আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলতে
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৪, ১৯:৫১
জীবনে চলার পথে, যেকোনো সমস্যা মোকাবেলায় কিংবা নিজেকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যেতে আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের প্রতি, নিজের চিন্তাভাবনার প্রতি গভীর আস্থা থেকেই জন্ম নেয় এই বোধ। সন্তানের মধ্যে কীভাবে এই বোধ জন্মানো যায় তা জানাচ্ছেন ফয়জুল আল আমীন
একদিনে কারও মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে ওঠে না। মহত্ এই গুণটি জীবনের শুরু থেকেই একটু একটু করে গড়ে ওঠে। বাচ্চাদের পারিপার্শ্বিক জগতের পরিধি বৃদ্ধির সমান্তরালেই তৈরি হতে থাকে তার আত্মমর্যাদাবোধ। যে কারণে এই সময়টাতে মা-বাবার সাথে নিবিড় সম্পর্কও তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেননা এ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই আপনার শিশু সন্তানটি নিজের অস্তিত্বের মূল্যায়ন করতে শেখে। সুযোগ পায় নিজেকে জানার। এ জানার মধ্যে দিয়ে তৈরি হতে থাকে তার যথাযথ আত্মমর্যাদাবোধ। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চাটি যেন কখনোই নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে করার সুযোগ না পায়। অপরদিকে, কোনো বিষয়ে তাকে অত্যধিক প্রশ্রয়ও দেওয়া যাবে না। কারণ নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে করলে কোনো শিশু যেমন যথাযথ আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হিসেবে নিজেকে গড়তে পারে না, তেমনি অত্যধিক প্রশ্রয়ও তাকে তার নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে জানার পথ রুদ্ধ করে দেবে। এক্ষেত্রে আপনার বাচ্চার মধ্যে থাকা গুণগুলো প্রথমেই চিহ্নিত করে নিতে হবে। ভালোগুণের উত্কর্ষতা সাধনে তাকে উত্সাহিত করুন, আর খারাপ গুণগুলো ত্যাগ করার জন্য তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতে হবে। বাচ্চাকে কখনও অবহেলা করা যাবে না। কারণ অবহেলার কারণে অনেক সময় বাচ্চার ভালো গুণগুলোও চাপা পড়ে যায়। ফলে অন্যদের তুলনায় সে নিজেকে দুর্বল ভাবতে শুরু করে, কাছের লোকদেরকেও এড়িয়ে চলতে শুরু করে। দিন দিন হারাতে থাকে মনোবল। তার আত্মমর্যাদাবোধ তখন তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তাই মা-বাবাকে এ সময়ে অবশ্যই বাচ্চার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাচ্চাদের প্রতি বড়দের ব্যবহার, কঠোর সমালোচনা, অবহেলা শিশুর স্বাভাবিক আত্মমর্যাদাবোধে চিড় ধরায়। তাই সমালোচনা, শাসন আর স্নেহ, প্রশংসার মধ্যে অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সন্তানের শিশুকাল থেকেই তার মনের কাছাকাছি পৌঁছার চেষ্টা করতে হবে। অন্যদের উপস্থিতিতে বাচ্চাকে কখনও বকাঝকা করবেন না। এতে করে তারা মনে কষ্ট পায়, মনে মনে নিজেকে খুবই অসহায় মনে করে। বাচ্চার মনে সৃষ্টি হয় অপ্রত্যাশিত এক ধরনের চাপ। যা মা-বাবার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ায়। আপনার সন্তান যেন পুরোপুরি আপনার প্রতি ভরসা করে, সেই পরিবেশ তাকে তৈরি করে দিতে হবে আপনাকেই। আর এ কাজটি করতে হবে তার শৈশব থেকেই। কারণ শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই তার আত্মমর্যাদাবোধেও বাড়তে থাকে। এ সময় তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার লক্ষ্যেও আপনাকে সচেতন থাকতে হবে। তার প্রাপ্য প্রশংসা থেকে কখনো তাকে বঞ্চিত করবেন না। আপনার প্রশংসায় সে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাবে। আপনার বাচ্চাকে অবশ্যই স্বাবলম্বী হতে শেখাতে হবে। কারণ তার আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়ার গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকে অবশ্যই দায়িত্ব গ্রহণ ও পালনের শিক্ষা দিতে হবে। এতে করে সে কাজ করতে উত্সাহ পাবে। বিশেষ করে নিজের কাজের প্রতি সে যত্নবান হতে শিখবে। তবে মনে রাখতে হবে যে, কাজ করতে গিয়ে তার ভুল হতেই পারে, এক্ষেত্রে তাকে বকাঝকা করা যাবে না। বরং তার ভুলটি তাকে ধরিয়ে দিতে হবে এবং সংশোধনের উপায় বলে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাকে স্বাধীনতা দিতে হবে। স্কুলে যাওয়ার আগে ব্যাগ, বইখাতা গুছানো ও পেন্সিল শার্প করার মতো ছোটখাটো কাজগুলো তাকে দিয়ে করাতে হবে। এতে করে সে নিজের কাজ নিকে করতে শিখবে। কখনো এমনও হতে পারে যে, বাচ্চাটি নিজের সম্পর্কে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করছে। তা নিজেকে ষোলআনা সঠিক ভাবা কিংবা নিজেকে অযোগ্য ভাবার মতো বিষয়ও হতে পারে। এর কোনোটাই তার জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে করে ভবিষ্যতে বাচ্চাটি অহঙ্কারী হতে পারে বা হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে। তাই আপনার উচিত তাকে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া। কখনো বাচ্চার মনে ভুল কোনো ধারণা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেবেন না। পড়াশোনা বা খেলাধুলায় আশানুযায়ী ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়ে আপনার সন্তান যদি আত্মসমালোচনা করে, তো তাকে তিরস্কার করবেন না। বরং তার এ ধরনের মানসিকতার প্রশংসা করুন এবং সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিন। কোনো কারণে সে ব্যর্থ হলেও সাফল্য লাভের জন্য তার আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য তাকে বাহবা দিন। এতে করে নিজের সম্পর্কে তার মনে বিরূপ কোনো ধারণা সৃষ্টি হবে না। মনে রাখবেন, নিজের সম্পর্কে আপনার সন্তান যতটা পজিটিভলি ভাববে, তার আত্মমর্যাদাজ্ঞান ততই প্রখর হবে। বাচ্চাকে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। অবসরে সে যে ধরনের কাজ করতে ভালোবাসে, সেসব বিষয়ে উত্সাহ দিন। তবে বাজে কিছু করলে অবশ্যই সতর্ক করতে হবে। তার যেকোনো বক্তব্য মন দিয়ে শুনতে হবে। কোনো সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে। তার পছন্দের কাজে আপনার সমর্থন থাকলে তার আত্মমর্যাদাবোধ আরও দৃঢ় হবে। এক কথায়, তার সাফল্য যত সামান্যই হোক না কেন—তাকে উত্সাহ দিতে হবে। প্রয়োজনে তার পছন্দের কাজটি সম্পর্কে তাকে ভালো করে জানতে-বুঝতে সাহায্য করুন।