নাইজেরিয়ায় বর্বরতা
প্রকাশ : ১০ মে ২০১৪, ২০:৫৭
এখনও এই পৃথিবীর নানা প্রান্তে এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হইয়া থাকে যাহাতে যে কাহারই মনে হইতে পারে, বর্বরতার কাল বুঝিবা ফিরিয়া আসিল! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের দুর্বল শ্রেণি; বিশেষত নারীগণ নিষ্ঠুরতার শিকার হইয়া থাকেন। নারী হইয়া জন্ম নেওয়াই যেন তাহাদের অন্যায়! তাহাদের বোঝানোর চেষ্টা চলে যে, ইহ সংসারে তাহাদের আগমন সন্তান পালন ও পুরুষশাসিত সমাজের দাসবৃত্তি করিবার জন্য। মানব সভ্যতার চরম উত্কর্ষের এইদিনে আসিয়াও যদি এহেন পরিস্থিতি পরিদৃষ্ট হয় তাহা হইলে বিচলিতবোধ না করিয়া পারা যায় না। অথচ পশ্চিম আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ নাইজেরিয়ায় সম্প্রতি এমনই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে।
গত ১৪ এপ্রিল রাতে নাইজেরিয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বোর্নো রাজ্যের চিবক শহরের একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করিবার অপরাধে ২৩০ জন ছাত্রীকে তুলিয়া নিয়া যায় জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম। অপহরণের কয়েকদিন পর সংগঠনটির নেতা বুবকর শেকাউ এক ভিডিও বার্তায় বলিয়াছেন, তাহারা ঐ মেয়েদের দাসী হিসাবে বিক্রয় করিয়া দিবে। তাহারা ইহাও বলিয়াছে যে, অপহূত ঐ স্কুল ছাত্রীদের জোর করিয়া বিবাহ দেওয়া হইবে। তাহারা যে বয়সে পা রাখিয়াছে তাহা বিবাহের এবং সন্তান লালনপালন করিবার। অপহরণের এই ঘটনার পর পরই বেপরোয়া এই সংগঠনটি পুনর্বার তাহাদের শক্তির জানান দিবার জন্য একটি গ্রামও জ্বালাইয়া দেয়। সর্বশেষ গত রবিবার আরও আট জন কিশোরীকে একইভাবে তুলিয়া লইয়া যাইবার ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহাও বোকো হারামের কাজ বলিয়া সংগঠনের পক্ষ হইতে স্বীকার করা হইয়াছে। অবশ্য নিরীহ মানুষ হত্যা এবং বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা বোকো হারামের এটিই প্রথম নহে। মোটকথা, যেকোন প্রকার নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে ইহাদের অবস্থান। কেহ যদি তাহাদের এই মতের বিরুদ্ধাচরণ করে বা কাহারো কর্মকাণ্ডের সহিত সংগঠনটির নীতিসমূহের অমিল দেখিতে পাওয়া তবে ইহারা হুমকি-হামলার পন্থা বাছিয়া লয়।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশসমূহ নাইজেরিয়ার অপহূত ছাত্রীদের উদ্ধার কাজে সহায়তা করিবার জন্য বিশেষ দল পাঠাইয়াছে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত তাহাতে কোনো ফলোদয় ঘটিয়াছে বলিয়া জানা যায় নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন হইতে মুক্তি পাইবার পর অর্ধশতাব্দিরও অধিককাল অতিবাহিত হইয়া গেলেও দেশটিতে শান্তি-স্থিতি আসে নাই। সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হইলেও গোত্রে গোত্রে বিরোধ এবং কূপমণ্ডূকতা নাইজেরিয়ার সমাজকে কেবলই পশ্চাতে টানিয়া চলিয়াছে। সে যাহা হউক, স্পর্শকাতর এই অপহরণ ঘটনায় নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট জনাথন গুডলাক বলিয়াছেন, উদ্ধার কাজে ব্যর্থ হইলে তাহার সরকার ইহার দায়-ভার লইয়া ক্ষমতা ছাড়িয়া দিবে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, অপহূতদের পরিবারগুলির কাছে বিশ্ব সমপ্রদায় কি উত্তর দিবে? কিশোরীগণ আদৌ ফিরিয়া আসিতে পারিবে কি না তাহাও অনিশ্চিত। কয়েকদিনের ব্যবধানে দুই দফায় এহেন অপহরণের মাধ্যমে জঙ্গীবাদীরা ঠিক কি বার্তা দিতে চাহে আধুনিক এই বিশ্বকে তাহাও অস্পষ্ট। এমতাবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব অপহূত কিশোরীদের ফিরাইয়া আনিতে যাহা করিবার প্রয়োজন তাহাই করিতে হইবে সংশ্লিষ্টদের। কোমলমতি মেয়ে শিক্ষার্থীদের শুধু ফিরাইয়া আনিলেই দায়িত্ব শেষ হইয়া গিয়াছে মনে করা যথোচিত হইবে না, উদ্ধার পরবর্তীতে ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাওয়াও নিশ্চিত ও নিরাপদ করিতে হইবে। এই দায়িত্ব মূলত নাইজেরিয়া সরকারের।