[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

লোকসভা ভোটের মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

আজ ১২ মে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের শেষ লগ্ন। তারপর আগামী ১৬ মে একযোগে শুরু হবে সব আসনের ভোট গণনা। দু’মাস ধরে চলা ভারতের রাজনৈতিক নির্বাচনী উত্তাপ, বলা যায়, গত রাত থেকে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। সরগরম অলিগলি, ব্যানার, ফেস্টুন আর ছোট ছোট পথসভায় যেন গমগম করছিল পুরো ভারত। আজ অপরাহ্ন পার হতেই সব সুনসান হয়ে যাবে। এই দু’মাসে কত ধরনের কৌশল আর গিমিক ও প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে প্রধান-অপ্রধান সব ধরনের রাজনৈতিক দল। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের কথা বলা যাক। ভারতের সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এই দু’মাসে এন্তার চলেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণার তীব্র লড়াই। সেই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি। সেই তুলনায় ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রচারণা ছিল অনেকটাই সেকেলে ও অনাড়ম্বর। প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীকে এককভাবে ব্র্যান্ডিং করে বিজেপি এত বেশি প্রচারণায় মত্ত ছিল যে কংগ্রেসের কোনো কোনো নেতা অভিযোগ করেছেন, বিজেপি’র প্রচারণার খরচের বড় একটি অংশ আসছে কালো টাকা থেকে। আর সেই প্রচারণায় খরচ নাকি কংগ্রেসের চেয়ে পঁচিশ গুণ বেশি! তবে পঁচিশ গুণ না হোক, কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপি যে কমপক্ষে পাঁচ গুণ অধিক অর্থব্যয় করেছে নির্বাচনী প্রচারণায়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের কোনো সন্দেহ নেই। এবং বিজেপি’র কৌশলই হল নতুন ভোটারদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দলে টানা, আর পুরাতন ভোটারদের নতুন করে ভাবতে শেখানো। এর ভেতরে গিমিক আছে, দ্বিচারিতাও আছে। কলকাতায় গতকালকের একটি বাংলা দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে বিজেপি’র বিশাল বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে, আজকের ভোটের বিজ্ঞাপন—“কিছু এক নতুন করব/ বাংলার বিকাশ দ্রুত করব।” এরপর লেখা : “বিজেপির প্রার্থীদের দেয়া এক একটি ভোট সোজাসুজি আমি পাব এই প্রার্থীদের ভোট দিয়ে, বাংলা ও ভারতের বিকাশের গতি দ্রুত করতে আমার সাথ দিন (অর্থাত্ আমায় সঙ্গ দিন)—নরেন্দ্র মোদী।” বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মোদীর অর্ধপৃষ্ঠা-ছবি। কী আশ্চর্য! এখানে বিজেপি’র প্রার্থী তালিকায় ১৭ জনের মধ্যে বাদশা আলম ও মহম্মদ আলম নামের দু’জন মুসলিম প্রার্থীরও নাম আছে। অন্যান্য বিজ্ঞাপনে বিজেপি’র ভাষা এরকম : আপনার একটি ভোটই সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গড়তে পারে। স্থায়ী এবং সক্ষম সরকার গঠনে আপনি অংশীদার হোন। সুশাসনের জন্য ভোট দিন।” মোদী আবক্ষ ছবির পাশে এই বিজ্ঞাপনে লেখা : “এই বার / মোদী সরকার।” অন্যান্য পত্রিকায় বিজেপি’র প্রার্থীরা জানাচ্ছেন—“কেন বিজেপি-কে ভোট দেবেন? ... কারণ : একমাত্র বিজেপি-ই কেন্দ্রে স্থায়ী ও বলিষ্ঠ সরকার দিতে পারে। বিজেপি সুশাসনের দৃষ্টান্ত রেখেছে গুজরাটে, মধ্যপ্রদেশে, ছত্তিশগড়ে এবং আরো অনেক রাজ্যে। বিজেপি সব সম্প্রদায়ের মানুষকে সমান চোখে দেখে—কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে তোষণ করে না।” বিজেপি সব সম্প্রদায়ের মানুষকে সমান চোখে দেখে—এমন কথার পাশাপাশি দেখা গেছে, বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক সারবত্তাযুক্ত বিজ্ঞাপনও। এই তো দু’দিন আগে একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্র গোষ্ঠীর পশ্চিমবঙ্গের একটি বাংলা কাগজে বিজেপি’র বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এরকম : “পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে আগত শরণার্থীদের সম্মান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়ন—এই আমাদের লক্ষ্য।” তার পরের কথাগুলো এরকম : “নিজ দেশে আপনি বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথচ একশ্রেণীর অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আপনার অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে অত্যাচারিত হয়ে যারা এ রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে) এসেছেন, তারা প্রত্যেকে আমাদের শরণার্থী এবং তাদের নাগরিকত্ব দিতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু যারা অত্যাচারিত