[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

লোকসভা নির্বাচন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

গতকাল বিশ্বের বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সাধারণ নির্বাচনের শেষপর্ব সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গণনা শুরু হবে আগামী ১৬ মে থেকে। এ নির্বাচনকে ঘিরে তিনটি বিষয় বার বার আলোচনায় আসছে, তা হল ১. ভারতে এবার কে দিল্লির মসনদে বসবে ২. কংগ্রেস থাকবে, না বিজেপি আসবে, না অন্য কোন তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় আসবে? যদি বিজেপি আসে তাহলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? ৩. যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে আর নরেন্দ্র মোদীই প্রধানমন্ত্রী পদে বৃত হন, তবে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের ধরন কেমন হবে? প্রথমে আসা যাক, ভারতে কোন্ দল ক্ষমতায় আসবে? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতে একক কোন দলের ক্ষমতায় আসার সুযোগ খুব বেশি নেই। ক্ষমতায় আসতে হলে কংগ্রেস বা বিজেপি উভয়কেই জোটবদ্ধ হতে হবে এবং তারা জোটবদ্ধ। বিভিন্ন জনমত জরিপে এবার দেখা গেছে যে, ক্ষমতায় বিজেপি আসবে অর্থাত্ কংগ্রেস ক্ষমতা হারাবে, বিজেপির প্রধান মিত্র নিতিশ কুমারের জেডডব্লিউইউও রয়েছে। আমরা যদি ধরে নেই যে, ভারতের ক্ষমতায় বিজেপি আসছে তাহলেও নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া সহজ নাও হতে পারে। কেন না নরেন্দ্র মোদীর প্রশ্নে বিজেপির প্রধান মিত্র নিতিশ কুমারের ঘোর আপত্তি আছে। এবারের লোকসভা নির্বাচন অন্যান্য বারের চেয়ে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। এবার একজন বিশেষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাচন হচ্ছে। একজন ব্যক্তিকেই দেয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। এই ব্যক্তিটি হলেন নরেন্দ্র মোদী। সাধারণত আলোচনা হয়ে থাকে যে, কোন্ দল ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু এবার ভারতের নির্বাচনের আলোচ্য বিষয় মোদী কি ক্ষমতায় আসছেন? চারদিকে বলা হচ্ছে মোদী সরকার, বিজেপি সরকার বলা হচ্ছে না। ভারতের গণমাধ্যমে এমনকি বিজেপির প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপনেও একথাই বলা হচ্ছে। একজন ব্যক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ায় বিজেপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে মনক্ষুণ্নতা, তারা চান না একজন একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাচন হোক। এমতাবস্থায় বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে কিছুটা হলেও সংশয় রয়েছে। ভোটাররা সাধারণত ভোট দিয়ে একটি দলকে ক্ষমতায় আনে। সেই দল এবং তাদের মিত্ররা ঠিক করে কে হবেন প্রধানমন্ত্রী? আমরা আগেই বলেছি যে, বিজেপির প্রধান মিত্র জেডডব্লিউইউ মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে ঘোর বিরোধী। অন্যান্য শরিক দলেরও রয়েছে প্রবল আপত্তি। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে মোদী ছাড়াও বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী রয়েছেন। সুতরাং আমরা এখনই বলতে পারছি না যে, মোদীই ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। দ্বিতীয় ভাবনার বিষয়টি হলো, ভারতে যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন কোন মোড় নিবে কিনা! সম্পর্কে কোন ফাটল কিংবা উন্নতি হবে কিনা। আমরা আসলে ভারতের নির্বাচন তথা নতুন সরকার আসবে কিনা এই বিষয়ে একটু বেশিই চিন্তা করছি। আমরা যদি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখব ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিকতা আছে। এদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট। তারা যে কোন বিষয় যদি তাদের স্বার্থ-পরিপন্থী হয় তবে তারা এর বিপরীতে অবস্থান নেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে যদি কোন পরিবর্তনও আসে তবে তা অবশ্যই তাদের পক্ষেই থাকবে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে প্রধান বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো হলো—সীমান্ত, তিস্তা, ছিটমহল বিনিময়। মোদী ক্ষমতায় এলেও এসব বিষয়ে কঠোর বৈ নমনীয় হবে না যা বাংলাদেশের জন্য দুঃসংবাদ। গত ১১ এপ্রিল আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মমতা ব্যানার্জীর জন্য তিস্তা চুক্তি হল না। কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভাল সম্পর্ক রয়েছে। তারা তিস্তা বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ভাল কিছু করতে পারল না মমতা এবং বিজেপির বাধার কারণে। মোদী যদি ক্ষমতায় আসে তবে এসব বিষয়ে মমতার সাথে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে না; কারণ মমতা এবং মোদীর চলছে এখন দারুণ রেষারেষি। গত ১১ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের একজন মন্ত্রী বললেন, তারা তিস্তার সমাধান চান কিন্তু আমার প্রশ্ন হল তিনি কেন ৩ মাস আগে একথা বললেন না? আসলে এটা একটা নির্বাচনী কৌশল মাত্র। এখন তিস্তা চুক্তি বিষয়ে ভারত সরকার যদি বেঁকেই থাকে তবে বাংলাদেশ সরকারের উচিত বিকল্প চিন্তা করা অর্থাত্ আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ নেয়া। আর সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে ইউপিএ সরকার সংসদে একটি সংশোধন আনতে চেয়েছিল যা বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য পেরে ওঠেনি। অর্থাত্ দল দুটির এ বিষয়ে রয়েছে প্রবল আপত্তি। চুক্তি সম্পাদিত হলে বাংলাদেশ একটু বেশি লাভবান হবে আর এজন্য তৃণমূলের এক নেতা বলছেন যে, এটা একটা কেক নয় যে, ভাগ করে খেতে হবে। আমার মনে হয় যে সরকার আসুক না কেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে না। আর এজন্য বাংলাদেশকে তিস্তাসহ সব বিষয়ে নতুন নীতি ঠিক করতে হবে যাতে আমাদের স্বার্থ বজায় থাকে। অনুলিখন :জহুরুল ইসলাম লেখক :আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক