ক্ষুদ্র ঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচন
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৪, ২২:০৯
প্রাচীনকালে ভারতের এক অর্থশাস্ত্রবিদ ঋণ করিয়া ঘি খাইবার পরামর্শ দিয়াছিলেন। তাহার সেই ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্’ বাক্যটি এই যুগেও বিভিন্ন সময়ে উচ্চারিত হইতে শোনা যায়। আর আধুনিককালের নাগরিক কিংবা পল্লী জীবন উভয়ই কোন না কোনভাবে ঋণচক্রের আবর্তে ঘূর্ণায়মান। আধুনিক অর্থ ব্যবস্থায় ঋণ অতি স্বাভাবিক এক অনুষঙ্গ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আর উহারই মূর্তিমান প্রকাশ হইল ব্যাংক ব্যবস্থা। উন্নত দেশেতো বটেই, এমনকি উন্নয়নশীল দেশেও, এখন আধুনিক নানান প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়া ব্যাংক হইতে ঋণ গ্রহণের সহজতর ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। নগদ অর্থ বহনের পরিবর্তে ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে প্লাস্টিক মানি ব্যবহারের চল্ বৃদ্ধি পাইতেছে। মনুষ্য সমাজে ধার-কর্জ করিবার প্রবণতা সেই প্রাচীনকালেও প্রচলিত ছিল। আর উহারই ধারাবাহিকতায় নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমাজে কতরকমের যে ঋণ ব্যবস্থা চালু হইতে দেখা গিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। পল্লী সমাজে দাদন প্রথা, মহাজনী সুদ প্রথা, এক সময়ের কাবুলীওয়ালাদের সুদি কারবার ইত্যাকার নানান ধরনের ঋণ ব্যবস্থা বৃটিশ আমলে এবং উহার আগে এবং পরেও আমাদের সমাজে চালু থাকিতে দেখা গিয়াছে। মানুষ তাহার জীবনের মান উন্নয়নের প্রয়োজনে এবং হতদরিদ্ররা জীবিকা নির্বাহের বা নিছক কোনক্রমে বাঁচিয়া থাকিবার জন্যই ঋণ গ্রহণে আগ্রহী এবং বাধ্য হয়। আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলি ঋণ প্রদানের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়িয়া ওঠায় মানুষ উহাদের দ্বারস্থ হইতেছে।
একটি রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে উহার অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উপর। দেশের হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য ফিরাইতে আজকাল সমাজে ক্ষুদ্র ঋণ প্রথা চালু হইয়াছে। প্রায়শই বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে এই ধরনের ঋণ চালু করিয়া সমাজ হইতে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করিতে শোনা যায়। বিশেষ করিয়া দেশের নারী সমাজকে উত্পাদনমুখী কার্যক্রমের সহিত যুক্ত করিয়া নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাহাদের দারিদ্র্যাবস্থা দূর করিবার কথাই ঐসব ঋণদাতাদের কণ্ঠে জোরে-সোরে শোনা যায়। তবে একথা মানিতেই হইবে যে, মহাজনী সুদি ব্যবস্থার সহিত এই ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার চরিত্রগত তেমন কোন ফারাক নাই।
ক্ষুদ্র ঋণ আমাদের দেশে মূলত: স্বাধীনতা-উত্তরকালে চালু হইয়াছে এবং উত্তরোত্তর উহার বিস্তার ঘটিয়া চলিয়াছে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষত: নারীদের এ ধরনের ঋণ গ্রহণের পর অনেক ক্ষেত্রে ঋণের জালে জড়াইয়া পড়িয়া নানামুখী হয়রানির শিকার হইতে দেখা যায়। তাহাদের গরু-ছাগল এমনকি খড়ের চালা পর্যন্ত শেষতক্ ঐ ঋণভারে হাতছাড়া হয়। এই জাতীয় ক্ষুদ্র ঋণ লইয়া দেশে দশকের পর দশক ধরিয়া বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলিতেছে। কেহ কেহ ইহাকে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার বলিয়া মনে করেন এবং তাহাদের সেই মনগড়া কথা দেশে-বিদেশে প্রচার করিয়া বাহ্বাও কুড়ান। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করিলে দেখা যাইবে যে, ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা দারিদ্র্য বিমোচনে তেমন কোন ভূমিকাই রাখে না। দরিদ্র মানুষকে কোন প্রকারে জীবন ধারণের গ্লানি বহিয়া বেড়াইবার ব্যবস্থাপনা হিসাবে হয়তো এই ক্ষুদ্র ঋণ কার্যকর বলিয়া প তিপন্ন হইতে পারে। কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণে ইহার ভূমিকা নাই বলিলেই চলে। দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম, চাই কর্মসংস্থান, উত্পাদনমুখী কার্যক্রমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্তির নিশ্চয়তা। অভাবী ও অন্নহীন মানুষকে ক্ষুদ্র ঋণের নামে কিছু নগদ টাকা ধরাইয়া দিলে সে তাহার জঠর জ্বালা নিবৃত্তির জন্য উহা খরচ করিতে বাধ্য হইবে বৈকি! ফলে গৃহীত ঋণ শোধ করিতে গিয়া সে অধিকতর বিপণ্ন হইয়া পড়িবে ইহাতে আর বিচিত্র কি! সুতরাং, ক্ষুদ্র ঋণ অভাবী মানুষকে ক্ষণকালের জন্য একটু নাক ভাসাইয়া থাকিবার কাজে সহায়তা করিলেও স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যমুক্ত করিতে পারে না। কোনক্রমে নিজের দেহ ও প্রাণটিকে টানিয়া লইবার দরিদ্র মানুষদের জন্য ঐ ক্ষুদ্র ঋণের দ্বারস্থ না হইয়া উপায়ই বা কী! আর এই কারণেই ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের প্রসার ঘটিতেছে। তাই ইহা হইতে দরিদ্রদের মুখ ফিরাইয়া লওয়া সম্ভবও নহে।