বিদায়, এল কাপিতানো

ডিয়েগো ম্যারাডোনা এমনিতে ইতালি যেতে চান না। গেলেই ওখানকার কর বিভাগের ‘তস্কর’গুলো তার ঘড়ি, কানের দুল কেড়ে রেখে দেয়! তবে ইউরোপীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, আজ-কালের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে হলেও আরেক দফা ইতালি সফরে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী। না গিয়ে উপায় কী! প্রিয় শিষ্য কার্লোস তেভেজ তাকে নিমন্ত্রণ করেছেন বৃহস্পতিবার তুরিনে অনুষ্ঠিতব্য সেভিয়া-বেনফিকা ইউরোপা লিগের ম্যাচ দেখার জন্য। তো ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা, কষ্ট করে আর দিন পাঁচেক ইতালিতে কাটিয়ে যাবেন নাকি? একটু না হয় পাশের ভেরোনা শহর থেকে বেড়িয়ে গেলেন! না, ওখানে আপনাকে বরণ করার জন্য তেভেজ-মেসি-আগুয়েরোরা কেউ থাকবে না। আপনার প্রিয় কোনো শিষ্য আপনাকে জড়িয়ে ধরার জন্য অপেক্ষা করবে না। তারপরও আপনার যাওয়া উচিত, প্রিয় ম্যারাডোনা। কারণ ওখানে গেলে আরেকবার আপনি বুঝতে পারবেন, কী ভুলটাই জীবনে করেছিলেন। বুঝতে পারবেন, আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তো বটেই, পৃথিবীর অন্যতম শ্রদ্ধেয় ফুটবলারটিকে অবহেলা করেছিলেন আপনি। বুঝতে পারবেন, আপনি উপেক্ষা করেছিলেন এক জীবন্ত কিংবন্তীকে। হ্যাঁ, সেই জীবন্ত কিংবদন্তী, পৃথিবীর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রদ্ধেয় মানুষ হ্যাভিয়ের জানেত্তি। আগামী সপ্তাহে, ১৯ মে ভেরোনোতে শিয়েভোর বিপক্ষে খেলে ফেলবেন ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। চিরকালের মতো জার্সি-বুট তুলে রাখবেন ইন্টার মিলানের লিজেন্ড, সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার এল কাপিতানো; দ্য ক্যাপ্টেন। শুধু রেকর্ড, পরিসংখ্যান আর ইতিহাসে চোখ বুলালেই বোঝা যায় যে, কেন হ্যাভিয়ের জানেত্তিকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে রাখেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। আর্জেন্টিনায় গত বছর দশেক ধরে এক ধরনের উপেক্ষার শিকার হলেও এই জাতীয় দলের হয়েই সর্বোচ্চ ১৪৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড তার। আর ১৯ তারিখ যখন শেষ ম্যাচটা খেলতে নামবেন, জুভেন্টাসের হয়ে সেটা হবে তার ৬১৫তম ম্যাচ! ১৯৯৪ সাল থেকে ইতালির এই ভুবনখ্যাত ক্লাবটির হয়ে খেলছেন। ১৯৯৯ সাল থেকে, মানে প্রায় ১৫ বছর ধরে এই ক্লাবের অধিনায়কত্ব করছেন। ‘এল কাপিতানো’ হতে আর কী চাই! তবে এসব ম্যাড়মেড়ে পরিসংখ্যান আর ইতিহাস দিয়ে তো আর জানেত্তিকে বোঝা যাবে না। সেটা বুঝতে গেলে তাকে মাঠে ও মাঠের বাইরে দেখতে হবে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তী রায়ান গিগস যেমন বলছিলেন, ‘আমি হ্যাভিয়েরের বিপক্ষে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেছি। তাতেই আমার মনে হয়েছে, আমার ক্যারিয়ারে পাওয়া সবচেয়ে শক্ত ডিফেন্ডার সে। তবে আসল ব্যাপার হল, মাঠের বাইরে আপনি এতো ভদ্র ও বিনীত মানুষ খুব একটা খুঁজে পাবেন না। সে একজন সত্যিকারের হিরো।’ এমনিতেই ডিফেন্সে খেলে ‘হিরো’ হওয়াটা খুব কঠিন, তার চেয়েও কঠিন ডিফেন্ডারদের এই ভদ্র ও শ্রদ্ধেয় ভাবমূর্তিটা ধরে রাখা। সবচেয়ে কঠিন বুঝি আর্জেন্টিনা থেকে একজন ‘ভালো ডিফেন্ডার’ হিসেবে বেরিয়ে আসা। অবশ্য প্রথম জীবনে জানেত্তি ঠিক ডিফেন্ডার ছিলেন না। ছিলেন মাঝ মাঠের খেলা তৈরি করা খেলোয়াড়। হয়তো আরো একজন ‘নতুন ম্যারাডোনা’ই হতেন। কিন্তু হঠাত্ই করেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড থেকে একদম সেন্ট্রাল ডিফেন্সে চলে যান জানেত্তি। ফলে পৃথিবী পায় আর্জেন্টিনা থেকে আসার বিরল এক আন্তর্জাতিক মানের ডিফেন্ডার। জীবনের গল্পটা তার বেশিরভাগ লাতিন ফুটবলারের মতো। ইতালিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে জন্মেছিলেন বুয়েনস আয়ারসের দরিদ্র এক পরিবারে। বাবা ইট কারখানার মিস্ত্রী ছিলেন। ফলে সংসারে হাত লাগাতে সেই ছোট বেলাতেই বাড়ি বাড়ি দুধ বিক্রির মতো কাজ করতে হত জানেত্তিকে। তবে স্বপ্নটা ছিল ফুটবল। সেই স্বপ্ন নিয়ে ইন্দিপেন্দেতে ক্লাবে নাম লেখাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা যুগে যুগে এই লোকটিকে চিনতে ভুল করবে বলেই যেন ঠিক করে রেখেছিল! তাই ইন্দিপেন্দেতে ফিরিয়ে দিয়েছিল জানেত্তিকে। তিনি যোগ দিলেন দ্বিতীয় বিভাগ দল তালেরেসে। পরের বছর চলে গেলেন বানফিল্ডে। এই বানফিল্ডে জানেত্তির এক মৌসুমের পারফরম্যান্সের প্রভাব আর্জেন্টিনা ছাড়িয়ে ইউরোপে চলে এলো। জাতীয় দলে ডাক পেলেন এবং মাসিমো মোরাত্তি কিনে নিলেন তাকে ইন্টারন্যাসিওনাল বা ইন্টার মিলানে। সেই গল্পের শুরু। অবশেষে গল্পটা স্বপ্নের মতো করে শেষ হতে চলেছে আগামী সপ্তাহে। জানেত্তির এই গল্পের মাঝে একটাই দুঃখ—আর্জেন্টিনা। যদিও জাতীয় দলের হয়ে রেকর্ডসংখ্যক ম্যাচ খেলেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্যারিয়ারের সেরা সময়টায় ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে হোসে পেকারম্যান ও ম্যারাডোনা দলেই রাখেননি তাকে। এর মধ্যে ২০১০ বিশ্বকাপের আগে আগে অসাধারণ পারফরম করে ইন্টারকে ট্রেবল জেতানোয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তারপরও ম্যারাডোনা তাকে দলে রাখেননি। কেন? ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘ওর কৃতিত্ব তো মেসিকে আটকানো পর্যন্ত। এখানে সেটার দরকার নেই, তাই ওকেও দরকার নেই।’ এই একটা কথাই একজন মানুষকে খেপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু জানেত্তি এই কথা শুনে হেসেছিলেন। শুধু বলেছিলেন, ‘কথা তো সত্যিও হতে পারে। তিনি কিংবদন্তী। তিনি নিশ্চয়ই বুঝেই বলেছেন। আমার এ নিয়ে আফসোস নেই। আমি টিভিতে বসে আর্জেন্টিনার খেলা দেখবো। দলকে সমর্থন দিয়েই পাশে থাকবো।’ বুঝলেন তো, কেন লোকেরা তাদের দেল পিয়েরো, মালদিনিদের কাতারে রাখে!