হননি, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এ দেশে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে এসেছে তারাই অনুপ্রবেশকারী। অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠাতে আমরা বদ্ধপরিকর। আপনার ভোট তাদেরই দিন, যারা আপনার অধিকার আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে মজবুত করতে পারবেন।” এ ধরনের কথা এর আগে মোদী পশ্চিমবঙ্গের ও আসামের কয়েকটি জনসভাতেও বলেছেন। বিজেপি’র এসব বিজ্ঞাপনের বিপরীতে কংগ্রেসের বিজ্ঞাপনের ভাষা খুব সাধারণ। বেশিরভাগ পত্র-পত্রিকার ভেতরের পাতায় রাহুল গান্ধীর ছবির পাশে লেখা : “ক্ষমতায়নের জন্য ভোট দিন। প্রগতির জন্য ভোট দিন। কংগ্রেসকে ভোট দিন।” ব্যস। এটুকুতেই শেষ। ভারতের অন্যত্র কংগ্রেসের শক্তি জোয়ার ভাটার মতো কমলে বাড়লেও পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস এখন বুড়ো সিংহ। কোনো প্রতাপ নেই। বরং মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস এবার উঠে-পড়ে লেগেছেন প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে যতটা সম্ভব এগিয়ে থাকা যায়। পত্রিকার প্রচারণা তুলনামূলক একটু কম হলেও রাজ্যের অলিতে-গলিতে সব জায়গায় জোড়া ফুল (তৃণমূলের নির্বাচনী প্রতীক) জড়ো হয়ে আছে। পাড়া মাতানো প্রচারণাও তীব্র। সম্প্রতি মোদীর সঙ্গে মমতার চাপান উতোর শুরু হলেও বামপন্থী দল মনে করছে, এর ভেতরে গিমিক রয়েছে। সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের মন জয় করার জন্য মমতার নতুন কৌশল এটি। কিন্তু ভালো প্রস্তাব বা সুযোগ-সুবিধা পেলে বিজেপি’র সঙ্গে জোট গড়তে দ্বিধা করবে না তৃণমূল। এমনটি হলে আগামী দু’বছর পর অনুষ্ঠেয় বিধানসভা নির্বাচনে উপযুক্ত শিক্ষা দেবে রাজ্যের মুসলিম ভোটাররা। এমনটাই মনে করেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবুল বাশার। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নির্বাচনী বিজ্ঞাপন এরকম : “আর নয় দেউলিয়া কংগ্রেস/ চাই না সাম্প্রদায়িক বিজেপি/ বরদাস্ত নয় দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল। আওয়াজ তুলুন গণতন্ত্র বাঁচাতে, উন্নত জীবনের স্বার্থে, নারীর মর্যাদা রক্ষায়। লড়াই জোরদার করতেই লোকসভায় বামপন্থীদের শক্তি বাড়াতে হবে।” তবে জনগণ কাকে ভোট দেবে সেই হিসেব বুঝতে এক দশক আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। নির্বাচনী জরিপকারী একটি দল একটি গ্রামের ভোটারের কাছে জিজ্ঞেস করছেন তারা কোন দলে এবার ভোট দেবে। উত্তরে বেশিরভাগ গ্রামবাসী, ধরা যাক, কলা গাছে ভোট দেয়ার কথা বলছে। এরপর জরিপকারী দলটি গ্রামের সবচেয়ে প্রতাপশালী বা মাতুব্বর শ্রেণির মানুষটির কাছে গিয়ে বলা হয়, এবার তো কলাগাছ জিতবে। মাতুব্বর জানালেন, ‘না, এবার কলাগাছ হারবে, আম গাছ জিতবে। জরিপকারীরা অবাক হয়ে বললেন, কিন্তু গ্রামের সবাই যে কলাগাছে ভোট দেয়ার কথা বলল? মাতুব্বর জানালেন, গতকাল পর্যন্ত কলাগাছ ঠিক ছিল। আজ আমি ঠিক করেছি আম গাছে ভোট দেয়ার কথা। এ তো গেল ভোট দেয়ার প্রভাবের কথা। কিন্তু একটি দেশের মূল হিসেব-নিকেশ নতুন করে পরিবর্তন করে দেয় তার অর্থনীতি। লোকসভা নির্বাচনের শেষের দিকে এসে রাজনৈতিক আক্রমণ প্রতিআক্রমণের তীব্রতা বেড়েছে বটে। এবং সেই আক্রমণ প্রতিআক্রমণের অন্যতম প্রধান বিষয় গত কয়েক বছরে অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। এই রাজনৈতিক চাপান উতোরের আবহে যদিও যুক্তির চেয়ে তর্কই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনের পরই ফিরে আসতে হবে বাস্তব যুক্তির দুনিয়ায়। বিশেষত ক্ষমতাসীন দল বা জোটকে। কারণ ভারতীয় অর্থনীতির জন্য আপাতত সেটাই জরুরি। ভারতীয় বেশিরভাগ গণমাধ্যমে যে চিত্র বার বার প্রকাশ পাচ্ছে, তা হল—যে দল বা জোটের সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে হবে ভারতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের হারের বৃদ্ধি। এবং বলা অসঙ্গত নয়, প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তরটি মেলা তত সহজসাধ্য নয়। কারণ গত দুই বছরে দেশটির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতিবেগ শ্লথ হয়ে এসেছে। নির্বাচনোত্তর নতুন সরকারকে জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করতে হবে এবং তারপরে শুরু হবে সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন। কাজটি ভারতের নতুন সরকারের জন্য খুব সহজ নয়। একই সঙ্গে এটি হবে তাদের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনার সূচনা দৃশ্য। এখন সব নজর আগামী ১৬ মে ভোট গণনার দিকে। লেখক : কথাসাহিত্যিক aranya.ahmed@gmail.com