কর্মজীবীদের মুশকিল আছান ‘মাছকাটানী’
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৪, ২২:০৫
সকাল আটটা। কাওরানবাজার রেললাইনের ধার ঘেঁষে বসে মাছ কাটছেন কিছু নারী। সঙ্গে কিছু পুরুষ কর্মীও আছেন। সকালের স্নিগ্ধ রোদ থেকে শুরু করে দুপুরের কাঠ ফাটা প্রখর রোদ চলে যায় ওদের মাথার ওপর দিয়ে। জীবনের অভাব তাদের কষ্ট উপলব্ধিতে আনার সুযোগ দেয় না! মাথার ঘাম দুই চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। সেদিকে কোন খেয়াল নেই ওদের। একমনে দ্রুত মাছ কেটে চলছেন তারা। কথা বলার ফুরসত্ নেই। ওদের কাজ শেষে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে। দ্রুত মাছ কাটা শেষ করতে হবে। একজনের মাছ কাটা শেষ করলে আরেকজনের মাছ কাটতে শুরু করবেন। যত বেশি মাছ কাটতে পারবেন; ততো বেশি রোজগার হবে ওদের। কেউ ওদের বলেন, ‘মাছকাটানী’, কেউবা বলেন, ‘মাছকুটনী’ বা ‘মাছকাটুনী’। একজন ক্রেতা বাজারে এক কেজি ছোট মাছ কিনে ‘মাছকাটানী’দের কাছ থেকে কেটে নিলে মজুরি লাগে মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা।
পেশাদার মাছ কাটা। একটি নতুন কাজ। করছেন বিভিন্ন বয়সের নারীরা। ছোট মাছ কাটার অলসতায় অনেকে যখন ছোট মাছ কেনা প্রায় বাদই দিতে বসেছেন; তখন কিছু দুস্থ নারী প্রয়োজনের তাগিদে মাছ কাটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এতে একদিকে যেমন সৃষ্টি হয়েছে নারীদের নতুন কর্মসংস্থান; অন্যদিকে তেমনি ব্যস্ত জীবনে গৃহিনীদের বাঁচিয়ে দিয়েছে কিছু সময়। তাদের ক’জন নাসিমা, জোসনা, মরিয়ম, শেফালী।
কাওরানবাজার রেল লাইনের ধারে কথা হয় মাছকাটানী নাসিমা বেগমের সঙ্গে। পাঁচ সন্তান নিয়ে অভাবের সংসার তার। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছেন। তবে মাঝে মধ্যে এসে নাসিমাকে মারধর করে টাকা নিয়ে যান। প্রায় ৩ বছর ধরে একই জায়গায় মাছ কাটার কাজ করছেন তিনি। এই কাজে প্রতিদিন আয় হয় ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। ১ কেজি ছোট মাছ কাটার মজুরি পান ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা। আর বড় মাছ কাটতে মজুরি লাগে ৫ থেকে ১০ টাকা। তিনি সারা দিন প্রায় ২০ কেজির মতো মাছ কাটতে পারেন। সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন থাকায়; এই দিনে তাদের কাজে চাপ থাকে কিছুটা বেশি।
প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ যখন খুঁজে নিচ্ছেন নতুন কর্মসংস্থান; তখন পিছিয়ে নেই নারীরা। তারাও নতুন নতুন কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। নারীদের সেই নতুন পেশায় যুক্ত হয়েছে ‘মাছ কাটা। সকালে ৬টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত রোদের মধ্যে ওই রেল লাইনের ধারে মাছ কাটার জন্যে অপেক্ষা করেন ওরা। ওই বাজারে সব মিলে ১৫ থেকে ২০ জন নারী মাছ কাটার কাজ করেন। এদের মধ্যে পুরুষ কর্মীও রয়েছেন।
মাছ কাটাতে আসা একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, চাকরিজীবী নারীদের জন্য অনেক বড় সাপোর্ট হয়ে এসেছেন এই মাছ কুটনী নারীরা। ব্যস্ত জীবনে বাসায় অনেক সময় ব্যয় করে ছোট মাছ কাটাও হয় না, খাওয়াও হয় না। মাছ কাটার এই কাজটি করায় স্বস্তিতে রয়েছেন চাকরিজীবী নারীরা। তিনি বলেন, স্ত্রীও সরকারি চাকরি করেন। রাজধানীর ব্যস্ত জীবন-যাপনে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে ছোট মাছ কাটার মতো সময় তার থাকে না। তাই সবসময় বাজার থেকেই এই মাছ কুটনীদের কাছ থেকে মাছ কিনে কেটে নেন তিনি।
জোছনা বেগম সাত মাস ধরে এই কাজ করছেন। বলেন, ‘আগে দুই বেলা প্যাডে ভাত জুটতো না; এখন তাও দুইবেলা লবণ-ভাত খাইতে পারি’। এককেজি মাছ কাটার জন্যে ২০ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও অনেকে এই টাকাও দিতে চান না। মাছ কাটা হয়ে গেলে ১৫ টাকা জোর করে ধরিয়ে দিয়ে চলে যান।
মাছ কুটনীদের এই কাজ করার জন্যে দুই ফুট দৈর্ঘ্য দুই ফুট প্রস্থের একটি জায়গার দরকার হয়। সঙ্গে লাগে বসার জন্য পিড়ি, বটি ও ছাই। মাছ কাটার জন্য বসার এই জায়গার জন্যে রোজ ভাড়া দিতে হয় ৭০ টাকা। কাছ কাটার কাজ করা এইসব নারীদের হাতের নখ ক্ষয়ে গেছে, দীর্ঘ সময় ছাই আর ভেজা থাকার কারণে হাতের ত্বক পাতলা হয়ে ফেটে যাওয়াসহ ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় বলে জানান তারা।
মাছ কুটনীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, মাছ কাটা পেশায় নিয়োজিত এইসব শ্রমিকদের বাজারে তাদের জন্যে একটু ছাউনি দিয়ে একটা জায়গা বরাদ্দ রাখলে, তারা অন্তত স্বাচ্ছন্দ্যে কাজটি করতে পারতেন।