদুড় ছাড়াও আরও আছে রক্তচোষা বাদুড় বা ভ্যাম্পায়ার বাদুড়। এই ভ্যাম্পায়ার বাদুড়দের পেট ভরাতে চাই তাজা রক্ত। এরা শিকারের চামড়ায় নিজের তীক্ষ ধারালো দাঁত দিয়ে চিড়ে রক্তনালীতে ফুটো করে ফেলে। তারপর শক্ত জিভ দিয়ে রক্ত টেনে নিয়ে পেট ভরায়। খাবারের খোঁজে এরা মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে বেড়াতে পারে। সাধারণ ভ্যাম্পায়াররা গবাদি পশু কিংবা ঘোড়াকে আক্রমণ করে কিন্তু কিছু ভ্যাম্পায়ার আছে যারা পাখিদেরও আক্রমণ করে। অনেক সময় আবার রক্ত খেয়ে এমন ঢাপ্পুস লেগে যায় যে তখন উড়তেও কষ্ট হয়। তবে আমাদের দেশের বাদুড়গুলো রাতে জাগলেও ভ্যাম্পায়ারদের মতো ভয়ঙ্কর নয়। ভ্যাম্পায়ার বাদুড়দের কেবল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকাতেই দেখা যায়। সেখানে এদেরকে ক্ষতিকারক প্রাণী হিসেবেই দেখা হয়, কারণ ভ্যাম্পায়ার বাদুড়রা র্যাবিস বা হাইপোকন্ড্রিয়া নামের মরণব্যাধি ছড়ায়।