আলোকপাত
প্রবীণ জীবন এবং নগ্ন বাস্তবতা
প্রকাশ : ১১ মে ২০১৪, ২১:০৬
আজকাল বৃদ্ধাশ্রমের সাথে বেশ পরিচিত আমরা। এক দশক আগেও অধিকাংশ বাঙ্গালির মাঝে বৃদ্ধাশ্রমের তেমন ধারণা ছিলো না। এখন দেশের অনেক জায়গায়ই বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। আর নরকনামীয় এ বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় হচ্ছে অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতার। সেখানে যেতে তাদের বাধ্য করা হয়। অনেকে আবার জন্মদাতা পিতা-মাতার জন্য অতটুকুও ভদ্রতাও দেখান না। এমন ঘটনা কতটা অমানবিক, কতটা বিবেকবর্জিত এবং আপত্তিকর? এইসব অমানবিক বিষয়গুলোকে আমাদের সামনে আনা উচিত। সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবারের আপরাপর সজনদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। এ নিয়ে আন্দোলন হতে পারে। পরিবারের লোকজন এ আন্দোলনে সামিল হবেন, প্রতিবেশীরা যোগ দেবেন। রাষ্ট্রেরও এ ব্যাপারে দায় আছে। রাষ্ট্র এমন অমানবিক বিষটিকে আইনের আওতায় আনতে পারে। নিয়োজিত ম্যাজিষ্ট্রেটদের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে এমন কু-সন্তান কিংবা কু-পুত্রবধূদের তাত্ক্ষণিক ৬ মাস কিংবা ততোধিক সময়ের জন্য সাজার বিধান করতে পারে। বিষয়গুলো জনসমক্ষে নিয়ে আসা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমাদেরও কর্তব্য আছে। পরিবারের অন্য সদস্য, প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার কর্মস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বেসরকারি যে প্রতিষ্ঠানেই ঐ কুসন্তান কর্মরত রয়েছে তার ঊর্ধ্বতনরা বিষয়টি দ্রুত আমলে এনে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। পশুতুল্য ব্যক্তিটি ব্যবসায়ী কিংবা অন্য শ্রেণিপেশার হলে সামাজিকভাবে তাকে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। মোদ্দাকথা হলো সকলকে সকলেন জায়গা থেকে ওদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ গড়তে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় নিজেরা নিজেদের থেকে ভালো হয়ে গেলে। ভাবনায় আনতে হবে আমরা আমাদের পিতা-মাতার কারণেই পৃথিবীতে আসতে পেরেছি। তাঁরাই আমাদের আলোর মুখ দেখিয়েছেন। তাঁরাই আমাদের আগুন, পানি, রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন, দিন দিন বড় করে তুলেছেন। মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন; যদিও আমরা অনেকে মানুষ না হয়ে অমানুষই হয়েছি। পিতা-মাতার কষ্টের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। চরম অসহায় সময় তাঁরা যখন পার করছেন তখন তাদের পাশে আমরা আর নেই। এমন অমানবিকতার পথটি সকল প্রকার নাগরিকের পরিহার না করা চরম মানবতার পরিপন্থী। এক কথায় বাবা-মার প্রতি এমন আচরণ করা চরম অন্যায়, দেশের এ জাতীয় আইন না থাকলেও তা চরম মানবিক অপরাধ বটে! জানি আমাদের দেশে অনেক বৃদ্ধ মা-বাবার এমন পরিণতির সাথে এখন বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। তাঁরা সন্তান কিংবা পুত্রবধূর নিষ্ঠুর আচরণকে তাদের ললাটের লিখন হিসাবেই দেখেন। এদের কেউ কেউ নিজ সন্তানের অবজ্ঞা, অবহেলাকে সম্বল করে, পুত্রবধূদের রূঢ় আচরণকে অবলম্বন করে সকল অপমান-নির্যাতন সয়ে নিজ গৃহে পড়ে থাকেন। এ ছাড়া তাঁদের সামনে আর কিই বা করার আছে? কিছু করার কোন পথ খোলাও থাকে না। আবার অনেকের নিজ গৃহে সন্তান, নাতি-নাতনি আর পুত্রবধূর সাথে একসাথে থাকার সে ভাগ্যও হয় না।
হাল জামানায় সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অধিকার বিষয়ে সচেতনতা খুবই দরকার। মাতা-পিতা আর সন্তানের সম্পর্কে ঘাটতি হলেই পরিবারের শান্তি আনয়ন মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে একথাও সত্য পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও পিতা-মাতা-সন্তান সম্পর্কে কোথাও কোথ্ও ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করেছে। সে কারণে দেশে এখন দিন দিনই বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা। সে সংখ্যা যে অদূর নিকটে আরও ফুলে-ফেঁপে মস্ত হবে না তাই এখন ভবিতব্য। কিন্তু তা হতে দেয়া ঠিক হবে না। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতেই হবে।
একদিন যে সন্তানের জন্য বাবা-মা ছিলেন স্নেহময়, যে সন্তান একটু আঘাত পেলেই বাবা হয়ে উঠতেন চিন্তিত। যে সন্তানকে নিজে হাত দিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন, কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছেন এবং কখনই নিজের অসুবিধার কথা সন্তানদের বুঝতে দেননি। আজকাল সমাজে এমন কিছু সন্তান দেখা যায়, যারা কি না মা-বাবার এতোসব আদর-যত্নের কথা ভুলে মা-বাবাকে ঠেলে দেয় অজানা গন্তব্যে। বৃদ্ধ ও অসহায় বলে তাদের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। ঘরের মধ্যে সবার থাকার জায়গা হলেও এখানে বৃদ্ধ মা-বাবার জায়গা হয় না। আসলে একজন মা-বাবা তার সন্তানদের জন্য যা করেন, তা তাদের পক্ষে সারা জীবনেও শোধ করা সম্ভব নয়। বুড়ো বয়সে এসে তারা চায় একটু শান্তি, ভালোবাসা ও স্নেহ। এ বয়সে একটু আদর-যত্ন পেলেই তারা খুশি হন। মা-বাবা চান সন্তানরা যেন তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে। আমাদের মনে রাখা উচিত আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের পিতা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যায়, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো পিতা-মাতার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে একটা নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী।
লেখক :সাংবাদিক
ই-মেইল-newsstore13@gmail.com