রাজধানী বেষ্টিত নদী
রক্ষা করে জীবাণুমুক্ত
পানির ব্যবস্থা
প্রকাশ : ১২ মে ২০১৪, ২২:১০
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদীবেষ্টিত আমাদের প্রিয় রাজধানী। যা পৃথিবীর অনেক দেশে নেই। এই নদীগুলোকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারছি না বলে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাজধানীর জনসংখ্যা বর্তমানে ১ কোটি ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে। তাপদাহে মানুষ অতিষ্ঠ। তৃষ্ণা মিটাতে পানির প্রয়োজন, চাই জীবাণুমু্ক্ত সুপেয়, স্বাস্থ্যসম্মত পানি। রাজধানীতে এই পানির অভাব, অনেকে পানি ফুটিয়ে পান করে, আবার ফিলটারও করে নেয়। কতটুকু পানের যোগ্য হয় তা বলা মুশকিল। বিশুদ্ধ পানির অভাবে কর্মক্লান্ত মানুষ কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েডের মত রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। রোগ-ব্যাধির মাত্রা বাড়ে। কর্মক্লান্ত মানুষ পানি চায়— জীবাণুমুক্ত পানি। পানি গ্রহণ না করে রিকশাচালক রিকশা চালাতে পারে না। ঘেমে ভিজে গেলে ঘাম মুছে বার বার। ক্লান্ত দেহকে রক্ষা করতে শুধু পানি চাই। এরা ছেলে-মেয়েকে যেমন ভালবাসে দেশকেও ভালবাসে। অর্থনৈতিক দীনতায় অনেক কিছু ভাবার হয়ত সময় পায় না। পানি যেখানে যা পায় তাই খেয়ে নেয়, দূষিত কি বিশুদ্ধ তা সে বুঝতে পারে না। পানি দূষিত কি জীবাণুমুক্ত খালি চোখে বোঝা দুষ্কর। অনেক স্থানে পাইপ ফাটা, ভাঙ্গা। আবার পানির রিজার্ভারগুলো থাকে অপরিচ্ছন্ন। তাই এতেও পানি নষ্ট হয়। কিন্তু মূল পানি সরবরাহের সাথে যারা সম্পৃক্ত বিষয়টি তাকেই ভাবতে হবে। রাজধানীতে গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন পানি উত্তোলন চলছে। ফলে ওয়াটার লেভেল প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। অনেক চাপকলে আজ পানি উঠে না। অকেজো হয়ে আছে। রাজধানীকে সবুজাভ রাখতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে নদীর পানি ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু রাজধানী বেষ্টিত নদীগুলোর পানি ব্যবহারযোগ্য করে আমরা রাখতে পারিনি। এগুলো এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। নগরবাসীর জীবনযাত্রা স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে নদীর ভূমিকা অনেক। এই সহজলভ্য নদীগুলোকে আমরা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। নদীগুলোর বিষয়ে যথার্থ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আজ রাজধানীতে সুপেয় পানির অভাব। প্রতিদিন যে পরিমাণ পানির চাহিদা, ঢাকা ওয়াসা তা সরবরাহ করতে পারে না। যা পারছে তার ৮২-৮৫ % ভূগর্ভস্থ পানি। এই পানিও বিভিন্নভাবে খাবার অনুপযোগী হয়। বাকিটা বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানি যা পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করে। কিন্তু এই নদীর পানির অবস্থা বিষ সমতুল্য, ব্যবহার অযোগ্য, তারপরও অনেকে তা ব্যবহার করছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নদীর পানির উত্কট গন্ধে পরিবেশ হানি ঘটছে। নদীর তীরের মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য এখনই বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিপর্যয় আরো বাড়বে। কারণ এই নদীই মানুষের দৈনন্দিন জীবনসঙ্গী। ব্রিটিশ আমলে রাজধানীতে পানি সরবরাহের জন্য বুড়িগঙ্গা পানি পরিশোধন করতে এর তীরে স্থাপিত হয়েছে আব্দুল গনি ওয়াটার ওয়ার্কস- আর পরবর্তীতে স্থাপিত হয়েছে সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, যা শীতলক্ষ্যার পানি পরিশোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ চারটি নদীর পানিই আজ ব্যবহার অযোগ্য হয়েছে। এই পানিই পরিশোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
মহানগরের চারপাশের নদীর পানিতে পয়ঃবর্জ্য, কল-কারখানার বর্জ্য, ট্যানারী ও নৌযানের বর্জ্যে একাকার। এই পানিতে অক্সিজেনের অভাবে মাছ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে না। নদীগুলোতে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে বন্ধ করে পানি রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া নিতে হবে সদরঘাট থেকে নৌ-টার্মিনাল সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ। এতে লঞ্চ, স্টিমার ও নৌযানের বর্জ্যে পানি দূষণ বন্ধ হবে। পোড়া তেল ও মানুষের বর্জ্য থেকে নদী রক্ষা পাবে। রাজধানী বেষ্টিত নদীগুলোর তলানি উত্তোলন ও ডাম্পিং স্টেশনে ফেলার কাজটি গুরুত্ব দিতে হবে। সেইসাথে নদীর দু’তীর রক্ষার কাজটিও জরুরি। দখলদাররা অব্যাহত নদী দখলে ব্যস্ত। যে যেখানে পারছে স্থাপনা গড়ছে তা কঠোরহস্তে রোধ করা হবে অন্যতম পথ। নিতে হবে তলানি অপসারনসহ শক্ত তলদেশ তৈরির পদক্ষেপ। প্রয়োজন নদীগুলোর গভীরতা বৃদ্ধি করা, পানির প্রবাহ ঠিক রেখে স্বচ্ছ পানির ব্যবস্থা করা। আরো প্রয়োজন যমুনা, তুরাগ নদী সংযোগের ব্যবস্থা। সরকার রাজধানীতে পানি সরবরাহের জন্য পদ্মা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প হাতে নিয়েছে এটা অবশ্যই ভাল উদ্যোগ। কিন্তু রাজধানী বেষ্টিত নদীগুলোর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ এই নদীগুলো রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা না নিলে রাজধানীর পরিবেশ হুমকিতে পড়বে। তুরাগ নদীর সাথে সাভার মানিকগঞ্জ হয়ে বংশী নদীর ক্ষীণ প্রবাহকে খননের মাধ্যমে গতিপথ সোজা ও গভীরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলে পানি প্রবাহের সুফল বয়ে আনবে। তাছাড়া রাজধানীর পূর্ব-উত্তরদিকে শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ শাখাটি সংস্কারের ব্যবস্থা নেয়া যায়। তবে এই নদীটিও স্রোতাস্বিনী হবে, তবে স্বচ্ছ পানিপ্রাপ্তি সহজ হবে। সে াতস্বিনী নদী হওয়ার পর সীমিত নৌপরিবহনের ব্যবস্থা রেখে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়।
লেখক : প্রকৌশলী